আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন যে, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে (এনপিটি) স্বাক্ষরকারী প্রথম সারির ও প্রতিষ্ঠাকালীন দেশগুলোর মধ্যে ইরান অন্যতম এবং শুরু থেকেই এই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির মূলনীতির প্রতি তেহরান গভীরভাবে ও অবিচলভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সমসাময়িক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং বৈশ্বিক পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে চলমান উত্তেজনার মাঝে তাঁর এই ভারসাম্যপূর্ণ অথচ বলিষ্ঠ বক্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত এই শীর্ষ সম্মেলনে উপস্থিত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদের সামনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বেহরুজ কামালভান্দি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী ও আক্রমণাত্মক বৈরী নীতির অত্যন্ত কড়া সমালোচনা করেন।
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ঐতিহাসিকভাবে স্মরণ করিয়ে দেন যে, স্বাধীন ও সার্বভৌম ইরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের ধারাবাহিক শত্রুতার এক অত্যন্ত দীর্ঘ, করুণ ও তিক্ত ইতিহাস রয়েছে।
তাঁর সুস্পষ্ট অভিযোগ, গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নগ্ন হস্তক্ষেপ, গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানোর ষড়যন্ত্র, ধারাবাহিক রাজনৈতিক গুপ্তহত্যা, নানামুখী উসকানি এবং সর্বোপরি গত শতাব্দীর আশির দশকে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী ইরান-ইরাক যুদ্ধে সাদ্দাম হোসেনের আগ্রাসী সরকারের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ ও প্রত্যক্ষ সামরিক সমর্থন প্রদান-এগুলো সবই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক বৈরী, আধিপত্যবাদী ও আগ্রাসী নীতির সুস্পষ্ট বাস্তব প্রতিফলন।
তিনি মনে করেন, এই ধরনের ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপগুলো কেবল ইরানের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যই নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও শান্তির জন্য চরম হুমকিস্বরূপ ছিল।
পারমাণবিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা বিশ্ব কর্তৃক ইরানের ওপর আরোপিত দীর্ঘস্থায়ী, অন্যায্য অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের কথা অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে উল্লেখ করে কামালভান্দি বলেন, গত পঁচিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁর দেশ এই সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও একতরফা আন্তর্জাতিক চাপ অত্যন্ত সাহসিকতা, ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মোকাবিলা করে আসছে।
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থার প্রতি গভীর সম্মান জানিয়ে ইরান সবসময় যেকোনো সংকট সমাধানে গঠনমূলক ও অর্থবহ আলোচনার পথ খোলা রেখেছে এবং ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন (জেসিপিওএ) বা পরমাণু সমঝোতা চুক্তির মতো যুগান্তকারী আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রতি সবসময় শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল।
তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে অভিযোগ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণ একতরফা, অযৌক্তিক ও বেআইনিভাবে এই ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেওয়ার পরও, তেহরান বৈশ্বিক শান্তির বৃহত্তর স্বার্থে প্রায় দেড় বছর ধরে এককভাবে চুক্তির প্রতিটি শর্ত অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে বাস্তবায়ন করে গেছে।
কিন্তু বিনিময়ে তারা পেয়েছে কেবল নতুন নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও বঞ্চনা। আইএইএ-এর মতো একটি কারিগরি ও নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক সংস্থাকে পশ্চিমা পরাশক্তিগুলো কর্তৃক রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারেরও তীব্র সমালোচনা করেন এই শীর্ষ ইরানি পরমাণু কর্মকর্তা।
তিনি জোরালো দাবি করেন, বিভিন্ন সরকারবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠী, নির্বাসিত সংগঠন এবং বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সুকৌশলে সরবরাহ করা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন তথ্যের ওপর নির্ভর করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে কাল্পনিক প্রতিবেদন ও হয়রানিমূলক মামলা তৈরি করা হয়েছে।
তাঁর মতে, আইএইএ-এর কারিগরি সক্ষমতা ও আইনি কাঠামোকে নিছক অপব্যবহার করে তেহরানের ওপর অবর্ণনীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ইরানের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বিপন্ন করতে সর্বাত্মক অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ, শীর্ষ ও মেধাবী পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের অত্যন্ত নির্মমভাবে গুপ্তহত্যা এবং দেশের অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্পখাতে সাইবার হামলাসহ বিভিন্ন নাশকতা চালানোর মতো ন্যক্কারজনক পরিস্থিতি সুকৌশলে তৈরি করা হয়েছে বলে তিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে অত্যন্ত জোরালোভাবে অভিযোগ উত্থাপন করেন।
নিজেদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়েও তেহরানের অত্যন্ত যৌক্তিক ও আইনগত অবস্থান তুলে ধরেন কামালভান্দি। তিনি বিশ্ববাসীকে জানান যে, ইরান দীর্ঘকাল ধরে নানামুখী সামরিক আগ্রাসন ও নিরাপত্তাগত হুমকির এক চরম বৈরী পরিবেশের মধ্যে বসবাস করছে।
এই ধরনের একটি অস্থিতিশীল ও হুমকিপূর্ণ পরিবেশে নিজেদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, ব্যয়বহুল এবং সংবেদনশীল পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে যেকোনো সম্ভাব্য বিদেশি সামরিক হামলা বা অভ্যন্তরীণ নাশকতার হাত থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখার জন্য সর্বোচ্চ প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেকোনো স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং এটি আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তাদের অবিচ্ছেদ্য আত্মরক্ষামূলক অধিকার।
তিনি পশ্চিমাদের দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্মরণ করিয়ে দেন যে, নিজস্ব বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা ব্যবহার করে প্রযুক্তির স্বাধীন বিকাশ সাধন করা যেকোনো মর্যাদাশীল জাতির মৌলিক অধিকার, যা থেকে তাদের কিছুতেই বঞ্চিত করা যায় না।
বক্তব্যের উপসংহারে বেহরুজ কামালভান্দি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন যে, সমসাময়িক বিশ্বের কোনো পরাশক্তিই ইরানের শিল্পখাত, জ্ঞানভিত্তিক ও গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান এবং শান্তিকামী পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর কোনো ধরনের সামরিক বা সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে দেশটির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অপ্রতিরোধ্য ও স্বনির্ভর অগ্রযাত্রাকে কখনোই থামাতে পারবে না।
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই মর্মে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দেন যে, অন্যায় সামরিক আগ্রাসন, চোরাগোপ্তা নাশকতা কিংবা মেধাবী বিজ্ঞানীদের গুপ্তহত্যার মতো অত্যন্ত কাপুরুষোচিত ও ঘৃণ্য পথ বেছে নিয়ে স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল ইরানের পারমাণবিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুদৃঢ় ভিত্তিকে ধ্বংস করা একেবারেই অসম্ভব একটি বিষয়।
পশ্চিমা বিশ্বের নানামুখী আন্তর্জাতিক চাপ, অর্থনৈতিক অবরোধ ও নিরন্তর সামরিক হুমকির মুখেও ইরান কখনোই মাথা নত করবে না এবং নিজেদের সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির চর্চার আইনগত অধিকার থেকে একচুলও সরে আসবে না বলে তিনি তাঁর ভাষণে অত্যন্ত দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।