শনিবার, সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬
২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হরমুজ প্রণালির ঐতিহাসিক চুক্তি, সোমবার সই করবেন আরব পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:১৮ পিএম

হরমুজ প্রণালির ঐতিহাসিক চুক্তি, সোমবার সই করবেন আরব পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান জলপথ হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও বাধামুক্ত করতে একটি যুগান্তকারী সমঝোতায় পৌঁছেছে মধ্যপ্রাচ্যের দুই প্রভাবশালী রাষ্ট্র ইরান এবং ওমান।

 

দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, সামরিক মহড়া এবং সামুদ্রিক চলাচলে সৃষ্ট অনাকাঙ্ক্ষিত অচলাবস্থা নিরসনের লক্ষ্যে আগামী সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ওমানের রাজধানী মাসকাটে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

 

এই বহুল প্রতীক্ষিত বৈঠকেই মূলত ইরান ও ওমানের মধ্যকার এই ঐতিহাসিক সমঝোতাটি একটি আইনি ও আনুষ্ঠানিক চুক্তির রূপ পরিগ্রহ করবে। ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাছে এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাতময় ও উত্তেজনাকর রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই চুক্তিটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা পুনর্গঠন এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক সুদূরপ্রসারী ও ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করবে।

 

পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরকে সংযুক্তকারী হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত ও স্পর্শকাতর একটি সামুদ্রিক জলপথ, যার বুক চিরে প্রতিদিন আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য উৎপাদিত অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি পরিবাহিত হয়ে থাকে।

 

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই প্রণালির একপাশে রয়েছে ইরান এবং ঠিক অপর প্রান্তে অবস্থান করছে ওমান। বিগত কয়েক মাস ধরে এই অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি এবং সামরিক উপস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছিল।

 

এই বিপজ্জনক ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির চিরস্থায়ী অবসান ঘটাতেই ওমানের নিজস্ব উদ্যোগে ও মধ্যস্থতায় একটি নতুন, নিরাপদ এবং সম্পূর্ণ বাধাহীন যৌথ সামুদ্রিক নৌপথ চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যা সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের জন্যই একটি অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক খবর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

 

শনিবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইন্ডিয়া টুডে’-কে দেওয়া এক বিশেষ, দীর্ঘ ও অত্যন্ত খোলামেলা সাক্ষাৎকারে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান আসন্ন এই চুক্তির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

 

তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ও দৃঢ়তার সঙ্গে জানান যে, আগামী সোমবার মাসকাটের কূটনৈতিক টেবিলে আরব দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা একটি অভিন্ন ও গঠনমূলক মঞ্চে মিলিত হবেন। এই শীর্ষ বৈঠকের মূল ও প্রধান লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালিতে ওমান ও ইরানের মধ্যে একটি সম্পূর্ণ নতুন, সুরক্ষিত ও নিরাপদ যৌথ নৌপথ চালুর চুক্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করা।

 

একইসঙ্গে, বৈশ্বিক সামুদ্রিক আইন ও শৃঙ্খলার প্রতি পূর্ণাঙ্গ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থাকে (আইএমও) এই নতুন রুট ও চুক্তির বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হবে বলেও তিনি নিশ্চিত করেছেন। এটি আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি ইরানের শ্রদ্ধাশীল আচরণের একটি সুস্পষ্ট বার্তা বলে মনে করা হচ্ছে।

 

প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের দেওয়া এই সাক্ষাৎকারের একটি অংশে আঞ্চলিক কূটনীতির এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও গুণগত পরিবর্তনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তিনি উল্লেখ করেন, মধ্যপ্রাচ্যের যেসব প্রতিবেশীর ভূখণ্ড বা সামরিক স্থাপনা ব্যবহার করে অতীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নানা সামরিক হামলা পরিচালনা করেছিল, সেই দেশগুলোর উচ্চপদস্থ সরকারি প্রতিনিধিরাও মাসকাটের এই ঐতিহাসিক বৈঠকে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবেন।

 

এর মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে এই বার্তা প্রতীয়মান হয় যে, অতীতের তিক্ততা ও বৈরিতা ভুলে আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো এখন নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক নিবিড়ভাবে পুনর্নির্মাণ করতে এবং বহিরাগত পশ্চিমা হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিজেদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রবলভাবে আগ্রহী।

 

উক্ত সাক্ষাৎকারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান দীর্ঘস্থায়ী স্নায়ুযুদ্ধ এবং ইরানের ওপর ওয়াশিংটনের আরোপিত একতরফা ও কঠোর অর্থনৈতিক চাপের বিষয়েও প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান অত্যন্ত কড়া ভাষায় তেহরানের অবস্থান তুলে ধরেন।

 

তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেন যে, বিপুল সামরিক শক্তিতে বলীয়ান হয়েও যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সুনির্দিষ্ট কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। সামরিক দিক দিয়ে কার্যত পরাস্ত হয়ে এবং সরাসরি যুদ্ধের মাধ্যমে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে না পেরেই ওয়াশিংটন এখন বিকল্প হিসেবে ইরানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অর্থনৈতিক অবরোধ ও সামুদ্রিক নিষেধাজ্ঞার মতো অত্যন্ত অন্যায্য ও অমানবিক পথ বেছে নিয়েছে।

 

তবে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন যে, পাহাড়সম চাপ থাকা সত্ত্বেও বীর ইরানি জাতি কোনোভাবেই পরাভব মানবে না এবং এই অন্যায্য মার্কিন চাপের কাছে তারা কখনোই মাথা নত করবে না।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরানের বন্দর ও জলসীমার ওপর আরোপিত নৌ-অবরোধের কার্যকারিতা ও ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান গভীর সংশয় প্রকাশ করেন। তিনি দেশবাসী ও বিশ্ব সম্প্রদায়কে সম্পূর্ণ আশ্বস্ত করে বলেন যে, তার দেশের সার্বিক অর্থনীতি এবং টিকে থাকার অদম্য লড়াইটি কেবল সমুদ্রপথের ওপরই এককভাবে নির্ভরশীল নয়।

 

তিনি বলেন, বহির্বিশ্বের সঙ্গে ইরানের যোগাযোগ, পণ্য পরিবহন ও বাণিজ্যের অনেক বিকল্প স্থলপথ উন্মুক্ত রয়েছে। তাই নৌ-অবরোধ আরোপের মাধ্যমে ইরানকে বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার যে সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক পরিকল্পনা ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে করে আসছে, তা কখনোই সাফল্যের মুখ দেখবে না।

 

এর আগে, গত শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এই আসন্ন কূটনৈতিক তৎপরতা ও আঞ্চলিক উদ্যোগ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন। তিনি জানান, সোমবার ওমানের নিজস্ব আয়োজনে একটি আঞ্চলিক মন্ত্রী পর্যায়ের অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

 

পারস্য উপসাগর সংলগ্ন আটটি অত্যন্ত প্রভাবশালী দেশ এই ঐতিহাসিক বৈঠকে সরাসরি অংশ নেবে। সেখানে মূলত আঞ্চলিক নিরাপত্তা, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ ও বাধামুক্ত পথ নির্ধারণের বিষয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে চলমান দীর্ঘ কূটনৈতিক আলোচনার চূড়ান্ত ফলাফল নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হবে।

 

পরিশেষে বলা যায়, মাসকাটের এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠক সফলভাবে সম্পন্ন হলে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের জটিল শান্তি প্রক্রিয়ায় নয়, বরং যুদ্ধ ও সংঘাতে জর্জরিত সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতিতেই এক নতুন গতির সঞ্চার করবে।

 

আনাদোলু