একইসঙ্গে মার্কিন প্রশাসনকে এ ধরনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভুল হিসাব-নিকাশ ও অপপ্রচার থেকে বিরত থাকার কঠোর হুঁশিয়ারিও দিয়েছে দেশটির শীর্ষ পর্যায়ের এক নীতি-নির্ধারক। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের ওপর মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার পর দুই দেশের মধ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই এই পাল্টাপাল্টি দাবির বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ১৫ সেপ্টেম্বর। ওই দিন মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি বা অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হাউস ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস কমিটি’র এক উন্মুক্ত শুনানিতে অংশ নিয়েছিলেন।
সেখানে তিনি মার্কিন আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ সম্প্রতি ইরানের ওপর যে কঠোর ও সমন্বিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তার সরাসরি ও ধ্বংসাত্মক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে।
বেসেন্ট তার আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে উল্লেখ করেন, নতুন এই অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানে মারাত্মক জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে এবং দৈনন্দিন ব্যবহারের পেট্রোল সংগ্রহ করার জন্য সাধারণ নাগরিকদের প্রতিটি গ্যাস স্টেশন বা পেট্রোল পাম্পে তিন থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারির এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে তা ইরানের সরকারি মহল ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। মার্কিন এই শীর্ষ কর্মকর্তার দাবির কড়া জবাব দিতে বিন্দুমাত্র দেরি করেনি ইরান সরকার।
ইরানের জাতীয় সংসদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি এই মার্কিন দাবিকে সরাসরি ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের এই বক্তব্যকে সম্পূর্ণ বানোয়াট, ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যায়িত করেন।
জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক অত্যন্ত কড়া ও স্পষ্ট বার্তায় তিনি মার্কিন প্রশাসনের প্রতি সরাসরি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। ইব্রাহিম আজিজি তার অফিশিয়াল অ্যাকাউন্টে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ভাষায় লেখেন, "এই ঘটনাকে আপনাদের জন্য একটি চরম শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করুন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ভুল হিসাব-নিকাশ বা বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করা থেকে নিজেদের পুরোপুরি বিরত রাখুন।
অন্যথায় আমাদের বিজয়ী ও শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী আপনাদের এমন এক অবিস্মরণীয় শিক্ষা দেবে, যা আপনারা কখনোই ভুলতে পারবেন না।" এই কঠোর বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ধরনের মনস্তাত্ত্বিক, অর্থনৈতিক বা সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইরানের সামরিক ও জাতীয় প্রস্তুতির বিষয়টিই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি যে বাস্তবসম্মত নয় এবং তা কেবলই অপপ্রচার, সেটি প্রমাণ করতে ইব্রাহিম আজিজি তার সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে 'ইরান প্রেস'-এর ধারণ করা একটি প্রামাণ্য ভিডিও প্রতিবেদনও শেয়ার করেছেন। সেই ভিডিও প্রতিবেদনে ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরের গ্যাস স্টেশন ও পেট্রোল পাম্পগুলোর সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও প্রাত্যহিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
ভিডিও চিত্রে স্পষ্টভাবে দেখা যায় যে, জ্বালানি স্টেশনগুলোতে কোনো ধরনের অস্বাভাবিক ভিড়, হাহাকার বা গাড়ির দীর্ঘ সারি নেই। বরং সাধারণ মানুষ অত্যন্ত স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এবং কোনো রকম ভোগান্তি ছাড়াই মাত্র তিন থেকে চার মিনিটের মধ্যে নিজেদের যানবাহনে প্রয়োজনীয় জ্বালানি ভরে গন্তব্যে চলে যাচ্ছেন।
এই ভিডিও চিত্রটি শেয়ার করে ইব্রাহিম আজিজি মূলত বিশ্ববাসীকে প্রমাণ করে দেখাতে চেয়েছেন যে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করার যে করুণ গল্প মার্কিন প্রশাসন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রচার করছে, তা কেবলই একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যাচার।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যকার বর্তমান এই কূটনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক লড়াই নতুন কোনো ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরেই ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিতে এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাব বিস্তারকে কোণঠাসা করতে যুক্তরাষ্ট্র একের পর এক কঠোর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসছে।
তবে ইরান সরকার সবসময়ই এই বহুমুখী অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করে নিজেদের স্বনির্ভরতা ও স্বাভাবিক জনজীবন বজায় রাখার দাবি করে আসছে। সাম্প্রতিক পেট্রোল সংকটের এই পাল্টাপাল্টি দাবি মূলত দুই দেশের মধ্যকার বৃহত্তর তথ্যযুদ্ধ বা ন্যারেটিভ যুদ্ধেরই একটি পরিষ্কার খণ্ডচিত্র।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্র প্রমাণ করতে চাইছে যে তাদের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শতভাগ কার্যকর হচ্ছে এবং ইরানের সাধারণ মানুষ এর সরাসরি নেতিবাচক ফল ভোগ করছে। অন্যদিকে ইরান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে স্পষ্টভাবে দেখাতে চাইছে যে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তাদের দৈনন্দিন জীবনে বা অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাবই ফেলতে পারেনি এবং দেশের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক গতিতেই চলছে।