শনিবার আকস্মিক এই বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পুরো রিয়াদ শহরজুড়ে এক ধরনের গভীর উদ্বেগ ও সাময়িক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এই খবর প্রকাশ করেছে, কারণ এ ধরনের স্থাপনায় আঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্য একটি সংবেদনশীল বিষয়।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির একজন মাঠ পর্যায়ের প্রতিনিধি সরাসরি ঘটনাস্থলের আশপাশ থেকে এই ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, শনিবার স্থানীয় সময় অনুযায়ী রিয়াদের বাসিন্দারা হঠাৎ করেই একটি বিকট ও কানফাটানো বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান।
এই বিকট শব্দের রেশ কাটতে না কাটতেই বিমানবন্দরের অদূরে অবস্থিত আরামকোর লোগো সংবলিত একটি বিশাল জ্বালানি ট্যাংকে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। অগ্নিকাণ্ডের মাত্রা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, মুহূর্তের মধ্যেই কালো ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী আকাশের অনেক উঁচুতে উঠে গিয়ে চারপাশ আচ্ছন্ন করে ফেলে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে দুর্ঘটনাকবলিত ও আংশিক পুড়ে যাওয়া জ্বালানি ট্যাংকটির আগুন নেভাতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে এএফপির ওই প্রতিনিধি নিশ্চিত করেছেন।
তবে ঠিক কী কারণে বা কাদের হামলায় আরামকোর মতো একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনার জ্বালানি ট্যাংকে এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটল, সে বিষয়ে সৌদি আরবের সরকারি কর্তৃপক্ষ কিংবা আরামকোর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি বা নিশ্চিত তথ্য প্রদান করা হয়নি।
তা সত্ত্বেও, সৌদি কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে যে, রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের খুব কাছাকাছি এলাকায় একটি মনুষ্যবিহীন ড্রোন আঘাত হেনেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই সন্দেহভাজন ড্রোন হামলার ফলেই হয়তো আরামকোর জ্বালানি ট্যাংকটিতে আকস্মিক বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে।
অতীতেও এই অঞ্চলে এ ধরনের ড্রোন হামলার নজির রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও বেশি সন্দেহজনক করে তুলেছে। এই নজিরবিহীন হামলার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে রিয়াদের আকাশপথে। হামলার পরপরই কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকার আকাশে কালো ধোঁয়ার বিশাল আস্তরণ তৈরি হওয়ায় বিমান চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে।
আন্তর্জাতিক বিমান ট্র্যাকিং বিষয়ক নির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর দেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, শনিবার রিয়াদের এই প্রধান বিমানবন্দরে ফ্লাইট ওঠানামায় ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ও বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
বিমানবন্দর ও যাত্রীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার স্বার্থে এবং আকাশে দৃশ্যমানতা মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ার কারণে কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে বিমানবন্দর থেকে অসংখ্য ফ্লাইটের উড্ডয়ন ও অবতরণ বাতিল অথবা দীর্ঘ সময়ের জন্য বিলম্বিত করার জরুরি ঘোষণা দেয়।
ফ্লাইটরাডার২৪ তাদের নিজস্ব সূচকে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে 'ফ্লাইট ডিসরাপশন ইনডেক্স ৫.০'-তে অন্তর্ভুক্ত করেছে। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে এই নির্দিষ্ট সূচকের অর্থ হলো, সংশ্লিষ্ট বিমানবন্দরটিতে ফ্লাইট বাতিল ও উড্ডয়ন বিলম্বের ক্ষেত্রে চরম মাত্রার বা বড় ধরনের সমস্যা বিরাজ করছে।
এর ফলে হাজার হাজার দেশি-বিদেশি যাত্রী চরম ভোগান্তিতে পড়েন এবং তাদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে গভীর শঙ্কা তৈরি হয়। গন্তব্যে পৌঁছাতে না পেরে অনেক যাত্রীকে টার্মিনালে ঘণ্টার পর ঘণ্টা উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারাও গণমাধ্যমের কাছে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।
তারা জানান, বিস্ফোরণের পর থেকে বিমানবন্দরের আশপাশের এলাকা থেকে অনবরত কালো ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে, যা পুরো শহরের পরিবেশকে সাময়িকভাবে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবের রাজধানী এবং বিশেষ করে আরামকোর মতো বিশ্বখ্যাত পেট্রোলিয়াম জায়ান্টের স্থাপনায় এ ধরনের বিস্ফোরণ বা হামলার ঘটনা অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
সৌদি আরবের জাতীয় অর্থনীতি অনেকাংশেই তেল রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল এবং আরামকো সেই অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। ফলে আরামকোর যেকোনো স্থাপনায় এ ধরনের অপ্রত্যাশিত আক্রমণ কেবল সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্যই হুমকিস্বরূপ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রেও গভীর উদ্বেগ তৈরি করে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং জনমনে দ্রুত স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে সৌদি নিরাপত্তা বাহিনী, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও জরুরি উদ্ধারকারী দলগুলো সর্বোচ্চ সতর্কতায় কাজ করে যাচ্ছে। পুরো ঘটনার একটি সুষ্ঠু ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষে প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করা সম্ভব হবে বলে আন্তর্জাতিক মহল নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।