রবিবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬
৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তেহরানের আচরণ পরিবর্তন না করলে ঘটতে পারে ‘বড় কিছু’ - ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:১৭ পিএম

তেহরানের আচরণ পরিবর্তন না করলে ঘটতে পারে ‘বড় কিছু’ - ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারি
ছবি : File Photo

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, ক্ষমতার টানাপোড়েন এবং বহুমাত্রিক সামরিক সংঘাতের এক অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রেক্ষাপটে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতি অত্যন্ত কড়া ও দ্ব্যর্থহীন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

 

তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বিশ্ববাসীকে জানিয়েছেন, তেহরানের সঙ্গে চলমান এই ছায়াযুদ্ধ ও ক্রমবর্ধমান সংঘাতময় পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন এখন একটি চূড়ান্ত এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।

 

ইরান সরকার যদি অবিলম্বে তাদের বর্তমান আগ্রাসী আচরণ ও রাষ্ট্রীয় নীতিতে দৃশ্যমান কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন না আনে, তবে অদূর ভবিষ্যতেই মধ্যপ্রাচ্যের বুকে ‘বড় কিছু’ বা অভাবনীয় কোনো সামরিক কিংবা রাজনৈতিক ঘটনা ঘটতে পারে বলে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কঠোরভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আনাদোলুর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের এই অনমনীয় ও কঠোর অবস্থান আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

 

রবিবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ও প্রভাবশালী সম্প্রচারমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ এবং দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে ইরান ইস্যুতে নিজের প্রশাসন ও নীতিনির্ধারকদের ভবিষ্যৎ কৌশলগত অবস্থান অত্যন্ত খোলামেলাভাবে তুলে ধরেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

 

ওই সাক্ষাৎকারে তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতাদের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতিতে তার সামনে সবচেয়ে বড় এবং ভাবনার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, তিনি কি যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাধিনায়ক হিসেবে পুরো ইরান রাষ্ট্রটিকে সামরিকভাবে ধ্বংস করে দেবেন? আর যদি সত্যিই দেশটিকে ধ্বংস করতে হয়, তবে সেই চরম ও বিধ্বংসী পদক্ষেপটি তিনি ঠিক কখন এবং কীভাবে গ্রহণ করবেন।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই তীক্ষ্ণ ও আক্রমণাত্মক মন্তব্যের পরপরই তিনি তেহরানকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এ ধরনের কোনো ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ এড়াতে চাইলে ইরান সরকারের অবিলম্বে উচিত আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন মেনে ঠিকঠাক এবং দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের মতো আচরণ করা।

 

ইরান সংকট মোকাবিলায় এবং তেহরানকে নিবৃত্ত করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে বর্তমানে ঠিক কী কী কৌশলগত বিকল্প পথ খোলা রয়েছে, তার একটি সুস্পষ্ট ও বিস্তারিত রূপরেখাও ওই সাক্ষাৎকারে আন্তর্জাতিক মহলের সামনে তুলে ধরেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

 

তিনি জানান, মার্কিন প্রশাসনের টেবিলে মূলত তিনটি প্রধান বিকল্প রয়েছে। প্রথম এবং সবচেয়ে চরম বিকল্পটি হলো, সর্বাত্মক ও নিরঙ্কুশ সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দেশটিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া, যা মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দিতে পারে।

 

দ্বিতীয় বিকল্প হিসেবে তিনি দীর্ঘমেয়াদি ও কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধের কথা উল্লেখ করেন, যার মাধ্যমে বিশ্ববাজার থেকে ইরানকে বিচ্ছিন্ন করে তাদের অর্থনীতিকে কার্যত অচল করে বা তার ভাষায় ‘পচে যেতে’ দেওয়া হবে।

 

আর তৃতীয় ও সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে তিনি সরাসরি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে একটি নতুন, দীর্ঘস্থায়ী ও কার্যকর চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন। তবে তিনি অত্যন্ত জোর দিয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা থাকলেও খুব শিগগিরই সামরিক বা কৌশলগত দিক থেকে ‘বড় কিছু’ ঘটতে যাচ্ছে, যা পুরো বিশ্বের নজর কাড়তে বাধ্য।

 

একদিকে যখন সামরিক আক্রমণ ও চরম অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কড়া বার্তা দেওয়া হচ্ছে, ঠিক তার বিপরীতে কূটনৈতিক আলোচনার পথও পুরোপুরি বন্ধ করে দেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সোমবার থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে শুরু হতে যাচ্ছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহ, যেখানে বিশ্বের শীর্ষ নেতারা সমবেত হবেন।

 

এই বৃহৎ বৈশ্বিক সম্মেলনকে কেন্দ্র করে পর্দার আড়ালে নতুন কোনো কূটনৈতিক উদ্যোগ বা অভাবনীয় সংলাপের সম্ভাবনাও ট্রাম্প এককথায় উড়িয়ে দেননি। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এই অধিবেশনে ইরানের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে কোনো ধরনের ঐতিহাসিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে কি না-এমন সরাসরি প্রশ্নের জবাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত ইতিবাচক ও কৌতূহলোদ্দীপক উত্তর দিয়েছেন।

 

তিনি বিশ্ববাসীকে চমকে দিয়ে জানিয়েছেন, চলমান এই বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক উত্তেজনার মাঝেও শীর্ষ পর্যায়ের এমন একটি সরাসরি সাক্ষাৎকারের বিষয়ে তিনি ‘সম্ভবত উন্মুক্ত’ এবং পরিস্থিতি যদি ইতিবাচক ও অনুকূলে থাকে, তবে বহুল কাঙ্ক্ষিত এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হতেও পারে।

 

ফক্স নিউজের ওই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প কেবল ইরান ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক ও বিস্তৃত সংঘাতের অত্যন্ত স্পর্শকাতর প্রসঙ্গটিও তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন।

 

বিশেষ করে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত ও প্রবল শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিদের বর্তমান ভূমিকা এবং তাদের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে তিনি বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন, যা অনেক সামরিক বিশ্লেষককেই অবাক করেছে।

 

সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম মার্কিন মিত্র দেশ সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে হুথি বিদ্রোহীরা বেশ কয়েকটি অত্যাধুনিক ও শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর পরও এই গোষ্ঠীর সঙ্গে ওয়াশিংটনের নিয়মিত ও গোপন যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে ট্রাম্প অকপটে স্বীকার করেন।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত দাবি অনুযায়ী, হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একধরনের অলিখিত ও কৌশলগত সমঝোতা তৈরি হয়েছে, যার সুস্পষ্ট ভিত্তিতে হুথিরা সরাসরি মার্কিন সামরিক বাহিনীর কোনো স্থাপনা বা নৌযানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের লড়াই বা সশস্ত্র সংঘাতে না জড়ানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছে।

 

ট্রাম্পের এই অভাবনীয় মন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের চলমান মিত্রতার জটিল সমীকরণ এবং সংঘাতের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও কূটনীতিবিদদের মধ্যে নতুন মাত্রায় বিশ্লেষণ ও কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।

 

- আনাদোলু