গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক বিশেষ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় তিনি এই আশা জাগানিয়া ইঙ্গিত প্রদান করেন।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা জোরালোভাবে মনে করছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি বড় ধরনের স্বস্তির বার্তা বয়ে আনতে পারে। বিশেষ করে যখন সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ও চরম অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন এই ধরনের ঘোষণা বিশ্ব অর্থনীতি এবং বিশ্বশান্তির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
হোয়াইট হাউসে উপস্থিত দেশি-বিদেশি সংবাদকর্মীদের উদ্দেশ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সরাসরি বলেন, “আমরা সম্ভবত যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছি। তারা একটি চুক্তি করতে চায়। দেখা যাক, কী হয়।”
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত কিন্তু সুদূরপ্রসারী ও তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্যটি পরিষ্কারভাবে এই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, পর্দার আড়ালে দুই দীর্ঘস্থায়ী বৈরী রাষ্ট্রের মধ্যে কোনো না কোনো ধরনের কূটনৈতিক সমঝোতার প্রচেষ্টা বর্তমানে সক্রিয়ভাবে চলমান রয়েছে।
সাংবাদিকদের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প আরও নিশ্চিত করেছেন যে, তিনি ইত্যবসরে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছ থেকে একটি ‘সরাসরি’ বার্তা পেয়েছেন। তবে এই বার্তার মূল বিষয়বস্তু ঠিক কী ছিল বা এর সম্ভাব্য শর্তগুলো কেমন হতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য গণমাধ্যমের সামনে প্রকাশ করতে তিনি সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানান।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল গভীরভাবে ধারণা করছে যে, বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় এবং আলোচনার প্রাথমিক স্তরে থাকায় এই মুহূর্তে বার্তাটির সর্বোচ্চ গোপনীয়তা বজায় রাখা হচ্ছে, যাতে শান্তি প্রক্রিয়া কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়।
অন্যদিকে, এই যুদ্ধ-পরবর্তী ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক কৌশলগত রূপরেখা নতুন করে নির্ধারণে মার্কিন প্রশাসন ইতিমধ্যে তাদের কূটনৈতিক তৎপরতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামধন্য ও নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম এক্সিওস সে দেশের ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রকাশ করা এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, আগামী সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের ছয়টি অত্যন্ত প্রভাবশালী দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে একটি উচ্চ পর্যায়ের ও অত্যন্ত রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হতে যাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
মূলত সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত এবং ওমানের মতো অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র দেশগুলোর শীর্ষ প্রতিনিধিরা এই বৈঠকে সশরীরে উপস্থিত থাকবেন বলে জোরালো আশা করা হচ্ছে।
এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী কূটনৈতিক আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক ও চূড়ান্ত অবসানের পর সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলকে ঘিরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত পরিকল্পনাগুলো নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করা এবং মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সেই পরিকল্পনাগুলোর সর্বোচ্চ সমন্বয় সাধন করা।
আসন্ন এই বহুল আলোচিত বহুপাক্ষিক বৈঠক এবং এর সুনির্দিষ্ট আলোচ্যসূচি সম্পর্কে আরও বিশদ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য জানতে এক্সিওসের অনুসন্ধানী সংবাদকর্মীরা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং হোয়াইট হাউসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিলেন।
তবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও নিরাপত্তাজনিত এই কূটনৈতিক তৎপরতার বিষয়ে কোনো মার্কিন প্রশাসনিক কর্মকর্তাই আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ খুলতে রাজি হননি। উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসকে বদলে দেওয়া এই ভয়াবহ সংঘাতের সূচনা হয়েছিল চলতি বছরের গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন তেহরানের অভ্যন্তরে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলি বাহিনীর এক আকস্মিক, অভাবনীয় ও যৌথ সামরিক হামলার ঘটনা ঘটে।
তবে এই নজিরবিহীন সংঘাত শুরুর মাত্র দ্বিতীয় দিনেই, অর্থাৎ ২ মার্চ একটি কৌশলগত পরিবর্তনের মাধ্যমে ইসরায়েল ইরানমুখী সম্মুখ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিজেদের আংশিকভাবে গুটিয়ে নিয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র লেবাননের অভ্যন্তরে তাদের নতুন সামরিক অভিযান শুরু করে।
এর ফলে মূল রণাঙ্গনের সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় ওয়াশিংটন ও তেহরান। চলমান এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই চলতি সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাত সপ্তম মাসে পদার্পণ করেছে।
দীর্ঘ এই সাত মাসের নিরবচ্ছিন্ন ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলাকালে ওয়াশিংটন এবং তেহরান আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় মোট দু’বার আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে উপনীত হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, উভয় ক্ষেত্রেই সেই শান্তি চুক্তিগুলো বেশি দিন স্থায়ী হয়নি এবং পারস্পরিক আস্থার অভাবে তা ভেঙে গিয়ে পুনরায় ভয়াবহ সহিংসতা শুরু হয়।
গত বেশ কিছুদিন ধরে দুই দেশের মধ্যকার সব ধরনের আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক কূটনৈতিক যোগাযোগ কার্যত সম্পূর্ণভাবে স্থবির ও অচলাবস্থার পর্যায়ে রয়েছে। ঠিক এমন একটি চরম উত্তেজনাকর, সংঘাতময় এবং অস্থিতিশীল মুহূর্তে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছ থেকে আসা এই নতুন চুক্তির সম্ভাবনা ও সরাসরি বার্তার খবর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনে যুদ্ধ অবসানের এক ক্ষীণ কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের মূল প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত এই তথ্যাবলি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, দীর্ঘদিনের সংঘাত ভুলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ খুব শিগগিরই একটি সম্পূর্ণ নতুন ও শান্তিপূর্ণ বাঁক নিতে যাচ্ছে।