দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ অত্যন্ত কড়া ভাষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানিয়েছেন যে, তাদের দেওয়া সুনির্দিষ্ট শর্তাবলি সম্পূর্ণরূপে পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক জলপথ কোনোভাবেই উন্মুক্ত করা হবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে পূর্ববর্তী প্রতিশ্রুতিগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়াকে কেন্দ্র করে তেহরানের এই কঠোর বার্তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
ইরানের আইনসভায় দেওয়া এক বিশেষ এবং গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে পার্লামেন্ট স্পিকার গালিবাফ বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতি এবং তেহরানের কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, গত জুন মাসে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে যে বহুল আলোচিত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল, সেটি বর্তমানে সম্পূর্ণরূপে অকার্যকর অবস্থায় পরিণত হয়েছে।
এই অচলাবস্থার মূল কারণ হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সদিচ্ছার চরম অভাব এবং ধারাবাহিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরেন। গালিবাফ দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন, ওই সমঝোতার আওতায় যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ পর্যন্ত নিজেদের দেওয়া আইনি ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিগুলো অক্ষরে অক্ষরে পূরণ না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই কৌশলগত জলপথটি পুরোপুরি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে অটল থাকবে ইরান।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরান ইতোমধ্যে তাদের এই সুস্পষ্ট বার্তা ও যাবতীয় শর্তাবলি ওয়াশিংটনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিপক্ষকে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
পার্লামেন্টে দেওয়া দীর্ঘ ও তাৎপর্যপূর্ণ ওই বক্তব্যে গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রের অতীতের বিভিন্ন একপাক্ষিক পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, শত্রুপক্ষকে খুব ভালোভাবে অনুধাবন করতে হবে যে, কূটনীতির আড়ালে প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া কিংবা পেশিশক্তির জোরে একতরফা কোনো সিদ্ধান্ত স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ এখন আর বিশ্বে অবশিষ্ট নেই।
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে স্মরণ করিয়ে দেন যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনীতিতে সমতা এবং পারস্পরিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ প্রদর্শন করা অত্যন্ত জরুরি। তার মতে, যতক্ষণ না পর্যন্ত ইরানের উত্থাপিত যৌক্তিক শর্তগুলো পুরোপুরি মেনে নেওয়া হচ্ছে, ইরানি জাতির দীর্ঘদিনের আইনগত ও বৈধ অধিকারকে নিঃশর্তভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে এবং স্বাক্ষরিত চুক্তির প্রতিশ্রুতিগুলো দৃশ্যমানভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আগের মতো স্বাভাবিক আলোচনার টেবিলে ফিরে যাওয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই।
একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজ চলাচলের পথ পুনরায় উন্মুক্ত করার কোনো সম্ভাবনাও আপাতত থাকছে না। বর্তমান এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি ও সংঘাতময় অবস্থার দ্রুত অবসানের লক্ষ্যে মধ্যপ্রাচ্যের আরেক গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী দেশ কাতার সক্রিয় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে।
কাতারের এই গঠনমূলক কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সামরিক ও রাজনৈতিক সংঘাত বন্ধে ওয়াশিংটনের কাছে আনুষ্ঠানিক কিছু সুনির্দিষ্ট শর্ত সংবলিত বার্তা পাঠিয়েছে তেহরান।
এ প্রসঙ্গে ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান মোহসেন রেজাই শনিবার কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকারে ইরানের শর্তগুলোর বিস্তারিত রূপরেখা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, "আমাদের শর্তগুলো অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং যৌক্তিক।
প্রথমত, অবিলম্বে সব ফ্রন্টে চলমান যুদ্ধ ও সামরিক আগ্রাসন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্যাংকে অন্যায়ভাবে আটকে রাখা আমাদের দেশের বিপুল পরিমাণ বৈধ অর্থ অবিলম্বে ছাড় করার ব্যবস্থা করতে হবে।
এবং তৃতীয়ত, স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের ওপর যে বেআইনি ও অন্যায্য নৌ অবরোধ আরোপ করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করে নিতে হবে।" মোহসেন রেজাই এবং পার্লামেন্ট স্পিকার গালিবাফের এই অভিন্ন ও কঠোর বক্তব্য থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, ইরান তাদের সার্বভৌমত্ব, কৌশলগত নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক অধিকার আদায়ের বিষয়ে কোনো ধরনের আপস করতে একেবারেই রাজি নয়।
হরমুজ প্রণালির মতো একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক বাণিজ্যপথ, যার ওপর দিয়ে বিশ্বের মোট উৎপাদিত জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়, সেটি দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ থাকার অর্থ হলো বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ও স্মরণকালের ভয়াবহতম জ্বালানি সংকটের শঙ্কা।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা গভীরভাবে মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যকার এই চলমান তীব্র স্নায়ুযুদ্ধ এবং শর্ত-পাল্টাশর্তের খেলা যদি দ্রুত কোনো কার্যকর কূটনৈতিক সমাধানের মাধ্যমে নিরসন করা না যায়, তবে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তাকেই বিঘ্নিত করবে না, বরং সমগ্র বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এক মারাত্মক হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়াবে। আপাতত সমগ্র বিশ্ব গভীর উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগের সঙ্গে দোহা-ভিত্তিক এই মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ফলাফলের দিকে তাকিয়ে আছে।