বিশ্বের কোটি কোটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানের আধ্যাত্মিক কেন্দ্রস্থল পবিত্র কাবা শরিফ ও মদিনার মসজিদে নববীর পবিত্রতা রক্ষায় যেকোনো ধরনের আগ্রাসনকে তারা চূড়ান্ত ধৃষ্টতা বলে উল্লেখ করেছেন।
গত শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের স্বনামধন্য গণমাধ্যম সৌদি গেজেটে প্রকাশিত এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে ধর্মীয় শীর্ষ নেতাদের এই কড়া ও যুগান্তকারী বার্তার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এই স্পর্শকাতর সংবাদটি বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছে। মুসলমানদের সবচেয়ে পবিত্র স্থান মক্কার মসজিদুল হারামের সম্মানিত ইমাম ও খতিব শেখ বান্দার বালিলা জুমার খুতবায় অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ও জোরালো ভাষায় এই ন্যাক্কারজনক হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানান।
পবিত্র স্থানগুলোর অবিচ্ছেদ্য নিরাপত্তা এবং সেখানে অবস্থানরত লাখো নির্দোষ মানুষের জীবন রক্ষা করাকে তিনি একটি অলঙ্ঘনীয় ‘চূড়ান্ত সীমা’ বা রেড লাইন হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি সমবেত মুসল্লিদের উদ্দেশে স্পষ্টভাবে বলেন, যারা মহান আল্লাহর ঘর এবং বিশ্বনবীর পবিত্র মসজিদকে নিজেদের হীন রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্যবস্তু বানানোর দুঃসাহস দেখায়, পবিত্র ইসলাম ধর্মের মহান শিক্ষার সাথে তাদের বিন্দুমাত্র কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না।
হুথি বিদ্রোহীদের কঠোর সমালোচনা করে তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, নিজেদের ধ্বংসাত্মক ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপকে আড়াল করার জন্য তারা অত্যন্ত সুকৌশলে পবিত্র ধর্মের নাম ও বিভিন্ন ধর্মীয় স্লোগানকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, যা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য ও নিন্দনীয়।
অন্যদিকে, মদিনা মোনাওয়ারার পবিত্র মসজিদে নববীর সম্মানিত ইমাম শেখ আবদুল মহসিন আল-কাসিমও তার জুমার খুতবায় হুথিদের এই আগ্রাসী ভূমিকার বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন।
তিনি অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন যে, মক্কা ও মদিনার মতো চিরস্থায়ী শান্তির নগরীর নিরাপত্তাকে যারা বারবার হুমকির মুখে ফেলছে, তাদের এই আক্রমণগুলো মূলত তাদের দীর্ঘস্থায়ী ও সুপরিকল্পিত সন্ত্রাসবাদেরই একটি ধারাবাহিক অংশ।
এই ধরনের বর্বরোচিত হামলাগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো নিরীহ ও নিরপরাধ মুসলিমদের অকারণে রক্তপাত ঘটানো এবং ইবাদতে মগ্ন শান্তিকামী সাধারণ মানুষের মনে চরম আতঙ্ক ও ভীতির সঞ্চার করা। তিনি এই ধরনের অপচেষ্টাকে মানবতার বিরুদ্ধে এক জঘন্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে এর দ্রুত অবসান দাবি করেন।
সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সামরিক জোটের দেওয়া নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, এই উদ্বেগজনক ঘটনাটি ঘটে গত মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর। ওই দিন সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটের দিকে মক্কার সংরক্ষিত ও নিষিদ্ধ আকাশসীমায় প্রবেশ করার ঠিক আগমুহূর্তে মক্কা নগরীর দক্ষিণ দিকে একটি বিস্ফোরকবাহী হুথি ড্রোন অত্যন্ত সফলতার সাথে রাডারে চিহ্নিত করে তা আকাশেই ধ্বংস করে দেয় সদা সতর্ক অবস্থায় থাকা সৌদি বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী।
ইয়েমেনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও বৈধ সরকারকে সহায়তাকারী আরব সামরিক জোট এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছে যে, তাদের তাৎক্ষণিক ও অত্যন্ত পেশাদার সামরিক পদক্ষেপের কারণেই পবিত্র নগরী একটি বড় ধরনের বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।
উল্লেখ্য, পবিত্র মক্কা নগরীকে লক্ষ্য করে হুথি বিদ্রোহীদের এই ধরনের উসকানিমূলক আক্রমণ এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০১৭ সালের জুলাই মাসেও পবিত্র এই শহরটিকে লক্ষ্য করে তারা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার এক দুঃসাহসী অপচেষ্টা চালিয়েছিল। এবারের এই ড্রোন হামলাটি মূলত সেই ধারাবাহিকতারই দ্বিতীয় বৃহৎ আক্রমণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সবশেষে, মসজিদুল হারামের সম্মানিত খতিব শেখ বান্দার বালিলা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেন যে, পবিত্র ভূমিতে এ ধরনের কাপুরুষোচিত হামলা সৌদি আরবের সরকার, নেতৃত্ব এবং সাধারণ জনগণের মধ্যকার ইস্পাতকঠিন ঐক্যকে বিন্দুমাত্র দুর্বল করতে পারবে না, বরং তা আগের চেয়ে আরও বহুগুণ শক্তিশালী করবে।
তিনি বিশ্ববাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, যেকোনো ধরনের গভীর ষড়যন্ত্র ও সামরিক আগ্রাসন সত্ত্বেও পবিত্র মক্কা নগরী চিরকাল বিশ্বের সকল প্রান্তের মুসলিমদের পবিত্র কিবলা হিসেবে নিজ মহিমায় অটুট থাকবে এবং এর পবিত্রতা ও নিরাপত্তা বিধানে সৌদি আরব সর্বদা তার সর্বোচ্চ প্রস্তুতি বজায় রাখবে।