বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ও ব্যস্ততম নৌপথ হিসেবে পরিচিত লোহিত সাগর এবং বাব এল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল ও পণ্যবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল মারাত্মক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল।
ঠিক এমন এক উত্তেজনাকর ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মাঝেই ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি এক গোপন বৈঠকে বসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শান্তিকামী ও নিরপেক্ষ রাষ্ট্র ওমানের রাজধানী মাস্কাটে এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও কৌশলগত বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো নিশ্চিত করেছে।
বুধবার, ১৬ই সেপ্টেম্বর, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও সামরিক বিষয়টির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট অন্তত পাঁচটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্স তাদের এক বিশেষ ও বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করে।
অন্যদিকে, ফরাসি বার্তাসংস্থা এএফপি তাদের নিজস্ব প্রতিবেদনে আরও বিস্তারিত তথ্য জানিয়ে বলেছে যে, সম্পূর্ণ গোপনীয়তা বজায় রেখে এবং প্রকাশ্যে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক পূর্বঘোষণা ছাড়াই গত রোববার এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
মাস্কাটে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব দূতাবাসের অত্যন্ত সুরক্ষিত ভবনে অনুষ্ঠিত এই সরাসরি আলোচনায় প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ওমান সরকার। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ওমানের এই গঠনমূলক ও নিরপেক্ষ অবস্থান বরাবরই বিশ্ব নেতাদের কাছে প্রশংসিত হয়ে আসছে।
কূটনৈতিক এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে হুথি প্রতিনিধিরা যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি কর্মকর্তাদের একটি সুনির্দিষ্ট, খোলামেলা ও স্পষ্ট বার্তা প্রদান করেছেন। তারা মার্কিনিদের সম্পূর্ণভাবে আশ্বস্ত করে বলেছেন যে, লোহিত সাগর, এডেন উপসাগর বা এর আশেপাশের আন্তর্জাতিক জলসীমায় চলাচলকারী যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বা তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো জাহাজে হামলা চালানোর বিন্দুমাত্র পরিকল্পনা তাদের নেই।
এর পাশাপাশি অত্যন্ত বিস্ময়করভাবে তারা এটিও জানিয়েছে যে, ইসরায়েলের মালিকানাধীন কিংবা ইসরায়েলি পণ্য পরিবহনকারী কোনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের ওপরও তারা আপাতত কোনো ধরনের সামরিক আক্রমণ চালাবে না বলে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে।
তবে হুথিরা অত্যন্ত কঠোর ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক নৌপথে চলাচলকারী কোনো জাহাজ যদি সরাসরি সৌদি আরবের মালিকানাধীন হয় অথবা সেই জাহাজে যদি সৌদির কোনো ধরনের পণ্য বা রসদ পরিবহন করা হয়, তবে সেই নির্দিষ্ট জাহাজকে কোনো অবস্থাতেই বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না।
অর্থাৎ, সমুদ্রে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থের ওপর তাদের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ ও আক্রমণ অব্যাহত থাকবে। এই অভাবনীয় কূটনৈতিক সমঝোতা এবং হুথিদের নমনীয়তার পেছনে রয়েছে নিকট অতীতের কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।
উল্লেখ্য, বিগত ২০২৫ সালে হুথি বিদ্রোহীদের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা, অস্ত্রাগার ও রাডার স্টেশনগুলো লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় টানা দুই মাস ধরে অত্যন্ত ভয়াবহ ও ব্যাপক পরিসরে বিমান হামলা চালিয়েছিল।
সেই ধ্বংসাত্মক সামরিক সংঘাতের পর ওই বছরের মে মাসে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপে এবং উভয় পক্ষের সম্মতিতে একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। রোববারের মাস্কাট শহরের গোপন বৈঠকে হুথিরা মার্কিনিদের স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, তারা এখনো সেই মে মাসে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্তগুলোর প্রতি সম্পূর্ণভাবে ও আন্তরিকতার সাথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে।
আর ঠিক এই কারণেই তারা স্বেচ্ছায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো রাষ্ট্রীয়, সামরিক বা বাণিজ্যিক স্বার্থের ওপর আঘাত হানবে না বলে কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। বৈঠকে উপস্থিত ইয়েমেনি একটি বিশ্বস্ত সূত্র আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, হুথিরা যুক্তরাষ্ট্রকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ইসরায়েলসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষ দেশের জাহাজেও অকারণে হামলা চালানোর কোনো ইচ্ছা তাদের নেই।
তাদের বর্তমান সামরিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্যবস্তু কেবলমাত্র সৌদি আরব এবং তাদের মিত্রদের সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের প্রকাশ্য বক্তব্য থেকেও এই গোপন যোগাযোগের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে গণমাধ্যমের সামনে আলাপকালে প্রথম প্রকাশ করেছিলেন যে, হুথি বিদ্রোহীরা নিজেদের স্বার্থেই তাদের সঙ্গে নিজ উদ্যোগে যোগাযোগ করেছে।
হুথিদের মূল উদ্দেশ্য হলো, সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই রক্তক্ষয়ী আঞ্চলিক দ্বন্দ্বে যুক্তরাষ্ট্র যেন কোনোভাবেই নতুন করে সামরিকভাবে জড়িয়ে না পড়ে এবং নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখে।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পরপরই গত সোমবার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স প্রকাশ্যে গণমাধ্যমের কাছে নিশ্চিত করেন যে, তারা মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি রক্ষায় হুথিদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
যদিও রাষ্ট্রীয় কৌশলগত নিরাপত্তার কারণে তিনি তখন এই আলোচনার বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করতে রাজি হননি। তবে শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর নিবিড় অনুসন্ধানে ওমানে অনুষ্ঠিত এই রুদ্ধদ্বার ও গোপন বৈঠকের খবরটি বিশ্ববাসীর সামনে চলে আসে, যা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে এক নতুন ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মাত্রা যোগ করেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।