বহুজাতিক নৌ জোট ‘কম্বাইন্ড মেরিটাইম ফোর্সেস’ বা সিএমএফ-এর উদ্যোগে আয়োজিত এটি ছিল চতুর্থ কৌশলগত ও পরিকল্পনা বৈঠক। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের নৌবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সামরিক বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি শীর্ষস্থানীয় কূটনৈতিক প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ববাণিজ্য, সরবরাহ ব্যবস্থা ও ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক নৌপথগুলোর নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিতে একটি সুসংহত ও সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর এই বৈঠকে সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের দাপ্তরিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) প্রকাশিত এক বিস্তারিত ও আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে এই আন্তর্জাতিক বৈঠকের বিষয়টি বিশ্ববাসীকে নিশ্চিত করেছে।
মন্ত্রণালয়ের দেওয়া পরিসংখ্যান ও তথ্য অনুযায়ী, জেদ্দায় আয়োজিত এই বহুজাতিক সম্মেলনে ৪১টি সদস্য ও অংশীদার রাষ্ট্রের মোট ১৫৪ জন শীর্ষস্থানীয় প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেছেন। এই বিপুলসংখ্যক অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনীর উচ্চপদস্থ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা, দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ও কৌশলগত পরিকল্পনাবিদ, বিভিন্ন দেশের নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতগণ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিশেষ প্রতিনিধিরা।
সামরিক নেতৃত্বের পাশাপাশি কূটনৈতিক ব্যক্তিবর্গের এমন সম্মিলিত ও স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে কতটা নজিরবিহীন অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওই বিবৃতিতে বহুজাতিক জোটটির ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা, কৌশলগত রূপরেখা ও বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করা হয়েছে। সেখানে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বৃহৎ এই নৌ জোটটি বর্তমানে তার প্রাথমিক ‘প্রতিষ্ঠা পর্যায়’ সফলভাবে অতিক্রম করে একটি পূর্ণাঙ্গ, সুসংগঠিত ও কার্যকর সামরিক অভিযান পরিচালনার সক্ষমতার দিকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।
এই কৌশলগত উত্তরণের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে জোটটি এখন সদস্য দেশগুলোর সামরিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার মধ্যে একটি সুদৃঢ় সমন্বয় সাধন এবং যেকোনো উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যৌথ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য চূড়ান্ত মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।
এর সহজ অর্থ হলো, কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা বা কাঠামোগত পরিকল্পনার মধ্যেই এই জোট আর নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখছে না; বরং অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে তারা আন্তর্জাতিক জলসীমায় সরাসরি নিরাপত্তামূলক টহল ও কার্যক্রম শুরু করার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।
বিবৃতিতে আরও বিশদভাবে বলা হয়েছে যে, বিস্তীর্ণ সামুদ্রিক এলাকায় জোটের নিয়মিত অপারেশনাল কার্যক্রম পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক নৌপথে নিজেদের বাস্তব ও দৃশ্যমান উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের লজিস্টিক, প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত প্রস্তুতি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গ্রহণ করা হচ্ছে।
বিশ্বের সামগ্রিক অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত নৌপথ, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ এবং সংকীর্ণ কিন্তু কৌশলগতভাবে অত্যাবশ্যকীয় সামুদ্রিক প্রণালিগুলো দিয়ে বাণিজ্যিক ও যাত্রীবাহী জাহাজ চলাচলের নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা রক্ষা করা এখন সমগ্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি অভিন্ন ও অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে পরিণত হয়েছে।
মহাসাগরীয় বিশালতার কারণে কোনো একক দেশের পক্ষে এত সুবিশাল জলরাশির সার্বিক নিরাপত্তা একা নিশ্চিত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আর ঠিক এ জন্যই সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটি অত্যন্ত কার্যকর ও টেকসই অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠা, বহুমুখী প্রযুক্তিগত ও সামরিক সক্ষমতার অবাধ বিনিময় এবং একটি সুসমন্বিত সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের অপরিহার্যতা জেদ্দার এই বৈঠকে বিশেষভাবে ও গভীরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
পরিশেষে, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই জোটের মূল দর্শন, লক্ষ্য ও আইনি ভিত্তির বিষয়টি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় পুনর্ব্যক্ত করেছে। তারা বিশ্ব সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করে জানিয়েছে, সর্বজনীন আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ও জাতিসংঘের কনভেনশনগুলো কঠোরভাবে অনুসরণ করে বিশ্বব্যাপী সামুদ্রিক নৌযান চলাচলের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এই বহুজাতিক জোটের অন্যতম প্রধান ও চূড়ান্ত লক্ষ্য।
কোনো স্বাধীন দেশের প্রতি সামরিক আগ্রাসন বা আধিপত্য বিস্তার নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অবাধ ও বাধাহীন প্রবাহ বজায় রাখা এবং সমুদ্রগামী নিরীহ নৌযানগুলোকে জলদস্যুতা, চোরাচালান বা অন্যান্য সামুদ্রিক হুমকির হাত থেকে দলমত নির্বিশেষে রক্ষা করার জন্যই ৪১টি দেশের এই সম্মিলিত সামরিক ও কূটনৈতিক প্রয়াস।
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণের এই স্পর্শকাতর যুগে জেদ্দার এই সফল বৈঠক সামুদ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি নতুন, নিরাপদ ও সহযোগিতাপূর্ণ দিগন্তের উন্মোচন করবে বলে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।