ইরানের ইসলামি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর নৌ কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই উদ্বেগজনক তথ্য নিশ্চিত করেছে। একই দিনে ওই এলাকার আকাশসীমায় একটি অত্যাধুনিক চালকবিহীন সামরিক বিমান ভূপাতিত করার দাবিও জানিয়েছে ইরানি বাহিনী, যা ওই অঞ্চলের বিরাজমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সামরিক সূত্র ও সংবাদমাধ্যমের বিস্তারিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবার ভোরের দিকে নয় তিন দুই পাঁচ তিন তিন ছয় (৯৩২৫৩৩৬) নিবন্ধিত নম্বরের ‘আলগায়া’ নামের ওই বিশালাকায় তেলবাহী জাহাজটি হরমুজ প্রণালির দক্ষিণাংশের ওই বিশেষ জলসীমায় প্রবেশ করে, যা আগে থেকেই নৌ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল।
অননুমোদিত এই যাত্রাপথে অগ্রসর হওয়ার একপর্যায়ে জাহাজটি শক্তিশালী সামুদ্রিক বোমার আঘাতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের শিকার হয়। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর নৌ কর্তৃপক্ষের দেওয়া প্রাথমিক তথ্য অনুসারে, শক্তিশালী এই বিস্ফোরণের পরপরই জাহাজটিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটে।
আগুন নিয়ন্ত্রণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হলেও শেষ পর্যন্ত তা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। একপর্যায়ে আগুনের লেলিহান শিখা পুরো জাহাজটিকে সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করে নেয়। বিশাল এই জাহাজটিতে থাকা বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল সাগরের পানিতে মিশে যাওয়ার চরম ঝুঁকি দেখা দিয়েছে, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে আনতে পারে।
এই ঘটনার পর ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর নৌ কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত কঠোর ভাষায় একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রদান করেছে। বিবৃতিতে তারা সুস্পষ্টভাবে জোর দিয়ে বলেছে যে, এই নির্দিষ্ট অবৈধ জলপথটি ব্যবহারের বিপজ্জনক ও ধ্বংসাত্মক পরিণতি সম্পর্কে আগেই সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে বারবার সতর্ক করা হয়েছিল।
তারা আরও জানিয়েছে, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওই অংশটি বর্তমানে নৌ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে পুরো প্রণালিটি এখনো ইরানের নৌবাহিনীর অত্যন্ত সুচারু, বুদ্ধিদীপ্ত এবং সমন্বিত সামরিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে রয়েছে।
অননুমোদিত যেকোনো প্রবেশ যে কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে, মঙ্গলবারের এই ভয়াবহ ঘটনার মাধ্যমে তার একটি অত্যন্ত স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এদিকে, সমুদ্রে তেলবাহী জাহাজে বিস্ফোরণের এই ভয়াবহ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই একই দিন ইসলামি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর জনসংযোগ বিভাগ থেকে আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক পদক্ষেপের কথা প্রকাশ করা হয়েছে।
বাহিনীটি জানিয়েছে, মঙ্গলবার ভোরে হরমুজ প্রণালির পশ্চিমাংশের আকাশসীমায় একটি অত্যাধুনিক ‘এমকিউ-১’ কাঠামোর চালকবিহীন সামরিক বিমান অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করে। তৎক্ষণাৎ বাহিনীর মহাকাশ শাখার আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ইরানের সমন্বিত জাতীয় আকাশ সুরক্ষা ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় সেটি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে শনাক্ত হয়।
অনুপ্রবেশকারী এই চালকবিহীন সামরিক বিমানটিকে সম্পূর্ণ সফলভাবে ধ্বংস করে ভূপাতিত করা হয়েছে বলে ইরানি সামরিক বাহিনী নিশ্চিত করেছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্ব অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগত নৌপথ।
বিশ্বের মোট খনিজ তেলের একটি বিশাল অংশ প্রতিদিন এই সংকীর্ণ প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলে যেকোনো ধরনের সামরিক সংঘাত, বিস্ফোরণ বা জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটার ঘটনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক ও গভীর প্রভাব ফেলে।
তেলের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা এবং বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলে বিপর্যয়ের ভয় সবসময়ই এই নৌপথটিকে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখে। মঙ্গলবারের এই জোড়া সামরিক ঘটনা-তথা নিষিদ্ধ সীমানায় তেলবাহী জাহাজে বোমার আঘাত এবং অত্যাধুনিক চালকবিহীন বিমান ভূপাতিত করার বিষয়টি ওই অঞ্চলের নিরাপত্তাহীনতা এবং সামরিক উত্তেজনার একটি নতুন ও উদ্বেগজনক অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এবং সামরিক বিশ্লেষকরা এই পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। এই জলসীমায় ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বৃহত্তর সংঘাত এড়াতে বিশ্বনেতাদের দ্রুত ও কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা এখন আরও বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।