ইউরোপের দেশ অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় অবস্থিত জাতিসংঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যালয়ে নিযুক্ত ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের স্থায়ী রাষ্ট্রদূত ও প্রধান প্রতিনিধি রেজা নাজাফি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার বা আইএইএ-এর সাধারণ সম্মেলনের ৭০তম অধিবেশনে দেওয়া এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও নীতিগত ভাষণে এই গভীর উদ্বেগের কথা সমগ্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন।
সম্মেলনে উপস্থিত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতা, নীতি নির্ধারক ও আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের উদ্দেশে দেওয়া তাঁর সুচিন্তিত বক্তব্যে রেজা নাজাফি বর্তমান বিশ্বে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহারের ক্ষেত্রে চলমান দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী ও সাংঘর্ষিক প্রবণতার কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন।
তিনি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করে বলেন যে, একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে একদিকে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শক্তির ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে পারমাণবিক শক্তি সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য, পরিচ্ছন্ন এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানি উৎসগুলোর অন্যতম হিসেবে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক স্বীকৃতি লাভ করেছে।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, এর সম্পূর্ণ বিপরীত একটি ভয়ংকর চিত্রও সমান্তরালভাবে এগিয়ে চলছে। শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত এবং আন্তর্জাতিক নজরদারিতে থাকা পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর সামরিক ও সশস্ত্র হামলার সংখ্যা এবং এর ভয়াবহ তীব্রতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন এক নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য এক গভীর অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে।
তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এই ধরনের সামরিক আগ্রাসন যদি অব্যাহত থাকে এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা না হয়, তবে অচিরেই পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা একটি ‘স্বাভাবিক’ বা প্রাত্যহিক ঘটনায় পরিণত হওয়ার চরম ঝুঁকি তৈরি করবে, যা কোনো সভ্য সমাজের কাছেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
পারমাণবিক স্থাপনায় এ ধরনের বেপরোয়া ও দায়িত্বজ্ঞানহীন হামলার সুদূরপ্রসারী ও ধ্বংসাত্মক প্রভাবের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করে দিয়ে ইরানের এই শীর্ষ ও প্রবীণ কূটনীতিক বলেন, এই আগ্রাসী প্রবণতা সমগ্র মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি বিষয়।
একটি পারমাণবিক স্থাপনায় সশস্ত্র হামলার নেতিবাচক ও ধ্বংসাত্মক প্রভাব কেবল নির্দিষ্ট কোনো সংঘাতময় অঞ্চল, যুদ্ধক্ষেত্র বা ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই কখনোই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং মুহূর্তের মধ্যেই এর তেজস্ক্রিয়তা আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এমনকি মহাদেশীয় পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এর ফলে ওই অঞ্চলের বিপুল সংখ্যক নিরীহ মানুষের জীবন, দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর এক অপূরণীয় ও ভয়াবহ বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মূল ঐতিহাসিক দায়িত্ব ও ম্যান্ডেটের কথা অত্যন্ত জোরালোভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়ে রেজা নাজাফি তাঁর বক্তব্যে আরও জোর দিয়ে বলেন, এ ধরনের সামরিক আগ্রাসন আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট ও সরাসরি লঙ্ঘন।
এটি শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক কাজে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশগুলোর যে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও বৈধ অধিকার রয়েছে, তাকে মারাত্মকভাবে ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাধাগ্রস্ত করে।
একই সঙ্গে তিনি অত্যন্ত জোরালো ও যৌক্তিক দাবি উপস্থাপন করে বলেন, আইএইএ-এর প্রত্যক্ষ সুরক্ষা ও সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতাধীন কোনো স্থাপনায় যদি কোনো ধরনের আইনি শাস্তি বা জবাবদিহি ছাড়াই নির্বিঘ্নে বোমা হামলা চালানো হয়, তবে তা এই আন্তর্জাতিক সংস্থার নিজস্ব আইনি কর্তৃত্বকে চরমভাবে দুর্বল করে দেবে।
এর ফলে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সুরক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ও কার্যকারিতা নিয়ে সারা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের মনে গভীর প্রশ্নের জন্ম হবে। তিনি সুস্পষ্টভাবে সতর্ক করেন যে, এ ধরনের আগ্রাসন ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটি এবং আইএইএ-এর নিজস্ব সংবিধানের মূল ভিত্তিই চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে, যা বিশ্বকে এক নতুন অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে।
ভাষণের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে রেজা নাজাফি অত্যন্ত কড়া, সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি এই দুটি দেশের পরিচালিত বিভিন্ন সশস্ত্র হামলা ও সামরিক তৎপরতাকে আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে সুস্পষ্ট আগ্রাসনমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে অভিহিত করে এর তীব্র নিন্দা জানান।
আন্তর্জাতিক আইনের বিভিন্ন রীতিনীতির উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বিশ্ব সম্প্রদায়কে মনে করিয়ে দেন যে, বিনা প্ররোচনায় অন্য কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় এ ধরনের সামরিক আগ্রাসন মূলত সর্বোচ্চ পর্যায়ের এবং অত্যন্ত গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধগুলোর একটি হিসেবেই পরিগণিত হয়।
একই সঙ্গে তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে এই গুরুতর অভিযোগও উত্থাপন করেন যে, এই পরাশক্তিগুলো কেবল স্বাধীন দেশগুলোর পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার হুমকিই দিচ্ছে না, বরং তারা নিজেদের রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে গুরুতর মাত্রায় যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধেও লিপ্ত রয়েছে, যার সুষ্ঠু বিচার হওয়া আন্তর্জাতিক শান্তির স্বার্থেই একান্ত অপরিহার্য।