মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬
৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পবিত্র মক্কায় হামলার বিরল সতর্কতা জারি করল সৌদি আরব

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:৪৩ পিএম

পবিত্র মক্কায় হামলার বিরল সতর্কতা জারি করল সৌদি আরব
ছবি : Collected

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই ইসলামের পবিত্রতম শহর মক্কায় সম্ভাব্য হামলার একটি অত্যন্ত বিরল ও অস্বাভাবিক সতর্কতা জারি করেছে সৌদি আরব। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) রিয়াদের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এই জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়।

 

তবে পরিস্থিতির দ্রুত মূল্যায়ন শেষে কিছুক্ষণ পরই তা আবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। মক্কার পাশাপাশি সৌদি আরবের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক শহর জেদ্দা এবং পার্বত্য শহর তাইফেও একই ধরনের সম্ভাব্য হামলার উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছিল।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক বহুমুখী সংঘাত শুরুর পর পবিত্র মক্কায় এ ধরনের প্রত্যক্ষ সতর্কতা জারির ঘটনা এটাই প্রথম। পবিত্র কাবা শরিফ অবস্থিত হওয়ায় মক্কা শহরটি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মুসলমানের কাছে সবচেয়ে পবিত্র, সংবেদনশীল ও আবেগের স্থান।

 

ফলে এ ধরনের সামরিক সতর্কতা আন্তর্জাতিক মহলে, বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক ও গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সতর্কতা দ্রুত প্রত্যাহার করা হলেও এটি ওই অঞ্চলের বর্তমান ভঙ্গুর ও অস্থিতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতির একটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।

 

গত কয়েক দিন ধরে সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে হুথি বিদ্রোহীরা বেশ কয়েকটি অত্যাধুনিক ড্রোন বা চালকবিহীন সামরিক বিমান ও শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।

 

চলমান এই সংঘাতের ধারাবাহিকতায় গত সোমবার ইয়েমেন সীমান্ত সংলগ্ন সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে চালানো এক আকস্মিক ও ভয়াবহ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত তেরোজন সাধারণ বেসামরিক নাগরিক আহত হন।

 

এই অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার পরপরই সৌদি আরবের সামরিক বাহিনী অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ইয়েমেনের ভেতরে হুথিদের লক্ষ্যবস্তুগুলোতে পাল্টা সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। সামরিক বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত দুই সপ্তাহ ধরে ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী ও সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের মধ্যে উত্তেজনা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

 

সীমান্তজুড়ে এ ধরনের পাল্টাপাল্টি আক্রমণ ও ধ্বংসযজ্ঞ বৃদ্ধির কারণে উভয় পক্ষের মধ্যে নতুন করে একটি সর্বাত্মক ও পূর্ণমাত্রার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এক গভীর চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

এদিকে, ইয়েমেনের রাজধানী সানা নিয়ন্ত্রণকারী হুথি বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, গত পাঁচ দিনে সৌদি আরবের সামরিক বাহিনী তাদের বিভিন্ন কৌশলগত অবস্থান লক্ষ্য করে তিন শতাধিক প্রলয়ঙ্করী বিমান হামলা চালিয়েছে।

 

সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামে প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক সামরিক বিবৃতিতে হুথিরা বিস্তারিতভাবে জানায়, সৌদি আরবের বিমানবাহিনী তাদের অত্যাধুনিক এফ-পনেরো যুদ্ধবিমান, ইউরোফাইটার টাইফুনসহ অন্যান্য শক্তিশালী ও আধুনিক সামরিক বিমান ব্যবহার করে এসব ব্যাপক ধ্বংসাত্মক আক্রমণ পরিচালনা করেছে।

 

ইয়েমেনের এই কট্টরপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীটি প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, রিয়াদ যদি তাদের এই আগ্রাসী সামরিক অভিযান ও বোমাবর্ষণ অব্যাহত রাখে, তবে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে এবং তারাও সৌদির অভ্যন্তরে গভীরে গিয়ে হামলার মাত্রা ও পরিধি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

 

নিজেদের এই প্রকাশ্য হুমকির বাস্তবায়ন ও সরাসরি পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে হুথি বিদ্রোহীরা ইতোমধ্যে সৌদি আরবের খামিস মুসাইত অঞ্চলে অবস্থিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাদশাহ খালিদ বিমানঘাঁটিতে বড় ধরনের সামরিক হামলার দাবি করেছে।

 

গোষ্ঠীটির সামরিক মুখপাত্রের আনুষ্ঠানিক দাবি অনুযায়ী, কয়েক ডজন অত্যাধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ওই বৃহৎ বিমানঘাঁটির সামরিক হ্যাঙ্গার বা যুদ্ধবিমান রাখার সুরক্ষিত স্থান, উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা রাডার ব্যবস্থা, প্রধান রানওয়ে এবং বিশাল অস্ত্রভাণ্ডারকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু করে এই আক্রমণ চালানো হয়েছে।

 

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলা এই সাম্প্রতিক উত্তেজনার একটি সুদীর্ঘ ও জটিল ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে সরকারবিরোধী ব্যাপক রাজনৈতিক ও সশস্ত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ইয়েমেনে এক প্রলয়ঙ্করী গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।

 

সে সময় হুথি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বৈধ সরকারকে জোরপূর্বক হটিয়ে রাজধানী সানাসহ দেশের এক বিশাল এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অংশ নিজেদের পূর্ণ দখলে নিয়ে নেয়।

 

এর ঠিক পরের বছর, অর্থাৎ ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সামরিক জোট ইয়েমেন সরকারের পক্ষে হুথিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে।

 

বছরের পর বছর ধরে চলা দীর্ঘ ও নির্মম এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত ইয়েমেনকে বিশ্বের অন্যতম চরম মানবিক সংকটের মুখে ঠেলে দেয়, যেখানে লাখ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষ ও মহামারির শিকার হয়। অবশেষে দীর্ঘ সামরিক অচলাবস্থার পর ২০২২ সালে জাতিসংঘের আন্তরিক মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

 

এরপর দীর্ঘ সময় ধরে উভয় পক্ষের মধ্যে হামলা ও পাল্টা হামলার মতো কোনো বড় সামরিক সংঘাতের ঘটনা ঘটেনি, যা ওই সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে কিছুটা হলেও সাময়িক স্বস্তি এনে দিয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ভূ-রাজনৈতিক নানা মেরুকরণের কারণে বহুল কাঙ্ক্ষিত সেই যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি কার্যত সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

 

নতুন করে শুরু হওয়া এই সামরিক উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি আক্রমণ পুরো মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে আবারও চরম অনিশ্চয়তার খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে।

 

- এএফপি