তেহরান জানিয়েছে, বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই জলপথ আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত করার একমাত্র শর্ত হলো, যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই তাদের পূর্ববর্তী প্রতিশ্রুতিতে ফিরে আসতে হবে।
পাশাপাশি, বর্তমান অচলাবস্থার বিকল্প হিসেবে নতুন একটি সামুদ্রিক পথ নিয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ওমানের সঙ্গে একটি বিশেষ চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে বলেও আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
আগামী সোমবার ওমানে অনুষ্ঠেয় এক উচ্চপর্যায়ের বহুপাক্ষিক বৈঠকে এই চুক্তির বিস্তারিত রূপরেখা ও প্রস্তাবিত নতুন পথের মানচিত্র অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সামনে উপস্থাপন করা হবে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম 'আল-আরাবি আল-জাদিদ'-কে দেওয়া এক বিশেষ ও বিস্তৃত সাক্ষাৎকারে তেহরানের এই সুস্পষ্ট রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থানের কথা তুলে ধরেন।
পার্সটুডে ও রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার বরাত দিয়ে প্রকাশিত ওই সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ওমানের রাজধানীতে আসন্ন এই আঞ্চলিক বৈঠকের প্রধান আলোচ্যসূচি নির্ধারণ করা হয়েছে হরমুজ প্রণালী সংলগ্ন এলাকায় একটি সম্পূর্ণ নতুন ও নিরাপদ সামুদ্রিক পথ তৈরি করার বিষয়টি।
এই নতুন নৌপথ বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কী ধরনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে এবং এর কৌশলগত দিকগুলো কী হবে, তা নিয়ে বৈঠকে বিশদ আলোচনা করা হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন যে, ওমানের সঙ্গে ইরানের এই নতুন সামুদ্রিক চুক্তির যাবতীয় খুঁটিনাটি এবং প্রস্তাবিত নতুন নৌপথের পুঙ্খানুপুঙ্খ মানচিত্র ওই বৈঠকে উপস্থিত বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হবে, যাতে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো ধরনের অস্পষ্টতা না থাকে।
তবে আন্তর্জাতিক মহলে তৈরি হওয়া গুঞ্জন ও বিভ্রান্তি দূর করতে সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ওমান সালতানাতের সঙ্গে তেহরানের এই নতুন সামুদ্রিক পথ সংক্রান্ত চুক্তির অর্থ কোনোভাবেই এটি নয় যে, ইরান স্বয়ংক্রিয়ভাবে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দিচ্ছে।
বিশ্বের মোট অপরিশোধিত জ্বালানি তেল সরবরাহের অন্যতম প্রধান এই ধমনী পুনরায় উন্মুক্ত করার জন্য ইরানের একটি সুনির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনযোগ্য শর্ত রয়েছে। আর তা হলো, যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই 'ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক'-এ উল্লেখিত নিজেদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিতে সম্পূর্ণভাবে ফিরে আসতে হবে।
ওয়াশিংটন তার পূর্বের অঙ্গীকার রক্ষা না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালীর বর্তমান অচলাবস্থার কোনো সহজ কূটনৈতিক নিরসনের সম্ভাবনা নেই বলে তিনি জোরালো ইঙ্গিত দেন। দীর্ঘদিন ধরেই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে ইরানের এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধ চলমান রয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বারবার প্রভাব ফেলেছে।
এই প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, তেহরান সবসময় এই নীতিতে গভীরভাবে বিশ্বাস করে যে, এই অঞ্চলের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব কেবল এই অঞ্চলের দেশগুলোরই।
বহিরাগত কোনো শক্তির অযাচিত সামরিক বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এই স্পর্শকাতর অঞ্চলের পরিস্থিতিকে কেবল আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। তিনি প্রবল আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, আসন্ন ওমান বৈঠক আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্য একটি উন্মুক্ত আলোচনার চমৎকার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে, যা ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের দেশগুলোর নিজস্ব নিরাপত্তা উদ্বেগ ও সংকট নিরসনে একটি কার্যকর ও টেকসই পথ প্রশস্ত করবে।
এদিকে, ওমানে অনুষ্ঠেয় এই বহুল প্রতীক্ষিত বৈঠকের কূটনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে কথা বলেছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি। তিনি এই আঞ্চলিক বৈঠকটিকে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও গঠনমূলক কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
গণমাধ্যমের কাছে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তিনি বলেন, সোমবার ওমান সালতানাতে যে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী ও মৌলিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।
তার এই মন্তব্য প্রমাণ করে যে, ইরান এই অঞ্চলে নিজেদের কূটনৈতিক প্রভাব বলয় আরও বৃদ্ধি করতে সচেষ্ট। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালী বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের জন্য এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, এর স্বাভাবিক কার্যক্রম সামান্য ব্যাহত হলেও বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়ে যায়।
তেহরানের বর্তমান এই শর্তারোপ এবং ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে নতুন সামুদ্রিক পথ খোঁজার উদ্যোগ মূলত আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান আরও সুসংহত করার একটি সুপরিকল্পিত প্রয়াস। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বৃদ্ধির একটি কৌশল হিসেবেই দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।