ইয়েমেনের সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠী হুথি বিদ্রোহীরা বর্তমানে এই কৌশলগত জলসীমায় কেবল সৌদি আরবের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত বাণিজ্যিক পণ্যবাহী জাহাজ এবং অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে তাদের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে।
শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস বা এপি প্রকাশিত এক বিশেষ ও বিস্তারিত প্রতিবেদনে সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী স্বনামধন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান একলেড-এর মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক শীর্ষ বিশ্লেষক ভ্যালেনটিন দ্যোতিয়ে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এই পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছেন, কারণ এর নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনীতি, সরবরাহ শৃঙ্খল ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ওপর পড়তে পারে।
ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাব এল-মান্দেব প্রণালি এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপ মহাদেশের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অপরিহার্য সংযোগস্থল হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই সংকীর্ণ কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল এবং অন্যান্য জীবনরক্ষাকারী ও অতিপ্রয়োজনীয় বাণিজ্যিক পণ্য পরিবাহিত হয়। এই সামুদ্রিক অঞ্চলে যেকোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা, সামরিক উত্তেজনা বা হামলার ঘটনা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটাতে সক্ষম।
বিশ্লেষক ভ্যালেনটিন দ্যোতিয়ে তার সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে হুথি বিদ্রোহীরা তাদের কৌশলগত সামরিক স্বার্থে কেবল সৌদি আরব-সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর ওপর নিজেদের আক্রমণ সীমিত রাখলেও, ভবিষ্যতে এই পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকার কোনো সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা নেই।
মূলত সৌদি আরব এবং সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর আরও বেশি মাত্রায় কৌশলগত, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করার হীন উদ্দেশ্যে হুথিরা যেকোনো সময় অদূর ভবিষ্যতে তাদের লক্ষ্যবস্তুর পরিধি আরও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করতে পারে।
যদি সত্যিই এমনটা ঘটে, তবে তা আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য এক মারাত্মক ও নজিরবিহীন হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এই বিপজ্জনক ও সংঘাতময় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের বর্তমান পরিস্থিতির একটি তুলনামূলক ও পরিসংখ্যানগত চিত্র আন্তর্জাতিক মহলের সামনে তুলে ধরেছে সামুদ্রিক নৌ চলাচল ও শিপিং তথ্য বিশ্লেষক শীর্ষস্থানীয় সংস্থা ‘উইন্ডওয়ার্ড’।
সংস্থাটির দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে হুথিদের সাম্প্রতিক এই তৎপরতা ও সামরিক উত্তেজনা শুরু হওয়ার আগে প্রতিদিন গড়ে পঁয়ত্রিশটি বৃহৎ বাণিজ্যিক জাহাজ অত্যন্ত নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে এই পথ অতিক্রম করত।
কিন্তু পরবর্তীতে হুথিদের হামলার আশঙ্কায় সেই সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়ে পঁচিশটিতে নেমে এসেছিল, যা সামুদ্রিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের ধাক্কা ও আশঙ্কার বিষয় ছিল। তবে অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হলো, পরিস্থিতি সম্প্রতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে এবং গত রোববার এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজের সংখ্যা পুনরায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়ে পঁয়তাল্লিশটিতে উন্নীত হয়েছে।
জাহাজ চলাচলের এই আকস্মিক বৃদ্ধি সামুদ্রিক বাণিজ্যের গতিশীলতা পুনরুদ্ধারের একটি ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখা হলেও, দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও সুরক্ষার নিশ্চয়তা নিয়ে জাহাজ মালিক, শিপিং কোম্পানি এবং নাবিকদের মনে এখনও গভীর শঙ্কা, উৎকণ্ঠা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
অন্যদিকে, লোহিত সাগরে চলমান এই উত্তেজনার বিষয়ে নিজেদের রাজনৈতিক, সামরিক ও কৌশলগত অবস্থানের কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে হুথি বিদ্রোহীরা। গোষ্ঠীটির রাজনৈতিক ব্যুরোর অন্যতম জ্যেষ্ঠ ও প্রভাবশালী সদস্য মোহাম্মদ আল-বুখাইতি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাদের দীর্ঘদিনের একটি প্রধান ও অনড় দাবির কথা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
তিনি অবিলম্বে হুথি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে বহাল থাকা সর্বাত্মক অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধ সম্পূর্ণভাবে তুলে নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন। নিজেদের সামরিক পদক্ষেপের পেছনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে তিনি প্রকাশ্যেই অভিযোগ করেন যে, সৌদি আরব নিজেই সম্পূর্ণ একতরফাভাবে ইয়েমেনের জলসীমায় বাণিজ্যিক ও মানবিক সহায়তা বহনকারী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর এক অন্যায্য, বেআইনি ও অমানবিক অবরোধ চাপিয়ে দিয়েছে।
আল-বুখাইতি আরও উল্লেখ করেন যে, লোহিত সাগরে হুথিদের বর্তমান সামরিক পদক্ষেপগুলো মূলত সৌদি আরবের সেই দীর্ঘস্থায়ী ও অন্যায্য অবরোধের বিরুদ্ধে একটি অবশ্যম্ভাবী পাল্টা জবাব বা আত্মরক্ষামূলক প্রতিরোধ ব্যবস্থা মাত্র।
মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং লোহিত সাগরের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। সামরিক উত্তেজনা এবং পাল্টাপাল্টি অবরোধ আরোপের এই ধ্বংসাত্মক রাজনীতি কেবল ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ভয়াবহ মানবিক সংকটকেই আরও ঘনীভূত করছে না, বরং তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও এক স্পষ্ট অশনিসংকেত।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই জটিল ও বহুমাত্রিক সমস্যার কোনো তাৎক্ষণিক সামরিক সমাধান নেই; বরং আন্তর্জাতিক মহলের কার্যকর ও আন্তরিক মধ্যস্থতায় দ্রুত একটি কূটনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরি।
অন্যথায়, বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে ঘনীভূত এই সংকট খুব শিগগিরই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, যার সুদূরপ্রসারী ও নেতিবাচক প্রভাব বিশ্বের প্রতিটি দেশকেই বহন করতে হবে।