দীর্ঘদিন ধরে চলমান প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাত এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকেই এই সম্ভাব্য বৈঠকের ইঙ্গিত প্রকাশ্যে এসেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও কূটনীতিবিদরা মনে করছেন, এই বৈঠকটি যদি সত্যি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা নিরসন এবং একটি ধ্বংসাত্মক পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধ রোধে অত্যন্ত কার্যকরী ও নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
বিশ্বের পরাশক্তিগুলো এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন গভীর আগ্রহ ও উৎকণ্ঠার সঙ্গে নিউইয়র্কের দিকে তাকিয়ে আছে। রোববার মার্কিন টেলিভিশন চ্যানেল ফক্স নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই এই সম্ভাব্য বৈঠকের বিষয়ে তাঁর ইতিবাচক মনোভাবের কথা জানান।
ফক্স নিউজের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ট্রে ইঙ্গিস্টের সঙ্গে আলাপকালে তিনি মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি এবং ওয়াশিংটনের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন। আলোচনার একপর্যায়ে প্রতিবেদক ইঙ্গিস্ট প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন যে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে বসার পরিকল্পনা তাঁর রয়েছে কি না।
এই প্রশ্নের সরাসরি জবাবে ট্রাম্প জানান, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনায় বসতে তাঁর ব্যক্তিগত কোনো আপত্তি নেই। তিনি উল্লেখ করেন, অধিবেশন চলাকালে সম্ভবত তিনি আলোচনার জন্য সময় বের করতে পারবেন এবং স্বাধীন থাকবেন।
তবে এই সমঝোতার সম্ভাবনার পাশাপাশি ট্রাম্প তাঁর চিরাচরিত যুদ্ধংদেহী ও কঠোর অবস্থানও পুনর্ব্যক্ত করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত স্পষ্ট ও কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন যে, আলোচনার টেবিলে বসার আগে তেহরানকে অবশ্যই ওয়াশিংটনের কৌশলগত শক্তি ও সক্ষমতা সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন থাকতে হবে।
ট্রাম্প উল্লেখ করেন, বর্তমান সংকটজনক পরিস্থিতিতে তাঁর সামনে মূলত তিনটি সুনির্দিষ্ট বিকল্প পথ উন্মুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে প্রথমটি হলো সামরিক শক্তির চূড়ান্ত প্রয়োগ ঘটিয়ে ইরানের বর্তমান ইসলামপন্থি শাসকগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করে দেওয়া।
দ্বিতীয় বিকল্প হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন কঠোরতম নিষেধাজ্ঞা ও বৈশ্বিক বাধার মাধ্যমে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণরূপে পঙ্গু করে দেওয়া। আর তৃতীয় ও ইতিবাচক বিকল্পটি হলো একটি টেকসই ও গ্রহণযোগ্য কূটনৈতিক চুক্তির মাধ্যমে চলমান সংকটের একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করা।
ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, আলোচনার সুফল পেতে হলে তেহরানকে এই তিনটি বাস্তবসম্মত বিকল্প সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখতে হবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যথাযথ ও দায়িত্বশীল আচরণ প্রদর্শন করতে হবে।
কূটনৈতিক এই সম্ভাব্য তৎপরতার পটভূমিতে রয়েছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একাশিটি অধিবেশন, যা আগামী কাল ২২ সেপ্টেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিউইয়র্কে শুরু হতে যাচ্ছে। টানা এক সপ্তাহব্যাপী চলা এই অধিবেশন আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
যুদ্ধকালীন বৈরী সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদানের লক্ষ্যে ইরানের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দলকে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ওয়াশিংটন প্রশাসন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচিসহ একাধিক জ্যেষ্ঠ ইরানি কূটনীতিক ও সরকারি কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ভিসা প্রদান করেছে।
চরম সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও এই ধরনের ভিসা প্রদানের পদক্ষেপকে অনেকেই পেছনের দরজার কার্যকর কূটনীতির একটি ইতিবাচক প্রাথমিক ধাপ হিসেবে দেখছেন। উল্লেখ্য যে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূত্রপাত হঠাৎ করে হয়নি।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে গত প্রায় দুই দশক ধরে উভয় দেশের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলছিল। দীর্ঘদিনের সেই পুঞ্জীভূত বিরোধের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান শুরু করে।
এই অভিযান শুরুর পর থেকে সংঘাত থামানোর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্যোগে অন্তত দু’বার যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও উভয় পক্ষই তা দীর্ঘস্থায়ী করতে পারেনি এবং শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির সেই উদ্যোগগুলো সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
প্রতিটি ব্যর্থ যুদ্ধবিরতির পর সংঘাতের তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এক ভয়াবহ মানবিক ও সামরিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে পরমাণু প্রকল্পের বিষয়টি তাত্ত্বিকভাবে বহাল থাকলেও, মাঠপর্যায়ের সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক রূপ ধারণ করেছে।
এখন দু’পক্ষের দ্বন্দ্ব ও সামরিক তৎপরতার মূল কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত কৌশলগত হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে বিদেশি ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর কঠোর অবরোধ ও বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে তেহরান।
এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যে এক নজিরবিহীন সরবরাহ সংকট এবং তীব্র মূল্যস্ফীতির সৃষ্টি হয়েছে। উল্লেখ্য, সমগ্র বিশ্বের মোট জ্বালানি পণ্যের প্রায় কুড়ি শতাংশই এই অত্যন্ত সংবেদনশীল জলপথ দিয়ে বিভিন্ন দেশে পরিবাহিত হয়। ফলে হরমুজ প্রণালির এই অচলাবস্থা কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বরং সমগ্র বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এক মারাত্মক স্থবিরতা তৈরি করেছে।
এই চরম সংকটের মধ্যেও একটি আশার দিক হলো, ইরান সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তাদের সুনির্দিষ্ট দাবিগুলো তুলে ধরতে শুরু করেছে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার এবং ক্ষমতাসীন ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের প্রভাবশালী মুখপাত্র মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানিয়েছেন, বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই বাণিজ্যিক পথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করে দেওয়ার ব্যাপারে তাদের সুনির্দিষ্ট কিছু যৌক্তিক শর্ত রয়েছে। এই শর্তগুলো ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের টেবিলে পৌঁছানো হয়েছে।
এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, চলমান সামরিক সংঘাতের মাঝে কৌশলগত হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করার যে কৌশল তেহরান গ্রহণ করেছিল, সেখান থেকে সরে এসে তা স্বাভাবিক করার জন্য এখন তারা কূটনৈতিক দরকষাকষিতে গুরুত্ব দিচ্ছে।
ইরানের এই কূটনৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি সমুদ্রপথে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে। শনিবার মার্কিন সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা এক পর্যালোচনায় জানিয়েছেন যে, সামগ্রিক উত্তেজনা সত্ত্বেও গত দুই সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেল, তরলীকৃত গ্যাস এবং অন্যান্য জরুরি পণ্যবাহী বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সামরিক হিসাব অনুযায়ী, সাম্প্রতিক এই জাহাজ চলাচলের পরিমাণ গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই পরিসংখ্যান থেকে এটি পরিষ্কার হয় যে, চরম সামরিক হুমকির মুখেও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এবং ইরানও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তাদের পদক্ষেপগুলো পরিচালনা করছে।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি এবং একই সাথে আলোচনার ইচ্ছার এই মিশ্র বার্তা মূলত এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক কৌশল। একদিকে তিনি নিজের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন করে ইরানকে সর্বোচ্চ চাপে রাখতে চাইছেন, অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষতি এড়াতে আলোচনার একটি খোলা জানালাও উন্মুক্ত রেখেছেন।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থি ভাবমূর্তির নেতা হওয়ায় নিউইয়র্কের এই অধিবেশনে তিনি পশ্চিমা বিশ্বের সাথে একটি বাস্তবসম্মত সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একটি ফলপ্রসূ বৈঠক কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বর্তমান যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটাবে না, বরং এটি বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক করতে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হবে। এখন সব চোখ নিউইয়র্কের দিকে, যেখানে কয়েক দিনের মধ্যেই নির্ধারিত হবে বিশ্বশান্তির ভবিষ্যৎ গতিপথ।