রবিবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬
৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধে ওয়াশিংটনের কাছে সাত শর্ত দিল ইরান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৬:২২ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধে ওয়াশিংটনের কাছে সাত শর্ত দিল ইরান
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘায়িত রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতি টানতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে সাতটি সুনির্দিষ্ট শর্ত উত্থাপন করেছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের প্রধান মোহসেন রেজায়ি জানিয়েছেন, নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতারের কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে এই প্রস্তাবিত শর্তাবলি ওয়াশিংটনের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

 

সংঘাত নিরসনের এই কূটনৈতিক পদক্ষেপের পর তেহরান বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা বিরাজমান থাকা অবস্থায় ইরানের পক্ষ থেকে আসা এমন স্পষ্ট বার্তা সামগ্রিক পরিস্থিতিকে নতুন একটি কূটনৈতিক মোড়ের দিকে নিয়ে গেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।

 

রবিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক বিশেষ বার্তায় মোহসেন রেজায়ি এই স্পর্শকাতর কূটনৈতিক তৎপরতার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও বৈরিতার স্থায়ী অবসানে আনুষ্ঠানিক কোনো সংলাপে বসার আগেই নিজেদের ন্যায্য দাবি সংবলিত সাতটি শর্ত মার্কিন প্রশাসনকে অবহিত করেছে তেহরান।

 

ওয়াশিংটনের বর্তমান ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় মন্তব্য করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের নিজেদের সৃষ্ট এই জটিল আঞ্চলিক সংকট থেকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসতে চায় এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও অনিয়ন্ত্রিত করতে না চায়, তবে ইরানের বৈধ অধিকারের স্বীকৃতি প্রদান এবং তাদের উত্থাপিত শর্তাবলি মেনে নেওয়া ছাড়া বিকল্প কোনো পথ খোলা নেই।

 

তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, পারস্পরিক সম্মান ও ন্যায়সঙ্গত দাবি বিবেচনা না করে কোনো ধরনের একপাক্ষিক সমাধান চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ আর নেই। কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে মোহসেন রেজায়ি ইরানের উল্লেখযোগ্য শর্তগুলোর রূপরেখা তুলে ধরেন।

 

তিনি প্রকাশ করেন যে, আলোচনার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে তেহরান সব ধরনের সামরিক ফ্রন্টে অবিলম্বে যুদ্ধ ও আগ্রাসী অভিযান সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অন্যায্যভাবে আটকে রাখা বা জব্দ করা ইরানের সমুদয় রাষ্ট্রীয় অর্থ ও অর্থনৈতিক সম্পদ অবিলম্বে ফেরত দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

 

পাশাপাশি ইরানের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ সুরক্ষিত করতে দেশটির বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত বেআইনি নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। এর বাইরেও মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে ইয়েমেন ও সৌদি আরবের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের স্থায়ী অবসানের বিষয়টিকেও তেহরান তাদের অন্যতম পূর্বশর্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

 

তবে বাকি শর্তগুলোর স্পর্শকাতরতার কারণে সেগুলোর বিস্তারিত বিবরণ এখনই জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। রেজায়ি আরও উল্লেখ করেন যে, এই চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বন্ধের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দোহার সঙ্গে তেহরানের নিয়মিত ও নিবিড় যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

 

কাতার দায়িত্বশীল মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে ইরানের এই শর্তাবলি হোয়াইট হাউসের কাছে হস্তান্তর করেছে। ফলে এখন বল মূলত যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টেই রয়েছে এবং ইরান অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সংকট নিরসনে কী ধরনের মনোভাব ব্যক্ত করেন।

 

তিনি দাবি করেন, বর্তমান বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের খাতিরেই এই শর্তগুলো মেনে নেওয়া ওয়াশিংটনের জন্য যৌক্তিক হবে। একই সঙ্গে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, মার্কিন প্রশাসনের ফাঁকা হুমকি বা চাপ প্রয়োগের কৌশল কোনো ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না।

 

তেহরান যেকোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে এবং প্রয়োজনে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও নির্ণায়ক যুদ্ধের জন্যও সামরিকভাবে প্রস্তুত রয়েছে। কূটনৈতিক আলোচনার এই উদ্যোগের পাশাপাশি সম্ভাব্য সামরিক ঝুঁকির বিষয়েও আন্তর্জাতিক মহলকে সতর্ক করেছেন মোহসেন রেজায়ি।

 

ইরানের অভ্যন্তরীণ সামরিক ও গোয়েন্দা মূল্যায়নের বরাত দিয়ে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো মুহূর্তে নতুন করে ইরানের ওপর সামরিক আক্রমণ পরিচালনা করতে পারে। এমন বহুমুখী নিরাপত্তা ঝুঁকির মাঝেও তেহরান অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে যুদ্ধ সমাপ্তির লক্ষ্যে নতুন এক কৌশলগত পরিকল্পনার অধীনে সুচিন্তিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

 

সামরিক প্রস্তুতি এবং সমান্তরাল কূটনৈতিক প্রস্তাবনার এই সমন্বয় মূলত বিশ্বমঞ্চে ইরানের আত্মরক্ষা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার দৃঢ় সংকল্পকেই তুলে ধরেছে। আপাতত মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধপীড়িত ভবিষ্যৎ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্থিতিশীলতা বহুলাংশে নির্ভর করছে ইরানের এই সাত শর্তের জবাবে ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপের ওপর।

 

- এনডিটিভি