দেশের আপামর জনসাধারণ কখনো কোনো ধরনের জোর-জবরদস্তি ও আধিপত্যবাদের কাছে মাথা নত করবে না বলে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা দিয়েছেন ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।
তিনি বিশ্ব সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, তার দেশ কোনো অবস্থাতেই পরাশক্তিগুলোর অন্যায্য দাবির কাছে আত্মসমর্পণ করবে না। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক বিবৃতি নয়, বরং ইরানের দীর্ঘস্থায়ী জাতীয় প্রতিরোধ, স্বাধীনতাস্পৃহা এবং আত্মমর্যাদাবোধের একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন, যা বিশ্ববাসীর সামনে আরও একবার দৃঢ়ভাবে তুলে ধরা হলো।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিং’ বা আইআরআইবি-এর বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম পার্সটুডে এই গুরুত্বপূর্ণ খবরটি প্রকাশ করেছে। সংবাদ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সম্প্রতি তার ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতায় একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা প্রকাশ করেন।
সেখানে তিনি তার দেশের নাগরিকদের অদম্য সাহসিকতা, সহ্যক্ষমতা এবং জাতীয় ঐক্যের ভূয়সী প্রশংসা করেন। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে যখন বিভিন্ন দিক থেকে স্বাধীনচেতা দেশগুলোর ওপর নানামুখী চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহীর এমন আত্মবিশ্বাসী ও তেজোদ্দীপ্ত বক্তব্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অত্যন্ত গভীর তাৎপর্য বহন করছে।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান তার বিবৃতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুসৃত নীতি এবং তাদের আগ্রাসী সামরিক মনোভাবের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি তার বার্তায় ওয়াশিংটনের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে লিখেছেন, মার্কিন প্রশাসন যদি প্রকৃতপক্ষেই যুদ্ধবাজ হয় এবং তারা যদি সংঘাতই কামনা করে, তবে তাদের উচিত ইরানের অকুতোভয় ও সাহসী সামরিক বাহিনীর সরাসরি মুখোমুখি হওয়া।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি মূলত বোঝাতে চেয়েছেন যে, সামরিক ময়দানে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী যেকোনো বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত রয়েছে।
সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হওয়ার পরিবর্তে পরোক্ষভাবে দেশের সাধারণ মানুষের ক্ষতিসাধন করার যে হীন নীতি আমেরিকা গ্রহণ করেছে, প্রেসিডেন্ট সেটিকে চরম কাপুরুষোচিত পদক্ষেপ বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
সামরিক সংঘাতের বাইরে গিয়ে সাধারণ নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার মার্কিন নীতির বিরুদ্ধেও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপ ও ক্ষোভের সঙ্গে প্রশ্ন তুলেছেন যে, কেন তারা একটি স্বাধীন দেশের বেসামরিক অবকাঠামো, সাধারণ মানুষের অতি প্রয়োজনীয় খাদ্য সম্পদ এবং তাদের দৈনন্দিন জীবিকার বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে?
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও নৈতিকতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বিশ্ববিবেকের কাছে প্রশ্ন রেখেছেন, যদি ওইসব পশ্চিমা শক্তিগুলোর মধ্যে মানবতার সামান্যতম ছিটেফোঁটাও অবশিষ্ট থেকে থাকে, তবে কেন তারা অন্যায়ভাবে অবরোধ আরোপ করে দেশের সাধারণ মানুষের বিশুদ্ধ পানি, অতি আবশ্যকীয় খাদ্যসামগ্রী এবং জীবন রক্ষাকারী ওষুধের প্রাপ্তি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়ার নিষ্ঠুর অপচেষ্টা করছে?
তার এই আবেগঘন অথচ যুক্তিনির্ভর প্রশ্নগুলো মূলত মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের দিকটিই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে অত্যন্ত জোরালোভাবে উন্মোচিত করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র পশ্চিমা বিশ্ব ইরানের ওপর বিভিন্ন অমূলক অজুহাতে অত্যন্ত কঠোর ও একপেশে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে। এই অন্যায্য নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়তই স্বাস্থ্যসেবা, অত্যাবশ্যকীয় ঔষধ সরবরাহ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের চরম সংকটের সম্মুখীন হচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও বিভিন্ন সময়ে এসব অমানবিক নিষেধাজ্ঞার নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের এই সাম্প্রতিক বক্তব্য মূলত সেই দীর্ঘস্থায়ী বঞ্চনা, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধেই একটি জোরালো রাষ্ট্রীয় প্রতিবাদ।
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই দ্ব্যর্থহীন বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে কোনো স্বাধীন দেশ বা জাতিকে কখনোই তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না।
সার্বিকভাবে, ইরানের প্রেসিডেন্টের এই সুদৃঢ় অবস্থান আবারও প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যতই প্রতিকূল ও বৈরী পরিস্থিতি তৈরি হোক না কেন, তেহরান তার নিজস্ব নীতি, স্বাধীনতা ও আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র সরে আসবে না।
পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর আধিপত্যবাদ এবং অন্যায্য অবরোধের মুখে ইরান যে নিজেদের জাতীয় অহংকার ও আত্মসম্মান বজায় রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সংকল্পে অবিচল রয়েছে, মাসুদ পেজেশকিয়ানের এই স্পষ্ট, নির্ভীক ও সাহসী উচ্চারণ তারই এক অবিসংবাদিত প্রমাণ হিসেবে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহলে ব্যাপকভাবে বিবেচিত হচ্ছে।