রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নতুন করে হামলা চালালে সৌদি আরবের আরও গভীরে তীব্র আক্রমণের হুঁশিয়ারি হুথিদের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৪৫ এএম

নতুন করে হামলা চালালে সৌদি আরবের আরও গভীরে তীব্র আক্রমণের হুঁশিয়ারি হুথিদের
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই ইয়েমেন ও সৌদি আরবের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত নতুন করে এক ভয়াবহ মাত্রা লাভ করেছে। ইয়েমেনের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথিদের পক্ষ থেকে প্রতিবেশী রাষ্ট্র সৌদি আরবকে অত্যন্ত কড়া ভাষায় ও কঠোরভাবে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।

 

হুথি বিদ্রোহীরা তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট যদি ইয়েমেনের সার্বভৌম ভূখণ্ডে নতুন করে কোনো ধরনের বিমান হামলা বা আগ্রাসী সামরিক অভিযান পরিচালনা করার দুঃসাহস দেখায়, তবে তার চূড়ান্ত জবাবে সৌদি আরবের আরও গভীরে, অত্যন্ত বিস্তৃত এবং কল্পনাতীত তীব্র মাত্রায় আক্রমণ চালানো হবে।

 

হুথিদের এই আকস্মিক ও কঠোর হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান নাজুক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। রোববার সশস্ত্র হুথি গোষ্ঠীর ঊর্ধ্বতন সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারে গণমাধ্যমের সামনে এক আনুষ্ঠানিক ও বিস্তারিত বিবৃতিতে এই কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন।

 

তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিশ্চিত করেছেন যে, হুথি যোদ্ধারা ইতোমধ্যেই সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত অত্যন্ত সুরক্ষিত সারুরাহ সামরিক ঘাঁটিতে সফলভাবে আক্রমণ সম্পন্ন করেছে। এই নিখুঁত সামরিক অভিযানে তারা আধুনিক চালকবিহীন বিমান এবং শক্তিশালী দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।

 

এই আক্রমণটি মূলত ইয়েমেনের মাটিতে সৌদি জোটের অব্যাহত সামরিক তৎপরতা ও আগ্রাসনের একটি তাৎক্ষণিক ও শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া হিসেবে চালানো হয়েছে বলে তিনি তার বিবৃতিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করেন।

 

সামরিক মুখপাত্র তার বক্তব্যে আরও গুরুতর ও উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান তুলে ধরে অভিযোগ করেন যে, সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট গত আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে ইয়েমেনের বিভিন্ন বেসামরিক ও সামরিক অঞ্চলে প্রায় একশত ত্রিশ বার ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে।

 

এই অব্যাহত ও ব্যাপক মাত্রার বিমান হামলার সরাসরি জবাবেই হুথিরা বাধ্য হয়ে শত্রুর ভূখণ্ডে পাল্টা আঘাত হেনেছে। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন, সৌদি আরব যদি তাদের এই ধরনের আক্রমণাত্মক ও ধ্বংসাত্মক সামরিক কার্যকলাপ অবিলম্বে বন্ধ না করে এবং নতুন করে আবারও ইয়েমেনের নিরীহ মানুষের ওপর হামলা চালায়, তবে হুথিদের প্রতিরোধ ও পাল্টা আঘাতের তীব্রতা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

 

সেক্ষেত্রে সৌদি আরবের অভ্যন্তরে অনেক গভীরে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয়, সামরিক এবং জ্বালানি অবকাঠামোসমূহকে সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে ধ্বংসাত্মক অভিযান চালানো হবে।

 

সাম্প্রতিক এই চরম সামরিক উত্তেজনার সূত্রপাত ঘটে মূলত গত সপ্তাহের একটি বিশেষ ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ইয়েমেনের লোহিত সাগরের তীরবর্তী অত্যন্ত কৌশলগত ও বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার উদ্দেশ্যে হুথি বিদ্রোহীরা একটি সুপরিকল্পিত, আকস্মিক ও ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে।

 

এই বন্দরনগরীটির ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রণ সামরিক, ভূ-রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। হুথিদের এই অপ্রতিরোধ্য সামরিক অগ্রগতি প্রতিহত করতে এবং তাদের চূড়ান্ত অভিযানকে ব্যর্থ করে দিতে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইয়েমেনের ওই নির্দিষ্ট অঞ্চলে ব্যাপক মাত্রায় ও ধারাবাহিক বিমান হামলা শুরু করে।

 

সৌদি জোটের এই নিরবচ্ছিন্ন বিমান হামলার পরপরই হুথিরা তাদের দীর্ঘমেয়াদী রণকৌশল পরিবর্তন করে এবং সম্মুখ সমরের পরিবর্তে সরাসরি সৌদি আরবের মূল ভূখণ্ডে তীব্র মাত্রায় পাল্টা আক্রমণ শুরু করে।

 

এই ধারাবাহিক ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতে গত মঙ্গলবার সবচেয়ে ভয়াবহ, ধ্বংসাত্মক ও তীব্র আক্রমণটি সংঘটিত হয়। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে হুথি বিদ্রোহীদের চালানো ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন বিমান হামলায় অন্তত তিহাত্তর জন নিরীহ বেসামরিক নাগরিক গুরুতরভাবে আহত হন এবং তাদের চিকিৎসাকেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়।

 

একই সঙ্গে এই সমন্বিত হামলায় সৌদি আরবের বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ কেন্দ্র ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেল সরবরাহের বাজারেও এক ধরনের পরোক্ষ শঙ্কা ও অস্থিরতার সৃষ্টি করেছে।

 

অন্যদিকে, ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতিও সম্পূর্ণ নতুন একটি মোড় নিয়েছে। হুথি বিদ্রোহীদের কাছে লোহিত সাগর তীরবর্তী পূর্ব উপকূলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোর নিয়ন্ত্রণ আকস্মিকভাবে হারানোর পর, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা নতুন করে নিজেদের রণনীতি সাজাচ্ছেন এবং সেনারা পুনরায় নিজেদের সংঘবদ্ধ করতে শুরু করেছে।

 

হারানো অঞ্চলগুলোর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পুনরায় নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের সামরিক বাহিনী এখন দেশজুড়ে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী সদস্য এবং মারিব প্রদেশের সম্মানিত গভর্নর সুলতান আল-আরাদা গণমাধ্যমের কাছে সম্প্রতি এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

 

তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন যে, সরকারি সেনাবাহিনীর সদস্যরা বর্তমানে নিজেদের নতুন করে পুনর্গঠিত করছেন, প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করছেন এবং সর্বাত্মক প্রস্তুতি সম্পন্ন করছেন।

 

তিনি গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যেই সরকারি বাহিনীর অকুতোভয় যোদ্ধারা পূর্ণ শক্তি ও মনোবল নিয়ে আবারও মূল যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে যাবেন এবং নিজেদের বেদখল হওয়া ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারে অত্যন্ত শক্তিশালী সামরিক অভিযান পরিচালনা করবেন।

 

সরকারি মালিকানাধীন টেলিভিশন সম্প্রচার মাধ্যম সাবাকে দেওয়া এক বিশেষ ও বিস্তারিত সাক্ষাৎকারে মারিব প্রদেশের গভর্নর সুলতান আল-আরাদা দেশের সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে অত্যন্ত খোলামেলা ও বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা করেন।

 

পূর্ব উপকূলে হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সরকারি বাহিনীর যে আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত পরাজয় ঘটেছে, সেটিকে তিনি অত্যন্ত ‘যন্ত্রণাদায়ক এবং দুর্ভাগ্যজনক’ একটি অধ্যায় বলে আখ্যায়িত করেছেন।

 

তবে তিনি এ কথাও স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, দীর্ঘস্থায়ী এবং রক্তক্ষয়ী যেকোনো যুদ্ধে এ ধরনের সাময়িক কৌশলগত পিছু হটা বা ধাক্কা খাওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি বিষয়। এতে সরকারি সামরিক বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ার বা হতাশ হওয়ার মতো কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।

 

সাক্ষাৎকারের শেষাংশে তিনি হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত গুরুতর ও কঠোর অভিযোগ উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, হুথিরা ইয়েমেনে দীর্ঘদিন ধরে চলমান আন্তর্জাতিক শান্তি প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দিয়েছে।

 

আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের যে সামান্যতম সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা তারা চিরতরে নস্যাৎ করেছে। বর্তমানে তারা দেশে শান্তির পরিবর্তে আবারও একটি ধ্বংসাত্মক, দীর্ঘমেয়াদী ও সর্বব্যাপী যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে, যা সমগ্র ইয়েমেনি জাতির জন্য এক ভয়াবহ ও অমানবিক বিপর্যয় ডেকে আনবে।

 

- আল জাজিরা