লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী এই অঞ্চলে হুথিদের নজিরবিহীন অগ্রগতি রিয়াদের চরম গোয়েন্দা ব্যর্থতা, ইয়েমেনি মিত্রদের আকস্মিক পতন এবং মার্কিন নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির দুর্বলতাকে একেবারে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে।
বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান এই সামুদ্রিক রুটের আশপাশের দ্বীপগুলো হাতছাড়া হওয়ার পর রিয়াদ এখন মরিয়া হয়ে নতুন মিত্র খুঁজছে, অন্যদিকে এই অঞ্চলে ইরান ও তার মিত্রদের প্রভাব ক্রমশ বেড়েই চলেছে।
পশ্চিমা ও আঞ্চলিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং ইয়েমেনি সূত্রগুলো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে, হুথিদের এই আকস্মিক সাফল্যের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। হুথি-বিরোধী জোটের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ কোন্দল, সংযুক্ত আরব আমিরাতের শক্তিশালী কমান্ডের বদলে সৌদি আরবের তুলনামূলক অনভিজ্ঞ নেতৃত্ব, সীমিত বিমান সহায়তা এবং সর্বোপরি হুথিদের সামরিক প্রস্তুতিকে অবমূল্যায়ন করাই রিয়াদের এই বিপর্যয়ের মূল কারণ।
এক পশ্চিমা কূটনীতিক জানিয়েছেন, হুথিরা অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে প্রায় এক লাখ যোদ্ধার একটি বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করেছিল, যা সংখ্যায় বিরোধী পক্ষের চেয়ে অনেক বেশি। সৌদি আরবসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই এত বড় সৈন্য সমাবেশের বিষয়টি আঁচ করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
লন্ডনের প্রখ্যাত গবেষণাগার চ্যাথাম হাউসের ফেলো নিল কুইলিয়াম এই ঘটনাকে একটি চরম গোয়েন্দা ব্যর্থতা আখ্যা দিয়ে বলেছেন, তারা কোনো সংকেতই ধরতে পারেনি বা কোনো লক্ষণই তাদের চোখে পড়েনি। ইয়েমেনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফারিয়া আল-মুসলিমীর মতে, এই হামলায় সৌদি আরব একেবারেই অপ্রস্তুত অবস্থায় ধরা খেয়েছে।
সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর এই আকস্মিক পতনের ফলে হুথিরা কেবল কৌশলগত ভূখণ্ডই দখল করেনি, বরং পিছু হটার সময় ফেলে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রও তাদের হস্তগত হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজনৈতিক বিশ্লেষক আব্দুলখালেক আব্দুল্লাহ বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করে বলেন, ইয়েমেন সরকারের বাহিনী তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। তারা বিন্দুমাত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি, তারা ছিল পুরোপুরি অকার্যকর।
এই ঘটনা প্রমাণ করেছে যে, হুথিদের বিরুদ্ধে কোনো পাল্টা আক্রমণ চালানোর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন এখন কতটা সীমিত। পশ্চিমা সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র বা কোনো ইউরোপীয় দেশ সরাসরি সামরিক সহায়তা দিতে মোটেই প্রস্তুত নয়।
এমনকি ওয়াশিংটন ও তার মিত্ররা সম্প্রতি ঘোষিত সৌদি-নেতৃত্বাধীন সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটেও যোগ দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে। হুথিরা বর্তমানে এমন একটি বিশাল ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে, যা সরাসরি সৌদি আরবের তেল রপ্তানি এবং লোহিত সাগরের আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য বড় ধরনের হুমকি।
ওয়াশিংটন সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকৃতি জানানোর পর ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় সহায়তা চাইতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মিসরের দ্বারস্থ হয়েছেন। ২০১৫ সালে কায়রোর যে নৌ ও বিমান বাহিনী বাব আল-মানদাব সুরক্ষায় অংশ নিয়েছিল, সেই স্মৃতিকে কাজে লাগিয়ে রিয়াদ আবারও তাদের এই অভিযানে যুক্ত করতে চাইছে।
তবে এই চরম সংকটের মুহূর্তে হুথিরা তাদের সামরিক সাফল্যকে রাজনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। সাবেক মার্কিন মধ্যস্থতাকারী ডেনিস রস জানিয়েছেন, গোষ্ঠীটি এখন হুদাইদাহ বন্দর ও সানা বিমানবন্দরের ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দাবি করছে।
তবে তাঁর মতে, রিয়াদ এত সহজেই এই ধরনের অপমানজনক দাবির কাছে মাথা নত করবে না। উপসাগরীয় এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মতে, হুথিদের ওপর পর্যাপ্ত আঘাত হানতে ব্যর্থ হলে তাদের কাছে চিরকাল জিম্মি হয়ে থাকতে হবে।
বাব আল-মানদাব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে চলে যাওয়ার অর্থ হলো, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালিতে ইরানের আগে থেকেই থাকা প্রভাবের সঙ্গে এটি যুক্ত হওয়া। এটি ইরান ও তার মিত্রদের দুটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পয়েন্টের ওপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ এনে দিয়েছে।
বিশ্লেষক ফারিয়া আল-মুসলিমী একে ইরানের জন্য একটি সব দিকের জয় হিসেবে অভিহিত করেছেন। ওয়াশিংটনের সহায়তা করতে অস্বীকৃতি জানানোকে তিনি গত কয়েক দশকের মধ্যে সৌদি-মার্কিন সম্পর্কের সবচেয়ে বড় প্রত্যাখ্যান হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, আমেরিকানরা এখন সরাসরি না বলে দিচ্ছে।
রিয়াদ ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার সম্পর্ক এর আগে কখনোই এত বড় পরীক্ষার মুখে পড়েনি। বহিঃশক্তির জন্য ইয়েমেন বরাবরই একটি কঠিন রণাঙ্গন। ১৯৬০-এর দশকে মিসর থেকে শুরু করে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব-সবাইকেই এই ভূখণ্ডে চরম মূল্য দিতে হয়েছে।
মুসলিমী ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে বলেন, ইয়েমেন হলো পরাশক্তিগুলোর জন্য আরেক ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তান। বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ এখানে বারবার ব্যর্থ হয়েছে এবং এটি বিদেশি আকাঙ্ক্ষার এক পরিচিত কবরস্থান হিসেবেই ইতিহাসে চিরকাল রয়ে গেছে।