এই নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি, বিশেষ করে কৃষি খাত ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে, ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি ও আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে এই ধরনের যুদ্ধংদেহী নীতি অব্যাহত রাখার অভিযোগ তুলে অবিলম্বে এই সংঘাতের অবসান দাবি করেছেন ডেমোক্র্যাট দলের একাধিক প্রভাবশালী নেতা।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার্থে তাদের এই সময়োপযোগী দাবি মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের ভেতরের এই রাজনৈতিক বিভাজন ট্রাম্প প্রশাসনের বৈদেশিক নীতির ওপর আগামী দিনগুলোতে ব্যাপক চাপ প্রয়োগ করবে।
মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্য থেকে নির্বাচিত ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি মাইক থম্পসন এই যুদ্ধবাজ নীতির সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক কুফল সম্পর্কে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় দেশবাসীকে সতর্ক করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিস্তারিত বার্তায় তিনি উল্লেখ করেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই অযাচিত ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ জ্বালানি তেলের বাজারে।
এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে ডিজেলের দাম বর্তমানে সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। বর্তমান সময়টি দেশের কৃষি খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখন মাঠে ফসল কাটার ভরা মৌসুম চলছে।
ঠিক এই অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়ে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক ও লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি মার্কিন কৃষকদের ওপর এক অভাবনীয় ও অমানবিক অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে। কৃষিকাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির পরিচালন ব্যয় এবং পরিবহন খরচ বহুগুণ বৃদ্ধির কারণে অনিবার্যভাবেই দেশজুড়ে কৃষিজাত খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে অন্যান্য সকল নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর দাম হু হু করে বাড়ছে।
এর চূড়ান্ত ভোগান্তি ও অর্থনৈতিক খেসারত পোহাতে হচ্ছে সাধারণ ও নিম্ন আয়ের ভোক্তাদের। দেশের অর্থনীতির এই নাজুক ও ক্রমাবনতিশীল পরিস্থিতি গভীরভাবে বিবেচনা করে তিনি অবিলম্বে এবং নিঃশর্তভাবে এই আগ্রাসী যুদ্ধের অবসান ঘটানোর জন্য মার্কিন প্রশাসনের প্রতি জোরালো ও দ্ব্যর্থহীন আহ্বান জানিয়েছেন।
কেবল অর্থনৈতিক উদ্বেগই নয়, বরং এই যুদ্ধের পেছনে থাকা অনৈতিক উদ্দেশ্য ও স্বার্থান্বেষী মহলের সন্দেহজনক ভূমিকা নিয়েও অত্যন্ত কঠোর সমালোচনা করেছেন মিশিগান অঙ্গরাজ্য থেকে নির্বাচিত মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের অপর প্রথিতযশা ডেমোক্র্যাট সদস্য রাশিদা তালিব।
তিনি অত্যন্ত কড়া ও সরাসরি ভাষায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা করে অভিযোগ করেছেন যে, জাতীয় স্বার্থের পরিবর্তে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত স্বার্থ এবং আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিরুদ্ধে এই আগ্রাসন সুপরিকল্পিতভাবে অব্যাহত রাখা হয়েছে।
তার মতে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে গুটিকয়েক মানুষের ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির এই ঘৃণ্য অপচেষ্টা মার্কিন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মানবাধিকার ও সাংবিধানিক নীতির চরম পরিপন্থী। রাশিদা তালিব তার বার্তায় মার্কিন রাজনীতির অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুতর একটি বিষয়ের অবতারণা করেছেন।
তিনি সুস্পষ্টভাবে দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পসহ মার্কিন কংগ্রেসের অনেক প্রভাবশালী সদস্য ও নীতিনির্ধারক আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেল ব্যবসা এবং বৃহৎ সমরাস্ত্র উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে রেখেছেন।
স্বভাবতই, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত, অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করলে বৈশ্বিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কৃত্রিমভাবে বৃদ্ধি পায় এবং একই সঙ্গে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রের চাহিদাও বহুগুণ বেড়ে যায়। এর ফলে ওইসব বহুজাতিক কোম্পানি রাতারাতি ফুলেফেঁপে ওঠে এবং পরোক্ষভাবে এই কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগকারী রাজনীতিকরাই আর্থিকভাবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হন।
ক্ষমতার করিডোরে বসে থাকা রাজনীতি ও ব্যবসার এই অশুভ আঁতাতের বিষয়টি সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরে তিনি তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন। যুদ্ধের ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ও প্রাণহানির দিকটি বিশ্ববিবেকের কাছে স্মরণ করিয়ে দিয়ে রাশিদা তালিব অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, ক্ষমতাবানদের সম্পদ বৃদ্ধির এই নির্লজ্জ ও পাশবিক প্রতিযোগিতায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ মানুষকে নিজেদের অমূল্য জীবন দিয়ে চড়া মূল্য চোকাতে হচ্ছে।
কেবল প্রেসিডেন্ট এবং তার পদলেহী ঘনিষ্ঠ মিত্রদের আরও বেশি ধনকুবের বানানোর হীন উদ্দেশ্যে নিরীহ মানুষের রক্তপাত ঘটানো হচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি সভ্য, আধুনিক ও গণতান্ত্রিক জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক ও কলঙ্কজনক এক অধ্যায়।
তার এই তীক্ষ্ণ ও বাস্তবধর্মী মন্তব্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির পেছনের অন্ধকার ও অমানবিক দিকগুলোকে সাধারণ মানুষের সামনে অত্যন্ত নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে এবং দেশজুড়ে একটি শক্তিশালী যুদ্ধবিরোধী জনমত গঠনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও স্বাধীন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোর ও একগুঁয়ে অবস্থান কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাই ধ্বংস করছে না, বরং খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও রাজনীতিতেও এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী বিভাজন তৈরি করছে।
দেশের সাধারণ নাগরিক, বিশেষ করে প্রান্তিক কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ যখন লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় সামলাতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছেন, তখন কেবল অস্ত্র ও তেল ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষার্থে রাষ্ট্রীয় সংঘাতমূলক নীতি নির্ধারণ করা নিয়ে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের এই প্রকাশ্য ক্ষোভ ও প্রতিবাদ অত্যন্ত সময়োপযোগী।
ডেমোক্র্যাট নেতাদের এই সম্মিলিত ও জোরালো প্রতিবাদ আগামী দিনে মার্কিন কংগ্রেস এবং জনসমক্ষে ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির ওপর আরও বড় ধরনের রাজনৈতিক ও নৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।
বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ এবং বৈশ্বিক শান্তির কথা সুবিবেচনায় নিয়ে সংঘাতের পথ পরিহার করে অবিলম্বে একটি টেকসই কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজার ওপরই এখন সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করছেন সংশ্লিষ্ট সকল সচেতন মহল।