‘ইরানের জন্য জীবন উৎসর্গকারী’ বা স্থানীয় ভাষায় ‘জানফাদা’ শীর্ষক এই অভাবনীয় মহড়ায় অংশ নিয়েছেন নানা শ্রেণি-পেশার প্রায় তিন লাখ তেরো হাজার সাধারণ মানুষ ও স্বেচ্ছাসেবী। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই ঘটনাকে ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ জনসম্পৃক্ত সামরিক তৎপরতা হিসেবে আখ্যায়িত করছে।
দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনার বরাত দিয়ে পার্সটুডে জানিয়েছে, শুক্রবার সকাল আটটা থেকে তেহরানের ঐতিহাসিক ইনকিলাব স্কয়ার বা বিপ্লব চত্বরকে কেন্দ্র করে এই সুবিশাল সমাবেশের সূচনা হয়, যা সমগ্র বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
এই বিশাল মহড়ার সার্বিক তত্ত্বাবধান ও আয়োজনের দায়িত্বে রয়েছে ইরানের প্রভাবশালী ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি। এই বাহিনীর অধীনস্থ মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরের শীর্ষ কমান্ডার হাসান হাসানজাদে সংবাদমাধ্যমের কাছে এই মহড়ার বিস্তারিত প্রেক্ষাপট ও প্রস্তুতি তুলে ধরেন।
তিনি জানান, এই কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে অনেক আগে থেকেই একটি সুশৃঙ্খল নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। ‘ইরানের জন্য জীবন উৎসর্গ’ নামের এই বিশেষ প্রচারণার প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণ নাগরিকরা মাতৃভূমির যেকোনো প্রয়োজনে নিজেদের নিঃশর্ত প্রস্তুতির কথা আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রকে জানান।
দেশের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও জাতীয়তাবোধের টানে লাখ লাখ মানুষ এই উদ্যোগে অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দেন, যা দেশের নীতিনির্ধারকদেরও দারুণভাবে উজ্জীবিত করেছে। কমান্ডার হাসানজাদে আরও জানান, নিবন্ধন প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় ধাপে অংশগ্রহণকারীদের একটি নির্দিষ্ট ফরম পূরণের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা ও আগ্রহের ক্ষেত্রগুলো সুনির্দিষ্ট করতে বলা হয়।
এই ফরমে মূলত সাতটি ভিন্ন ভিন্ন কৌশলগত ও সামাজিক ক্ষেত্রের কথা উল্লেখ ছিল। এসব ক্ষেত্রের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো যুদ্ধকালীন জরুরি সামরিক সহায়তা প্রদান, প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট দুর্যোগে দ্রুত উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা, সমাজের পিছিয়ে পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সার্বিক উন্নয়ন ও সহায়তা এবং সরাসরি জাতীয় প্রতিরক্ষা খাতে অবদান রাখা।
এর অর্থ হলো, এই মহড়া কেবল অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করার গতানুগতিক প্রস্তুতি নয়; বরং যেকোনো জাতীয় সংকটে একটি সুসংগঠিত নাগরিক সমাজ কীভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রের পাশে দাঁড়াতে পারে, তারই এক বাস্তব ও বহুমুখী অনুশীলন।
বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে ইরানের এই বিশাল মহড়া অত্যন্ত গভীর ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের সাধারণ জনগণ এবং সুসংগঠিত সশস্ত্র বাহিনীর এমন যৌথ অংশগ্রহণ জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অভূতপূর্ব মাত্রায় শক্তিশালী করবে।
এই মহড়ার মধ্য দিয়ে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী, ইরানের নিয়মিত স্থলবাহিনী এবং সমাজের সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের মধ্যে এক নিবিড় ও সুদৃঢ় সমন্বয়ের চিত্র ফুটে উঠেছে। বহির্বিশ্বের যেকোনো সম্ভাব্য সামরিক বা অর্থনৈতিক হুমকি মোকাবিলার ক্ষেত্রে এই জাতীয় ঐক্যই যে ইরানের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার, সেটিই এই সমাবেশের মাধ্যমে প্রমাণ করতে চাইছে তেহরান।
সাধারণ মানুষকে সামরিক ও বেসামরিক প্রতিরক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তোলার এই কৌশল মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই জাতীয় নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলারই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। ঐতিহাসিক ইনকিলাব স্কয়ারে এই মহড়ার আয়োজনও প্রতীকীভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামি বিপ্লবের স্মৃতিবিজড়িত এই চত্বরে তিন লক্ষাধিক মানুষের এই সুশৃঙ্খল সমাবেশ প্রমাণ করে যে, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সাধারণ ইরানিরা এখনো কতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর মতে, এটি কেবল একটি মহড়াই নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বিশেষ করে ইরানের প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রগুলোর প্রতি একটি প্রচ্ছন্ন ও অত্যন্ত শক্তিশালী বার্তা।
তেহরান অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীনভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, যেকোনো ধরনের আগ্রাসন বা সংকট মোকাবিলায় তাদের নিয়মিত সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি দেশের আপামর জনসাধারণও সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এই ধরনের সুসংগঠিত ও ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আন্তর্জাতিক কূটনীতির টেবিলেও বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।