সৌদি জোটের বিবৃতি অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাত আনুমানিক নয়টা পঞ্চাশ মিনিটের দিকে এই ড্রোনটি নিক্ষেপ করা হয়। পবিত্র মক্কা নগরীর মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও সুরক্ষিত এলাকায় এ ধরনের হামলার প্রচেষ্টা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনায় নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করছে। এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ হুথিদের এই কথিত ড্রোন হামলার চেষ্টার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তিনি তাঁর দেশের গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
শেহবাজ শরিফ তাঁর বার্তায় উল্লেখ করেন, পবিত্র মক্কা শরিফে কাপুরুষোচিত ও জঘন্য ড্রোন হামলার অপচেষ্টার তিনি কঠোর ভাষায় নিন্দা জানাচ্ছেন। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় পাকিস্তানের জনগণ গভীরভাবে মর্মাহত এবং বিচলিত।
পাশাপাশি তিনি সৌদি আরবের প্রতি পাকিস্তানের অবিচল সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ সৌদি আরবের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার যেকোনো লড়াইয়ে পাকিস্তান সবসময় তাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাশে অবস্থান করবে।
অন্যদিকে, ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি বিদ্রোহীরা মক্কা নগরীতে ড্রোন হামলার এই গুরুতর অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে। তারা সৌদি আরবের এই দাবিকে একটি ‘ঘৃণ্য মিথ্যা’ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
হুথি গোষ্ঠীর রাজনৈতিক শাখার জ্যেষ্ঠ সদস্য হিজাম আল-আসাদ গণমাধ্যমের কাছে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় জানান, মক্কায় হামলার যে দাবি রিয়াদের পক্ষ থেকে করা হচ্ছে, তা সর্বৈব মিথ্যা। তিনি উল্লেখ করেন, এর আগেও তাদের বিরুদ্ধে এমন ভিত্তিহীন অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছিল।
তাঁর মতে, এ ধরনের বানোয়াট দাবি করে এখন আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বা সাধারণ মানুষকে ভুল বোঝানো সম্ভব নয়। সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট অবশ্য তাদের দাবিতে অনড় রয়েছে। জোটের পক্ষ থেকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় যে, পবিত্র মক্কা নগরীতে হুথিদের হামলার চেষ্টা এটাই প্রথম নয়।
এর আগে ২০১৭ সালের সাতাশে জুলাই হুথি বিদ্রোহীরা মক্কা লক্ষ্য করে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের মাধ্যমে হামলার অপচেষ্টা চালিয়েছিল বলে সৌদি আরব অভিযোগ করেছিল। মঙ্গলবারের ড্রোন নিক্ষেপের ঘটনাটিকে তারা মক্কায় দ্বিতীয়বারের মতো সন্ত্রাসী হামলার একটি জঘন্য অপপ্রয়াস হিসেবে বর্ণনা করেছে।
রিয়াদের দাবি, এ ধরনের কর্মকাণ্ড সমগ্র মুসলিম বিশ্বের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও উত্তেজনার শিকড় মূলত ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের গভীরে প্রোথিত।
২০১৪ সালে ইয়েমেনে যখন ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত হয়, তখন থেকেই সৌদি আরব এবং ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর মধ্যে এক প্রকাশ্য ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব চলে আসছে। ওই বছর সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠী হুথি ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে নিলে তৎকালীন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রেসিডেন্ট মনসুর আবদ-আল হাদি বাধ্য হয়ে প্রতিবেশী দেশ সৌদি আরবে পালিয়ে যান।
ক্ষমতাচ্যুত হাদি সরকারকে পুনরায় ইয়েমেনের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে ২০১৫ সাল থেকে ইয়েমেনে সরাসরি সামরিক অভিযান শুরু করে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফলে ইয়েমেনে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটের সৃষ্টি হয়।
দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর অবশেষে ২০২২ সালে জাতিসংঘের প্রত্যক্ষ মধ্যস্থতায় সৌদি আরব এবং হুথি গোষ্ঠীর মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এই চুক্তির ফলে দীর্ঘ প্রায় চার বছর ইয়েমেনে তুলনামূলকভাবে একটি স্থিতিশীল ও শান্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছিল।
কিন্তু সম্প্রতি সেই শান্তিতে আবারও চিড় ধরেছে। গত তেরোই জুলাই ইয়েমেনের রাজধানী সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইয়েমেনি বাহিনীর একটি অতর্কিত হামলার পর থেকে উভয় পক্ষের মধ্যে নতুন করে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যেই মক্কায় ড্রোন হামলার অভিযোগ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও একবার খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে।