ইরানের অভিজাত সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সরাসরি অভিযোগ করেছে যে, যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের কৌশলগত ও সামরিক পরাজয় আড়াল করার হীন উদ্দেশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিয়ত হলিউড চলচ্চিত্রের ন্যায় রোমাঞ্চকর কিন্তু সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন গল্পের অবতারণা করছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রচারিত মার্কিন বিবরণীকে চরম অবাস্তব ও কল্পনানির্ভর বলে আখ্যায়িত করে প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। এই ঘটনার সূত্রপাত ঘটে ইরানি ভূখণ্ডে একটি মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার মধ্য দিয়ে।
এই ঘটনার পরপরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় সম্প্রচার মাধ্যম সিবিএস নিউজের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও বহুল আলোচিত ‘সিক্সটি মিনিটস’ অনুষ্ঠানে ওই যুদ্ধবিমানের পাইলটকে উদ্ধারের একটি রোমাঞ্চকর বিবরণ প্রচার করা হয়।
মার্কিন গণমাধ্যমের ওই বিস্তারিত প্রতিবেদনে ‘ব্রাভো’ কলসাইনধারী সেই পাইলটের উদ্ধার অভিযানকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, শ্বাসরুদ্ধকর এবং চরম কঠিন এক সামরিক অভিজ্ঞতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। সেখানে পুরো ঘটনাটিকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি বিশাল, বীরত্বপূর্ণ ও সফল উদ্ধার অভিযান হিসেবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়।
কিন্তু আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি এই সম্পূর্ণ মার্কিন আখ্যানকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন, মার্কিন গণমাধ্যমে ওই পাইলটকে উদ্ধারের যে চাঞ্চল্যকর কাহিনি প্রচার করা হয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রের প্রকৃত বাস্তবতার সঙ্গে তার বিন্দুমাত্র কোনো মিল বা সম্পর্ক নেই।
তিনি মার্কিন এই প্রচারণাকে পুরোপুরি ‘সিনেমার মতো সাজানো গল্প’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর সামনে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক সামরিক ও মিডিয়া কৌশলের কড়া সমালোচনা করেন।
তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, নিজেদের সামরিক ব্যর্থতা ও পরাজয়ের গ্লানি ঢাকতে এ ধরনের কাল্পনিক ও চমকপ্রদ গল্প তৈরি করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো নতুন বা আকস্মিক বিষয় নয়। বরং এটি তাদের দীর্ঘদিনের পুরোনো এক মজ্জাগত অভ্যাস।
যখনই তারা যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো ধরনের বিপর্যয় বা চরম পরাজয়ের সম্মুখীন হয়, তখনই তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য চলচ্চিত্রের দৃশ্যের মতো সাজানো ও নাটকীয় কাহিনি তৈরি করে।
আইআরজিসির এই শীর্ষ মুখপাত্রের মতে, পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের অপকৌশল ও মিডিয়া প্রোপাগান্ডা এখন এতটাই পুরোনো ও একঘেয়ে হয়ে গেছে যে, বিশ্বের সচেতন মানুষের কাছে তা আর কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য বা বিশ্বাসযোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছে না।
আধুনিক যুগে যুদ্ধক্ষেত্রের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভার্চুয়াল জগতেও যে সমান্তরালভাবে এক অদৃশ্য যুদ্ধ চলমান, সে বিষয়েও গভীর আলোকপাত করেছেন আইআরজিসির এই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহেব্বি অত্যন্ত সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে উল্লেখ করেন যে, সাম্প্রতিক এই সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ব্যক্তিগতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে সম্পূর্ণ নিজের কল্পনানির্ভর ও ভিত্তিহীন জয়ের দাবি বারবার প্রচার করে চলেছেন।
বিভিন্ন সময়ের, বিভিন্ন স্থানের সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন কিছু ছবি এবং খণ্ডিত ঘটনার ভিডিও অত্যন্ত সুকৌশলে একত্র করে এমন এক কাল্পনিক বর্ণনা ও কৃত্রিম আখ্যান তৈরি করা হচ্ছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো নিজেদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা।
কিন্তু তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় স্মরণ করিয়ে দেন যে, মিডিয়া বা ভার্চুয়াল জগতে যতই প্রোপাগান্ডা চালানো হোক না কেন, তা কোনোভাবেই যুদ্ধক্ষেত্রের রূঢ় প্রকৃত চিত্র ও বাস্তবতাকে বিন্দুমাত্র বদলাতে পারে না।
নিজেদের দাবির সপক্ষে এবং মার্কিন আখ্যানের অসারতা প্রমাণ করতে আইআরজিসি সাম্প্রতিক কিছু বাস্তব চিত্রও সামনে নিয়ে এসেছে। একই সময়ে ইরানপন্থী ও আন্তর্জাতিক কিছু স্বাধীন সংবাদমাধ্যমে এমন কিছু চমকপ্রদ ছবি ও ভিডিও ফুটেজ প্রকাশিত হয়েছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেই তথাকথিত সফল অভিযানের দাবিকে রীতিমতো উপহাসের পাত্রে পরিণত করেছে।
ওই সব প্রকাশিত ছবিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখা যায় যে, অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের ধ্বংসাবশেষ অত্যন্ত সাধারণ একটি ঠেলাগাড়িতে করে টেনে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
একটি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানের এমন করুণ পরিণতি এবং তাকে কেন্দ্র করে মার্কিন গণমাধ্যমের সাজানো বীরত্বগাথা-এই দুইয়ের মধ্যকার বিস্তর ফারাক আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহেব্বি এই প্রসঙ্গের রেশ ধরেই তার বক্তব্যের উপসংহার টেনে বলেন, হলিউডি ধাঁচের এসব সস্তা গল্প ও মিডিয়া ট্রায়াল দিয়ে কখনোই যুদ্ধের বাস্তব ফলাফল ও পরিণতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।