বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৬
১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে চীনের সঙ্গে বৈঠকে বসছে যুক্তরাষ্ট্র

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৬:২৪ পিএম

ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে চীনের সঙ্গে বৈঠকে বসছে যুক্তরাষ্ট্র
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখা এবং দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে চীনের উচ্চপদস্থ নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসতে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

 

চলতি সপ্তাহেই চীনের উপ-প্রধানমন্ত্রী হি লিফেংয়ের সঙ্গে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হবেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বলয় সুদৃঢ় রাখা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির স্পর্শকাতর দিকগুলো সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে দুই পরাশক্তির মধ্যকার এই সম্ভাব্য বৈঠকটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।

 

গত মঙ্গলবার মার্কিন আইনসভার নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ‘হাউস ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস কমিটি’র এক গুরুত্বপূর্ণ শুনানিতে অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট নিজেই এই বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

 

শুনানিতে আইনপ্রণেতাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তিনি জানান, তেহরান যাতে কোনোভাবেই আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ও বাণিজ্য চ্যানেল ব্যবহার করে মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে বেইজিংয়ের সঙ্গে ইতিমধ্যে ফলপ্রসূ প্রাথমিক কূটনৈতিক যোগাযোগ সম্পন্ন হয়েছে।

 

তিনি জোর দিয়ে বলেন, উপ-প্রধানমন্ত্রী হি লিফেংয়ের সঙ্গে আসন্ন মুখোমুখি বৈঠকে এই প্রক্রিয়ার অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে এবং নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দেওয়ার প্রতিটি পথ বন্ধ করতে আলোচনাকে আরও সুসংহত কাঠামোর রূপ দেওয়া হবে।

 

মার্কিন অর্থমন্ত্রী আইনপ্রণেতাদের আরও অবহিত করেন যে, তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বহুগুণ বৃদ্ধি করতে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে ইরানের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত তিনটি আন্তর্জাতিক ব্যাংকের বিরুদ্ধে নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

 

একই সঙ্গে এই বৈঠকটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। কূটনৈতিক সূচি অনুযায়ী, আগামী ২৪শে সেপ্টেম্বর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বহুল আলোচিত ওয়াশিংটন সফর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

 

সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর এক শীর্ষ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। প্রেসিডেন্টদের এই উচ্চপর্যায়ের আনুষ্ঠানিক আলোচনার ঠিক প্রাক্কালে দুই দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের এই রুদ্ধদ্বার বৈঠক সামগ্রিক সমঝোতার পথ প্রশস্ত করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

 

ইরান ইস্যু ছাড়াও আলোচনায় অন্যান্য কৌশলগত ও প্রযুক্তিগত বিষয় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে। বিশেষ করে বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তিগত আধিপত্যের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংক্রান্ত নীতি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা নিয়েও দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে মতবিনিময় হতে পারে।

 

যদিও বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে ঠিক কোন বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, সে সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বেসেন্ট জনসমক্ষে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করতে রাজি হননি। তবে এর আগে তিনি ইরানের অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর একটি নির্ণায়ক আঘাত বা তথাকথিত ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ পরিচালনার কথা ঘোষণা করেছিলেন।

 

একই সঙ্গে যেকোনো মূল্যে তেহরানের আন্তর্জাতিক রাজস্ব প্রবাহ কঠোরভাবে সংকুচিত করার প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন তিনি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে চীনের ভূমিকা ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

দীর্ঘ সময় ধরে নানামুখী অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত থাকা সত্ত্বেও বেইজিং বরাবরই তেহরানের অন্যতম শীর্ষ অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছে। ইরানের উৎপাদিত অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের একটি বিশাল অংশ নিয়মিতভাবে ক্রয় করে থাকে চীনা সরকারি ও বেসরকারি তেল শোধনাগারগুলো।

 

কেবল অর্থনৈতিক লেনদেনই নয়, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কূটনৈতিক মঞ্চেও দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে বলিষ্ঠ রাজনৈতিক সমর্থন ও সুরক্ষা জুগিয়ে আসছে বেইজিং। ফলে ওয়াশিংটনের একতরফা নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে চীনের প্রত্যক্ষ সহায়তা পাওয়া মার্কিন প্রশাসনের জন্য এক বিশাল কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের এই উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় যেমন ইরানের তেল বিক্রির অর্থপ্রবাহ বন্ধ করার মতো জটিল বিষয়গুলো উঠে আসবে, তেমনি ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সামগ্রিক বাণিজ্যিক স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টাও দৃশ্যমান হবে।

 

ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি যখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে শি জিনপিং প্রশাসনের এই অর্থনৈতিক কূটনীতি কেবল তেহরানের ওপর নিষেধাজ্ঞার ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে না, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং দুই বৃহৎ পরাশক্তির ভবিষ্যৎ ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কের গতিপ্রকৃতিও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করবে।

 

- রয়টার্স