রবিবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬
৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুদ্ধ নাকি আলোচনা-এই দ্বৈততা বাস্তব নয়, প্রয়োজন যুদ্ধ ও কূটনীতি দুটোই - গালিবাফ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৬:৫৭ পিএম

যুদ্ধ নাকি আলোচনা-এই দ্বৈততা বাস্তব নয়, প্রয়োজন যুদ্ধ ও কূটনীতি দুটোই - গালিবাফ
ছবি : File Photo

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই নিজেদের অনড় ও আপসহীন অবস্থানের কথা আবারও বিশ্ববাসীকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান।

 

দেশটির আইনসভা বা পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফ অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেছেন যে, কোনো একটি দেশের টিকে থাকার লড়াইয়ে ‘যুদ্ধ’ এবং ‘আলোচনা’-এই দুটিকে পরস্পরের বিকল্প বা সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখার কোনো যৌক্তিক সুযোগ নেই।

 

বরং বাস্তবসম্মত ও আধুনিক রাষ্ট্রীয় নীতি হলো, দেশের সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যুদ্ধ এবং কূটনীতিকে সমান্তরালভাবে একই সুতোয় গেঁথে এগিয়ে নেওয়া। রবিবার রাজধানী তেহরানে সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে দেওয়া এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণে তিনি এই দ্ব্যর্থহীন মন্তব্য করেন, যা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে নতুন করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

ইরানের এই শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারক তার সুদীর্ঘ বক্তব্যে যুদ্ধ ও কূটনীতির মধ্যকার নিবিড় কৌশলগত সম্পর্কের বিষয়টি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন, রণাঙ্গন বা যুদ্ধক্ষেত্র এবং কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলের মধ্যে বাস্তবে কোনো ধরনের দ্বৈততা বা বিরোধ থাকতে পারে না।

 

একটি স্বাধীন, আত্মমর্যাদাশীল ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের মূল কৌশল হওয়া উচিত অত্যন্ত বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা ও সামরিক শক্তিমত্তার সর্বোচ্চ প্রয়োগের মাধ্যমে শত্রুর যাবতীয় আগ্রাসন মোকাবিলা করা এবং ঠিক উপযুক্ত সময়ে একটি শক্তিশালী অবস্থান ও প্রখর যুক্তিবোধ নিয়ে মাথা উঁচু করে আলোচনার টেবিলে বসা।

 

স্পিকার কলিবফের মতে, জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনের মুহূর্তে যেকোনো রাষ্ট্রকে তার সামরিক সক্ষমতার সর্বোচ্চ প্রয়োগ ঘটিয়ে শত্রুকে পিছু হটতে বাধ্য করতে হবে এবং তাদের ওপর কঠোরতম আঘাত হানতে হবে।

 

পরবর্তীতে যখন যুদ্ধক্ষেত্রে সেই কাঙ্ক্ষিত ও উল্লেখযোগ্য সামরিক সাফল্য অর্জিত হবে এবং প্রতিপক্ষ তুলনামূলক দুর্বল, পর্যুদস্ত বা কোণঠাসা অবস্থায় পতিত হবে, ঠিক তখনই কূটনীতির মোক্ষম তাসটি ব্যবহার করে সামরিক অর্জনগুলোকে রাজনৈতিকভাবে চিরস্থায়ী ও সুসংহত করতে হবে।

 

মূলত এভাবেই শত্রুর ওপর নিজেদের শর্ত ও পরাজয় চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব। আর এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নিজেদের শক্তির উপাদানগুলোকে আরও সংঘবদ্ধ ও জোরদার করে চূড়ান্তভাবে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধক্ষমতা বা প্রতিপক্ষকে চিরতরে নিরুৎসাহিত করার সক্ষমতা অর্জন করা যায় বলে তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করেন।

 

কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বর্তমান ইরানের অবস্থান আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট, অত্যন্ত যৌক্তিক এবং কোনোভাবেই আপসযোগ্য নয় বলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কড়া ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছেন মোহাম্মদ বাকের কলিবফ।

 

তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে জানান, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে ইরান ইতোমধ্যে তাদের সুনির্দিষ্ট বার্তা এবং অলঙ্ঘনীয় শর্তগুলো সংশ্লিষ্ট প্রতিপক্ষের কাছে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে পৌঁছে দিয়েছে।

 

শত্রুপক্ষ এখন খুব ভালো করেই জানে যে, কূটনীতির আড়ালে প্রতারণার হীন আশ্রয় নেওয়া কিংবা পেশিশক্তির জোরে একতরফাভাবে কোনো অন্যায্য সিদ্ধান্ত একটি স্বাধীন জাতির ওপর চাপিয়ে দেওয়ার পথ এখন চিরতরে রুদ্ধ হয়ে গেছে। এই প্রসঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনী হরমুজ প্রণালির বিষয়টি টেনে তিনি পশ্চিমা বিশ্ব ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

 

তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় জানিয়ে দেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত ইরানের উত্থাপিত যৌক্তিক শর্তগুলো পুরোপুরি পূরণ না করা হচ্ছে, ইরানি জনগণের দীর্ঘদিনের ন্যায্য অধিকারগুলোকে নিঃশর্ত স্বীকৃতি দেওয়া না হচ্ছে এবং স্বাক্ষরিত চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া পূর্ববর্তী প্রতিশ্রুতিগুলো অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আগের মতো স্বাভাবিক আলোচনার টেবিলে ফিরে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

 

একই সঙ্গে, কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত করে দেওয়ারও বিন্দুমাত্র কোনো সুযোগ আপাতত অবশিষ্ট থাকবে না।

 

ভাষণের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে মধ্যপ্রাচ্য বা পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের এক নতুন ও স্বাধীন রূপরেখা তুলে ধরেন এই বর্ষীয়ান ইরানি রাজনীতিক। তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ঘোষণা করেন যে, পশ্চিম এশিয়ায় এতদিন ধরে চলে আসা যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক পুরোনো, শোষক ও আগ্রাসী বিশ্বব্যবস্থা এখন সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছে।

 

বর্তমান পরিবর্তিত বাস্তবতায় এই অঞ্চলের স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশগুলোকেই নিজস্ব তাগিদে এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি সম্পূর্ণ নতুন, স্থিতিশীল ও সুরক্ষিত আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

 

কলিবফ তার দেশের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক সংগ্রামের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ঐতিহাসিকভাবেই ইরানের অদম্য ও মুক্তিকামী জনগণের দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি, যুদ্ধময়দানে থাকা সাহসী সামরিক কমান্ডারদের প্রখর বিচক্ষণতা এবং সর্বোপরি দেশের স্কুল, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে অধ্যয়নরত সম্ভাবনাময় নতুন প্রজন্মের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখেই তারা সামনের দিকে অদম্য গতিতে এগিয়ে যাবেন।

 

তিনি সমগ্র বিশ্ববাসীর উদ্দেশে একটি সুস্পষ্ট ও চিরন্তন বার্তা দিয়ে তার দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য শেষ করেন। তিনি বলেন, একটি জাতির ভবিষ্যতের স্বাধীন পথ কখনোই পরাশক্তিগুলোর কাছে ভিক্ষা চাওয়া বা অনুনয়-বিনয়ের মাধ্যমে অর্জিত হতে পারে না; বরং এই পথ কেবল প্রখর যুক্তিবোধ, অসীম সাহস এবং নিরন্তর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমেই চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়ে থাকে।

 

- পার্সটুডে