যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সারির সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর কাছে সংশ্লিষ্ট দুটি নির্ভরযোগ্য সূত্র পেন্টাগনের এই হালনাগাদ আর্থিক প্রতিবেদনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে এই বিপুল সামরিক ব্যয় নিয়ে এরই মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
পেন্টাগনের গোপনীয় ওই প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সূত্রগুলো জানিয়েছে, গত ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক ব্যয় ছিল ৪ হাজার ৩৬০ কোটি ডলার। এর সঙ্গে যুদ্ধকালীন অতিরিক্ত জ্বালানি ও লজিস্টিক খরচ হিসেবে আরও ১৫০ কোটি ডলার যুক্ত হয়েছে।
ফলে সর্বমোট দৃশ্যমান সামরিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৫১০ কোটি ডলারে। তবে সামরিক বিশেষজ্ঞদের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বিশাল অঙ্কের হিসাবে মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও বিভিন্ন কৌশলগত স্থাপনা মেরামতের বিপুল খরচ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
ফলে প্রকৃত সামরিক ব্যয়ের অঙ্ক এই আনুষ্ঠানিক হিসাবের চেয়েও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে গত জুলাই মাসে পেন্টাগন জানিয়েছিল যে, তখন পর্যন্ত যুদ্ধে মোট খরচ হয়েছিল ৩ হাজার ৭৫০ কোটি ডলার। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে এই ব্যয় আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
যদিও মার্কিন আইনপ্রণেতারা এই যুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ও পরোক্ষ খরচের বিস্তারিত এবং স্বচ্ছ হিসাব দাবি করেছিলেন, কিন্তু পেন্টাগন এখন পর্যন্ত সেই পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পেন্টাগনের দেওয়া এই হিসাব মার্কিন কংগ্রেসনাল বাজেট অফিসের (সিবিও) পূর্ববর্তী প্রাক্কলনের চেয়েও অনেক বেশি। সিবিও এর আগে জানিয়েছিল যে, গত ১ আগস্ট পর্যন্ত এই সংঘাতে মার্কিন ব্যয় ৩ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের কাছাকাছি হতে পারে।
তাদের ওই হিসাবেও ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামতের ব্যয় ধরা হয়নি। সংস্থাটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই বিপুল সামরিক ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশই ব্যয়িত হয়েছে অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র ক্রয়, পরিবহন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সেগুলো ব্যবহারের পেছনে।
সংঘাত যদি বর্তমান মাত্রায় চলমান থাকে, তবে প্রতি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অতিরিক্ত আরও ২০০ থেকে ৩০০ কোটি ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে বলে সিবিও অত্যন্ত কঠোর সতর্কতা উচ্চারণ করেছে।
আর যদি সংঘাতের তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পায়, তবে এই আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কল্পনাতীতভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যুদ্ধের এই দীর্ঘস্থায়ী রূপ কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বরং খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
কংগ্রেসনাল বাজেট অফিস আরও জানিয়েছে, এই সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে আগামী ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিকে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি চরম আকার ধারণ করার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমানে যখন দেশের সাধারণ মানুষ নিজেদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন, ঠিক সেই সময়ে এমন লাগামহীন ও অতিরিক্ত সামরিক ব্যয় মার্কিন অর্থনীতির ওপর এক প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে। প্রথম দিনের আকস্মিক ও ভয়াবহ হামলাতেই ইরানের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ পর্যায়ের নেতা এবং ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন।
এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের জবাবে ইরান অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন কৌশলগত স্থাপনাগুলোতে তীব্র মাত্রায় পাল্টা হামলা শুরু করে। বর্তমানে এই যুদ্ধ কার্যত পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে এক ভয়াবহ রূপ নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম প্রধান জলপথ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক ও পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে গভীর সংকট ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলছে। ভয়াবহ এই যুদ্ধ থামাতে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ওমান, কাতার এবং পাকিস্তানসহ বেশ কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে নানামুখী কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর যুদ্ধবিরতি বা সংঘাত পুরোপুরি থামানোর মতো কোনো ইতিবাচক ফলাফল দৃশ্যমান হয়নি।