সোমবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় দেশটির প্রভাবশালী এই নীতিনির্ধারক বিশ্ব সম্প্রদায়কে সতর্ক করে বলেন, মার্কিন নেতৃত্বের বিভ্রান্তিকর ও স্ববিরোধী বক্তব্যে কান না দিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
এর আগে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে পারস্পরিক সংলাপ নিয়ে বিভিন্ন সময় পরস্পরবিরোধী মন্তব্য করা হলেও তেহরান তার অবস্থানে অনড় রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি মার্কিন প্রশাসনের দ্বিমুখী আচরণের বিস্তারিত তুলে ধরেন।
তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রায়শই অত্যন্ত বৈপরীত্যপূর্ণ অবস্থান প্রকাশ করা হয়। একদিকে যখন কোনো ধরনের সমঝোতা না করার হুংকার দেওয়া হয়, ঠিক পরমুহূর্তেই আবার আলোচনার টেবিলে বসার জন্য কূটনৈতিকভাবে ইচ্ছা প্রকাশ করা হয়।
রেজায়ির মতে, এই ধরনের দোলাচল এবং মিশ্র সংকেত মূলত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তি সৃষ্টির একটি কৌশল মাত্র। তিনি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও অংশীদারদের উদ্দেশে পরামর্শ দেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের ফাঁদে পা না দিয়ে তেহরানের ন্যায্য দাবির প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করা উচিত।
তিনি সাফ জানিয়ে দেন, সুনির্দিষ্ট পূর্বশর্তের সন্তোষজনক বাস্তবায়ন ছাড়া কোনো প্রকার আলোচনায় বসার প্রশ্নই ওঠে না। কৌশলগত সমুদ্রপথ এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের সংবেদনশীলতা তুলে ধরে ইরানের এই জ্যেষ্ঠ সামরিক ব্যক্তিত্ব আরও এক ধাপ এগিয়ে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক তেল বাণিজ্য ও গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থার সামগ্রিক ভূরাজনীতিতে বর্তমানে গভীর রূপান্তর ঘটেছে। এর ফলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য ঝুঁকির মাত্রা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
রেজায়ির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চলমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় উদ্ভূত সংকটগুলোর সামনে পশ্চিমা দেশগুলোর গৃহীত ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের গতানুগতিক অপচেষ্টা একেবারেই অকার্যকর প্রমাণিত হতে বাধ্য। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, ভবিষ্যতে যে বহুমুখী সংকট ধেয়ে আসছে, তা কেবল বাহ্যিক সান্ত্বনামূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে রোধ করা সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকদের অভিমত অনুযায়ী, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার সংক্রান্ত দ্বিপক্ষীয় অচলাবস্থার প্রেক্ষাপটে তেহরানের এই অনমনীয় মনোভাব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মার্কিন প্রশাসন যখন একদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগের কথা বলছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সামরিক উত্তেজনা প্রশমনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না, তখন ইরানের নিরাপত্তা প্রধানের এই প্রতিক্রিয়া কূটনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলল।
ফলে যেকোনো কূটনৈতিক অগ্রগতির পূর্বশর্ত হিসেবে ইরানের এই অবস্থানকে বিবেচনায় নেওয়া ছাড়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে বিকল্প কোনো পথ খোলা নেই বলেই মনে করা হচ্ছে। রেজায়ি তার বিবৃতির সমাপ্তি টানেন অত্যন্ত কঠোর ভাষায়।
তিনি ঘোষণা করেন, ইরানের উত্থাপিত শর্তাবলি বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত সংলাপের কোনো সুযোগ নেই এবং এটিই তেহরানের চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয় সিদ্ধান্ত। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা ওয়াশিংটন ও তেহরানের বৈরী সম্পর্কের ইতিহাসে এই ধরনের পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক অবস্থান নিয়মিত দৃশ্য হলেও বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার কারণে এই বক্তব্যটি বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই কঠোর বার্তার মাধ্যমে ইরান মূলত পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর ওপর কৌশলগত চাপ অব্যাহত রাখার নীতি গ্রহণ করেছে।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতা আগামী দিনগুলোতে কোন পথে ধাবিত হয়, তা এখন আন্তর্জাতিক মহলের গভীর পর্যবেক্ষণে রয়েছে।