এই অঞ্চলে নিজেদের একচ্ছত্র সামরিক আধিপত্য বজায় রাখার স্বার্থে ইসরায়েল এখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে নতুন করে আরও উন্নত ও অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পাওয়ার জোরদার চেষ্টা চালাচ্ছে।
মূলত সৌদি আরবের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের এই সমরাস্ত্র বিক্রির বিপরীতে কৌশলগত সামরিক ভারসাম্য রক্ষার্থে ইসরায়েল এটিকে একটি ‘ক্ষতিপূরণ’ হিসেবে আদায় করতে চাইছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘ওয়ালা’-এর এক বিস্তারিত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই তাৎপর্যপূর্ণ তথ্যটি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছে।
গত শুক্রবার প্রকাশিত ‘ওয়ালা’-এর ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন অতীতে যেসব সংবেদনশীল অস্ত্রব্যবস্থা ইসরায়েলের কাছে বিক্রির অনুমোদন দেয়নি, এবার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তেল আবিব সেই সব অত্যন্ত শক্তিশালী অস্ত্র কেনার জন্য সর্বাত্মক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাবে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের বর্তমান সামরিক মনোযোগ কেবল অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান বা পরবর্তী প্রজন্মের রাডারে ধরা পড়ে না এমন ‘স্টেল্থ’ প্রযুক্তির বিমানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বরং তারা নিজেদের প্রতিরক্ষার সীমানাকে আরও বহুদূর প্রসারিত করতে চাইছে।
এর অংশ হিসেবে ইসরায়েল মহাকাশ-ভিত্তিক সমরাস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জনের দিকে গভীর মনোযোগ নিবদ্ধ করেছে। এছাড়া ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা অত্যন্ত শক্তিশালী বাঙ্কার ধ্বংসকারী বোমা এবং পাথুরে পাহাড়ের গভীরে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে কাজ করতে সক্ষম এমন বিশেষায়িত ভূগর্ভস্থ সামরিক ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে চাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছেন বলে জানা গেছে।
ইসরায়েলের এই আকস্মিক উদ্বেগের মূল কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক একটি বিশাল সামরিক চুক্তি। গত বৃহস্পতিবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আনুষ্ঠানিকভাবে সৌদি আরবের কাছে সম্ভাব্য ২৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির একটি ঐতিহাসিক চুক্তির অনুমোদন প্রদান করেছে।
সামরিক বাণিজ্যের ইতিহাসে এই প্রস্তাবিত চুক্তিটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই বিশাল চুক্তির আওতায় রিয়াদকে ৪৮টি পঞ্চম প্রজন্মের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান সরবরাহ করা হবে। এর পাশাপাশি চুক্তিতে প্র্যাট অ্যান্ড হুইটনির তৈরি ৪৯টি অত্যন্ত শক্তিশালী এফ১৩৫-পিডব্লিউ-১০০ ইঞ্জিন, উন্নত ক্রিপ্টোগ্রাফিক বা সাংকেতিক সরঞ্জাম, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ পরিচালনার জন্য বিশেষ সহায়তা প্রযুক্তি, সামরিক প্রশিক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি লজিস্টিক বা রসদ সহায়তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
যদি এই বিশাল সামরিক চুক্তিটি চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন হয়, তবে সৌদি আরব হবে সামরিক দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা এই এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান সংগ্রহকারী প্রথম কোনো আরব দেশ। উল্লেখ্য, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের মতো চরম উত্তেজনাকর অঞ্চলে একমাত্র ইসরায়েলই এই অত্যাধুনিক স্টেল্থ যুদ্ধবিমানের একক ব্যবহারকারী।
সৌদি আরবের হাতে এই অত্যাধুনিক বিমান পৌঁছালে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে ইসরায়েলের যে নিরঙ্কুশ আধিপত্য ছিল, তা নিশ্চিতভাবেই বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
অস্ত্র চুক্তির এই সমীকরণের বাইরে ইসরায়েল ও সৌদি আরবের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টিও অত্যন্ত জটিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি আরব দেশের সঙ্গে ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ঐতিহাসিক চুক্তি করলেও, সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্য কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি।
রিয়াদের পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত তারা কোনোভাবেই ইসরায়েলের সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্কে জড়াবে না।
বিশেষ করে ১৯৬৭ সালের ঐতিহাসিক সীমান্তের ভিত্তিতে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে শর্ত সৌদি আরব ও আরব বিশ্ব দিয়ে আসছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি বিশাল অংশ তাতে অকুণ্ঠ সমর্থন জানালেও, ইসরায়েল শুরু থেকেই এই দাবি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে রিয়াদ ও তেল আবিবের এই অনড় অবস্থানের কারণেই মূলত এফ-৩৫ বিক্রির বিষয়টি ইসরায়েলের জন্য আরও বেশি অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নিজেদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব কোনোভাবেই হাতছাড়া করতে রাজি নয় ইসরায়েল, আর তাই যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অভাবনীয় সব সামরিক সুবিধা আদায় করে তারা এই সম্ভাব্য কৌশলগত ঘাটতি পুষিয়ে নিতে চাইছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই পরিস্থিতি একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক ও কৌশলগত পরীক্ষার জন্ম দিয়েছে। একদিকে তারা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অন্যতম মিত্র সৌদি আরবের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার করতে চাইছে, অন্যদিকে তাদের প্রধান মিত্র ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতিও তাদের রক্ষা করতে হচ্ছে।
ওয়াশিংটন কীভাবে ইসরায়েলের এই নতুন ক্ষতিপূরণের দাবিগুলো মূল্যায়ন করে এবং দুই মিত্র দেশের মধ্যে সামরিক ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখে, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।