সেই ঝাঁকুনির মাত্রা এতটাই ভয়ংকর ও অস্বাভাবিক ছিল যে, কেবিনের ভেতরের ছাদের বা সিলিংয়ের আস্তরণ খসে পড়তে শুরু করে সরাসরি যাত্রীদের গায়ের ওপর। মুহূর্তের মধ্যেই এক ভীতিকর ও শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
সম্প্রতি ইরানের আকাশে ঘটা এমনই একটি রোমহর্ষক ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, যা দেখে শিউরে উঠছেন বিশ্বের নানা প্রান্তের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞরাও। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো অত্যন্ত গুরুত্ব ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে এই খবরটি প্রকাশ করেছে।
গত মঙ্গলবার ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ শহর মাশহাদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও ভয়াবহ ঘটনাটি সংঘটিত হয়। উড়োজাহাজটি ছিল ইরানের স্থানীয় বিমান পরিষেবা সংস্থা সেপেহরান এয়ারলাইন্সের একটি বোয়িং ৭৩৭ মডেলের যাত্রীবাহী বিমান।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, মাশহাদ থেকে উড্ডয়ন করে পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর কেরমানশাহের দিকে যাওয়ার কথা ছিল ফ্লাইটটির। কিন্তু রানওয়েতে গতি বাড়িয়ে আকাশে ডানা মেলার ঠিক পরপরই ঘটে যায় এক অভাবনীয় বিপত্তি।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন থেকে বিস্তারিত জানা যায়, উড্ডয়নের ঠিক পরপরই উড়োজাহাজটির একটি চাকায় প্রচণ্ড বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যখন সেই বিস্ফোরিত চাকার ধ্বংসাবশেষের বেশ কিছু টুকরো তীব্র বেগে ছিটকে গিয়ে উড়োজাহাজটির একটি সক্রিয় ইঞ্জিনের ভেতরে ঢুকে পড়ে।
এর ফলে মুহূর্তের মধ্যেই ইঞ্জিনটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সম্পূর্ণ বিকল হয়ে কাজ করা বন্ধ করে দেয়। একটি ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়ার সরাসরি ও তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে মাঝ আকাশে থাকা উড়োজাহাজটির সার্বিক ভারসাম্যের ওপর। প্রচণ্ড গতিতে উড়তে থাকা বিমানটির ভেতরে শুরু হয় তীব্র, একটানা ও অস্বাভাবিক ঝাঁকুনি।
যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সৃষ্ট এই কম্পন এতটাই তীব্র ছিল যে, কেবিনের ভেতরের প্লাস্টিক ও ফাইবার দিয়ে তৈরি ছাদের লাইনিং বা আস্তরণগুলো তাদের স্থান থেকে আলগা হয়ে যাত্রীদের মাথার ওপর ধসে পড়তে থাকে। এমন অভাবনীয় মৃত্যুভয়ে চারপাশ থেকে যাত্রীদের আর্তনাদ, চিৎকার ও কান্নার আওয়াজ ভেসে আসতে থাকে।
চরম আতঙ্কের সেই মুহূর্তেও উড়োজাহাজে উপস্থিত কোনো এক যাত্রী তার মোবাইল ক্যামেরায় এই ভয়াবহ দৃশ্যের ভিডিও ধারণ করতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই ভিডিওটি প্রকাশ করা হলে তা মুহূর্তের মধ্যেই বিশ্বজুড়ে ভাইরাল হয়ে যায়।
ওই ভিডিও ফুটেজে স্পষ্টভাবে দেখা যায় কীভাবে ছাদের অংশবিশেষ খসে পড়ছে এবং সাধারণ যাত্রীরা চরম অসহায়ত্ব ও আতঙ্কের মধ্যে সময় পার করছেন। এবারের মতো বড় ধরনের কোনো ভয়াবহ ট্র্যাজেডির হাত থেকে নিরীহ যাত্রীদের বাঁচাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেন উড়োজাহাজটির দায়িত্বপ্রাপ্ত পাইলট।
অত্যন্ত উঁচু মাপের পেশাদারিত্ব, অসীম ধৈর্য ও চরম সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে তিনি পরিস্থিতি দ্রুত নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। মাঝ আকাশে ইঞ্জিন বিকল হওয়া এবং সেই সঙ্গে বিমানের কাঠামোগত তীব্র কম্পনের মতো চরম প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও তিনি এতটুকু বিচলিত না হয়ে মাথা ঠান্ডা রাখেন।
পাইলট জরুরিভিত্তিতে আবারও উড্ডয়নস্থল মাশহাদ বিমানবন্দরেই ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন এবং এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেখানে জরুরি অবতরণের একটি অত্যন্ত সাহসী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
তার এই তাৎক্ষণিক, দক্ষ ও নিখুঁত সিদ্ধান্তের কারণেই শেষ পর্যন্ত একটি নিশ্চিত ধ্বংসযজ্ঞের হাত থেকে রক্ষা পায় বিমানটি এবং বেঁচে যায় অসংখ্য প্রাণ। মাশহাদ বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে যে, এই ভয়াবহ ঘটনায় উড়োজাহাজটির ইঞ্জিনের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও অত্যন্ত স্বস্তির বিষয় হলো, কোনো যাত্রী বা ক্রু সদস্য শারীরিকভাবে গুরুতর আঘাত পাননি বা হতাহত হননি।
জরুরি অবতরণের পর উদ্ধারকারী দলের সহায়তায় সবাই নিরাপদে মাটিতে নেমে আসতে সক্ষম হয়েছেন। তবে শারীরিকভাবে সুস্থ থাকলেও মাঝ আকাশের এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা যাত্রীদের মনে যে এক দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ভীতির সৃষ্টি করেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট এবং এনডিটিভির মতো গণমাধ্যমগুলো এই ঘটনার বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাণিজ্যিক বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে যান্ত্রিক নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বৈশ্বিক আলোচনার সূত্রপাত করেছে।
উড্ডয়নের আগে উড়োজাহাজের চাকা ও ইঞ্জিনের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ কতটা জরুরি, এই রোমহর্ষক ঘটনাটি বিমান পরিবহন সংস্থাগুলোর সামনে তারই একটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হয়ে রইল।