শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬
৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তায় আঞ্চলিক আস্থাই স্থিতিশীলতার চাবিকাঠি: ইরান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:২৯ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তায় আঞ্চলিক আস্থাই স্থিতিশীলতার চাবিকাঠি: ইরান
ছবি : File Photo

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই বলে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে ইরান।

 

দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বিশ্ব সম্প্রদায়কে সতর্ক করে ঘোষণা করেছেন যে, এই সংবেদনশীল অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বাইরের কোনো পরাশক্তির অযাচিত হস্তক্ষেপ বা তাদের চাপিয়ে দেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত কখনোই মেনে নেওয়া হবে না বা তা আঞ্চলিক শান্তির জন্য সহায়ক হতে পারে না।

 

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আয়োজিত অত্যন্ত সম্মানজনক ‘গ্লোবাল টাউন হল ২০২৬’ শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা অনুষ্ঠানে ভার্চুয়াল মাধ্যমে যুক্ত হয়ে দেওয়া এক বিশেষ ও নীতিগত ভাষণে তিনি এই তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার বরাত দিয়ে এই তথ্য জানা গেছে, যা বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মাঝে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কূটনৈতিক বার্তা বহন করে।

 

নিজের সারগর্ভ বক্তব্যে আব্বাস আরাগচি মধ্যপ্রাচ্যের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলের সামগ্রিক সুরক্ষার রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত ও গঠনমূলক আলোচনা করেন।

 

তিনি অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেন, এই অঞ্চলে যদি প্রকৃত অর্থেই একটি টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে হয়, তবে তা কোনো অবস্থাতেই বিদেশি শক্তির নির্দেশে বা ভিনদেশি সামরিক উপস্থিতির মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব নয়।

 

ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, বছরের পর বছর ধরে বাইরের শক্তিগুলো নিজেদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থে এই অঞ্চলে যে সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার যে অপচেষ্টা চালিয়েছে, তা মূলত এই অঞ্চলে কেবল সংঘাত, বিভাজন ও অস্থিরতাই বহুগুণে বাড়িয়েছে।

 

এর পরিবর্তে আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে গঠনমূলক ও নিরবচ্ছিন্ন সংলাপ, পারস্পরিক গভীর আস্থা, একে অপরের সার্বভৌমত্বের প্রতি অটুট সম্মান প্রদর্শন এবং অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক সুদৃঢ় সহযোগিতার মাধ্যমেই কেবল একটি নিরাপদ ও শান্তিময় মধ্যপ্রাচ্য গড়ে তোলা সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন।

 

তার মতে, আঞ্চলিক সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান এই অঞ্চলের দেশগুলোকেই নিজেদের সম্মিলিত রাজনৈতিক প্রজ্ঞার মাধ্যমে বের করতে হবে। আন্তর্জাতিক আইন ও বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় বড় পরাশক্তিগুলোর অনুসৃত দ্বৈত নীতির বিষয়েও অত্যন্ত কড়া ও তীক্ষ্ণ সমালোচনা করেন ইরানের এই শীর্ষ কূটনীতিক।

 

তিনি বর্তমান বৈশ্বিক শাসন ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, যখন বিশ্বের বড় ও প্রভাবশালী দেশগুলো কেবল নিজেদের ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য আন্তর্জাতিক আইনকে নির্লজ্জভাবে উপেক্ষা করে, তখন বিশ্বমঞ্চে আইনের শাসনের কথা বলা অত্যন্ত কঠিন ও অনেকটাই হাস্যকর হয়ে দাঁড়ায়।

 

জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বর্তমান প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকার বিষয়ে গভীর হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, এই বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি বিশ্বজুড়ে চলা অমানবিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি শক্ত, বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের অস্তিত্ব ও প্রয়োজনীয়তাই চরম প্রশ্নের সম্মুখীন হয়।

 

যারা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও সনদের চরমভাবে লঙ্ঘন করছে, তাদের যদি অবিলম্বে উপযুক্ত জবাবদিহির আওতায় আনা না যায়, তাহলে জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা, কার্যকারিতা ও নৈতিক বৈধতা যে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা অত্যন্ত স্বাভাবিক ও অবধারিত পরিণতি।

 

বর্তমান বিশ্বের অত্যন্ত জটিল, মেরুকরণকৃত ও সংঘাতময় পরিস্থিতিতে একটি শক্তিশালী বহুপক্ষীয় বিশ্বব্যবস্থার অপরিহার্যতার ওপরও বিশেষভাবে আলোকপাত করেন আরাগচি। তিনি উল্লেখ করেন যে, বিশ্ব আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশ বা একক পরাশক্তির পক্ষে বৈশ্বিক সংকটগুলোর স্থায়ী সমাধান করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

 

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই একক আধিপত্যবাদের আগ্রাসী চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে এসে পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে অবিলম্বে মনোনিবেশ করতে হবে।

 

বর্তমান সংকটগুলো মোকাবিলায় আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার আবশ্যকতা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। ভাষণের শেষাংশে আব্বাস আরাগচি আধুনিক যুদ্ধবিগ্রহের ভয়াবহতা এবং এর সুদূরপ্রসারী মানবিক বিপর্যয়ের দিকটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও মানবিক ভাষায় তুলে ধরেন।

 

তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিবেককে জাগ্রত করার উদ্দেশ্যে স্মরণ করিয়ে দেন যে, যেকোনো যুদ্ধের ধ্বংসাত্মক পরিণতি কেবল নির্দিষ্ট কোনো যুদ্ধক্ষেত্র বা রণাঙ্গনেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এর বিষাক্ত প্রভাব সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি বলেন, একটি যুদ্ধের বিশাল আর্থিক ব্যয় হয়তো শেষ পর্যন্ত সাধারণ করদাতাদের কষ্টার্জিত অর্থের মাধ্যমেই মেটানো হয়, কিন্তু এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সবচেয়ে বড় ও নিষ্ঠুর মূল্যটি চোকাতে হয় নিরীহ সাধারণ মানুষকে।

 

যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতায় সাধারণ মানুষ কেবল তাদের মূল্যবান জীবন বা ঘরবাড়িই হারায় না, বরং একটি পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ও বেঁচে থাকার ন্যূনতম নিরাপত্তাও চিরতরে ধ্বংস হয়ে যায়। তাই মানবতাকে রক্ষার স্বার্থে যেকোনো মূল্যে সংঘাত এড়িয়ে কূটনীতি, শান্তি ও সংলাপের পথে হাঁটার জন্য তিনি বিশ্বের সকল নেতার প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।

 

- আল জাজিরা