তবে ওয়াশিংটনের এই অভিযোগগুলোকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, অযৌক্তিক ও ‘বাস্তবতা থেকে পলায়ন’ বলে আখ্যায়িত করে অত্যন্ত কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি অত্যন্ত স্পষ্ট ও জোরালো ভাষায় বলেছেন, ওয়াশিংটন বর্তমানে এমন সব অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডের জন্য ইরানকে দায়ী করার অপচেষ্টা করছে, যেগুলোর অধিকাংশের সূত্রপাত স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্র নিজেই করেছে অথবা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দীর্ঘকাল ধরে সেগুলোতে নির্লজ্জভাবে সমর্থন জুগিয়ে এসেছে।
এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও বিবৃতির মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ সমগ্র বিশ্বমঞ্চে দেশ দুটির মধ্যকার বিরাজমান চরম অবিশ্বাস, রাজনৈতিক বৈরিতা ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি আরও একবার অত্যন্ত নগ্নভাবে প্রকাশ্যে চলে এলো।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা এবং সংবাদমাধ্যম পার্সটুডের প্রকাশিত বিস্তারিত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা যায়, হোয়াইট হাউসের একজন শীর্ষ মুখপাত্রের সাম্প্রতিক ইরানবিরোধী দীর্ঘ ও বিদ্বেষপূর্ণ অভিযোগের তাৎক্ষণিক ও কড়া জবাব দিতে গিয়ে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই শ্লেষাত্মক মন্তব্য করেন ইসমাইল বাকায়ি।
বিশ্বব্যাপী বহুল ব্যবহৃত এক্স (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্মে দেওয়া এক দীর্ঘ, তথ্যবহুল ও বিশ্লেষণধর্মী পোস্টে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের চিরাচরিত দ্বিমুখী নীতির কঠোর সমালোচনা করেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এবং বিশ্ববাসীর সামনে অন্য দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার এমন হীন কূটনৈতিক অপপ্রয়াসকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অভ্যাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই বর্ণনা করেছেন।
নিজের আনুষ্ঠানিক ও লিখিত বিবৃতিতে ইসমাইল বাকায়ি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন, হোয়াইট হাউসের ওই মুখপাত্র সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলনে কল্পিত সব তথ্য ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের একটি দীর্ঘ তালিকা বিশ্বের সামনে তুলে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন।
তবে অত্যন্ত বিস্ময়কর ও হাস্যকর বিষয় হলো, ওই অভিযোগের তালিকায় ‘অবিশ্বাস্য নির্ভুলতার সঙ্গে’ এমন সব আগ্রাসী, ধ্বংসাত্মক ও অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, যেগুলোর মূল কারিগর বা পরিকল্পনাকারী আসলে ওয়াশিংটন নিজেই।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংঘাতে সরাসরি ইন্ধন জোগানো, স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্যায়ভাবে হস্তক্ষেপ করা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে কলঙ্কজনক ইতিহাস যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে, সুকৌশলে সেটি আড়াল করতেই তারা এখন সম্পূর্ণ অন্যায্যভাবে তেহরানের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলছে বলে তিনি জোরালো দাবি করেন।
ইরানের এই জ্যেষ্ঠ ও প্রজ্ঞাবান কূটনীতিক মনে করেন, নিজেদের ঐতিহাসিক, আইনি ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা বেমালুম এড়িয়ে যাওয়ার এমন অপচেষ্টা এবং দিনের আলোর মতো স্পষ্ট বাস্তব পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে যাওয়ার এই মার্কিন প্রবণতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এখন আর খুব একটা বিস্ময়কর কোনো বিষয় নয়।
কারণ, নিজেদের যাবতীয় ত্রুটি, ব্যর্থতা ও আগ্রাসন অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার একটি দীর্ঘস্থায়ী অপসংস্কৃতি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির স্থায়ী রূপ ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই বিভ্রান্তিকর আচরণের মনস্তাত্ত্বিক দিকটি আন্তর্জাতিক মহলের কাছে আরও সহজে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি একটি বহুল প্রচলিত, প্রাচীন ও তাৎপর্যপূর্ণ প্রবাদের সুনির্দিষ্ট উদ্ধৃতি দেন।
তিনি তার পোস্টে লেখেন, ‘দুষ্টরা পালিয়ে যায়, এমনকি যখন তাদের কেউ তাড়া করে না।’ এই প্রাচীন প্রবাদের মাধ্যমে তিনি মূলত বিশ্ববাসীকে এটিই বোঝাতে চেয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে নিজেদের অবচেতন অপরাধবোধ এবং বিশ্বমঞ্চে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য হারানোর অমূলক ভীতি থেকেই এখন কল্পিত শত্রুর ছায়ার সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করছে এবং নিজেদের পিঠ বাঁচাতে ক্রমাগতভাবে মিথ্যা অভিযোগের আশ্রয় নিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কূটনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসমাইল বাকায়ির এই সুতীক্ষ্ণ ও আক্রমণাত্মক মন্তব্য এমন এক স্পর্শকাতর ও সংকটময় সময়ে সামনে এলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যের নানামুখী জটিল সংকট এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার স্পর্শকাতর ইস্যুগুলোকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বহুমাত্রিক স্নায়ুযুদ্ধ এক সম্পূর্ণ নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে।
হোয়াইট হাউস প্রায়শই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ব্যবহার করে তেহরানকে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা তৈরি, বিভিন্ন স্বাধীনতাকামী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অর্থায়ন এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘনের মনগড়া দায়ে অভিযুক্ত করে আসছে।
বিপরীতে ইরান সরকার শুরু থেকেই এই ধরনের সকল অভিযোগ অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ও তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে প্রত্যাখ্যান করে এসেছে। তেহরানের পাল্টা ও শক্ত যুক্তি হলো, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত সামরিক উপস্থিতি, বিভিন্ন সার্বভৌম দেশে অবৈধ ও অযাচিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর ওপর একতরফাভাবে চাপিয়ে দেওয়া কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাই মূলত ওই অঞ্চলের সার্বিক শান্তি, উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা বিনষ্টের প্রধান ও একমাত্র কারণ।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর গভীর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও কড়া বিবৃতি কেবল দুই দেশের মধ্যকার কয়েক দশক ধরে চলমান দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বেরই সাধারণ প্রতিফলন নয়, বরং এটি বৈশ্বিক জনমত নিজেদের পক্ষে টানার এবং আন্তর্জাতিক সমীকরণ নিজেদের অনুকূলে রাখার এক সুকৌশলী ও নিরন্তর তথ্যযুদ্ধ।
হোয়াইট হাউস যেখানে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় দাঁড় করিয়ে তাদের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধির চিরচেনা কৌশল অবলম্বন করছে, ঠিক সেখানে তেহরান অত্যন্ত সুচারুভাবে, বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে এবং কূটনৈতিক পরিপক্বতা বজায় রেখে সেই একই অভিযোগের তির অত্যন্ত সফলভাবে ওয়াশিংটনের দিকেই ঘুরিয়ে দিচ্ছে।
এই ধরনের নিরবচ্ছিন্ন কূটনৈতিক বাকযুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার জমে থাকা বরফ গলার বা সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার কোনো যৌক্তিক সম্ভাবনা আপাতত নিকট ভবিষ্যতে একেবারেই দৃশ্যমান হচ্ছে না, বরং এই রাজনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সামনের দিনগুলোতে আরও বেশি ঘনীভূত হয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করতে পারে বলেই আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দৃঢ়ভাবে মনে করছেন।