সোমবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬
৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সৌদি আরবের পক্ষে হামলার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েও ট্রাম্পের আকস্মিক ইউ-টার্ন

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:৩১ পিএম

সৌদি আরবের পক্ষে হামলার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েও ট্রাম্পের আকস্মিক ইউ-টার্ন
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে চরম উত্তেজনার মধ্যেই একটি অত্যন্ত অভাবনীয় ও নাটকীয় ঘটনার সাক্ষী হলো বিশ্ববাসী। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান মিত্র সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের জরুরি ও অত্যন্ত জোরালো আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথিদের ওপর সামরিক হামলার চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

 

কিন্তু হামলার একেবারে অন্তিম মুহূর্তে, যখন মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলোতে ভারী বোমা লোড করা হয়ে গেছে এবং লক্ষ্যবস্তুগুলোও নিখুঁতভাবে রাডারে স্থির করা হয়েছে, ঠিক তখনই এক আকস্মিক ‘ইউ-টার্ন’ নেন তিনি। আকস্মিকভাবেই সম্পূর্ণ বাতিল করা হয় এই সুবিশাল সামরিক অভিযান।

 

বিখ্যাত মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে এই অভাবনীয় তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে, যা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সমীকরণে এক নতুন ও গভীর রহস্যের জন্ম দিয়েছে।

 

গত সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এনডিটিভির প্রকাশিত বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই নাটকীয় পটপরিবর্তনের পেছনের বেশ কিছু প্রাসঙ্গিক ও চমকপ্রদ তথ্য তুলে ধরা হয়।

 

বিশ্ববাণিজ্যের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত লোহিত সাগরের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য এবং ধারাবাহিক বিস্তার ঠেকাতে সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ কামনা করে আসছিল।

 

প্রথমদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবের এই আঞ্চলিক সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায় গত বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর। ওই দিন সৌদি আরবের ডি ফ্যাক্টো শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘ ফোনালাপ অনুষ্ঠিত হয়।

 

এই ফোনালাপের পরই ট্রাম্প তার পূর্বের অবস্থান থেকে সরে আসেন এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনকে হুথি ঘাঁটিগুলোতে সরাসরি ও বিধ্বংসী বিমান হামলার সুস্পষ্ট নির্দেশ প্রদান করেন। পেন্টাগনও সর্বোচ্চ সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করে এই নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য অগ্রসর হয়।

 

মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রস্তুতি যখন একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন হঠাৎ করেই রোববারের মধ্যে নিজের সিদ্ধান্তটি পুনরায় পরিবর্তন করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি সামরিক ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের অতি দ্রুত বার্তা দিয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, অন্তত সাময়িকভাবে হলেও ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে সরাসরি কোনো বিমান হামলা বা সামরিক অভিযান চালানো হবে না।

 

এমন একটি অন্তিম মুহূর্তে এসে ট্রাম্পের এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের পেছনের কারণ খুঁজতে গিয়ে হোয়াইট হাউসের ভেতরের এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত দ্বন্দ্বের চিত্র সামনে আসে।

 

যদিও এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত বদল বা সামরিক অভিযান বাতিলের বিষয়ে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি, তবুও প্রশাসনের ভেতরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, কৌশলগত কারণে হামলা বাতিল হলেও মিত্রদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিশ্রুতি থেকে সামান্যতম সরে আসেনি।

 

তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌদি আরবের ঐতিহাসিক ও অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে এবং যেকোনো মূল্যে আঞ্চলিক মিত্রদের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও নিরাপত্তা রক্ষায় ওয়াশিংটন গভীরভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

 

তাহলে কেন এই শেষ মুহূর্তের পিছুটান? আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক এবং মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, এই আকস্মিক ইউ-টার্নের পেছনে সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান প্রত্যক্ষ সংঘাত।

 

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ভয়াবহ যুদ্ধের কারণে ওয়াশিংটনের শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা বর্তমানে অত্যন্ত সতর্ক ও সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং বিশ্বস্ত উপদেষ্টাদের একটি বড় অংশ সৌদি আরবের হয়ে হুথিদের বিরুদ্ধে নতুন করে আরেকটি যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করার তীব্র বিরোধিতা করেছেন।

 

তাদের সুস্পষ্ট যুক্তি হলো, একদিকে যখন ইরানের সঙ্গে আমেরিকার সর্বাত্মক ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ চলছে, ঠিক সেই মুহূর্তে ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়াটা হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি মারাত্মক কৌশলগত ভুল।

 

এই দ্বিমুখী যুদ্ধ মার্কিন সামরিক বাহিনীর সক্ষমতাকে মারাত্মক চাপে ফেলতে পারে বলে তারা গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ইরানের বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প বর্তমানে একটি অত্যন্ত চূড়ান্ত ও ফয়সালামূলক অবস্থানে রয়েছেন এবং তিনি স্পষ্টভাবে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো সময় আরও বড় ধরনের ও চূড়ান্ত সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হতে পারে।

 

এমন একটি সংবেদনশীল মুহূর্তে নজর অন্যদিকে সরাতে চাননি তার অভিজ্ঞ উপদেষ্টারা। অন্যদিকে, এই সামরিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের পেছনে কূটনীতির এক অত্যন্ত প্রচ্ছন্ন ও কার্যকর খেলাও কাজ করেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই সেই নেপথ্য কূটনৈতিক যোগাযোগের কথা অকপটে স্বীকার করেছেন।

 

তিনি প্রকাশ করেছেন যে, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা মার্কিন প্রশাসনকে এই মর্মে একটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, তারা কোনো অবস্থাতেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বা তাদের কোনো স্বার্থের ওপর সরাসরি হামলা চালাবে না। ট্রাম্প আরও জানান যে, হুথিদের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের ক্রমাগত ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে।

 

এর আগে, গত ১২ সেপ্টেম্বর ইউরোপের দেশ আয়ারল্যান্ড সফরের সময়ও সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন যে, হুথিরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো ধরনের সরাসরি সামরিক লড়াই এড়াতে অত্যন্ত সচেতনভাবে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে।

 

পর্দার আড়ালের এই কূটনৈতিক নিশ্চয়তাও ট্রাম্পকে সামরিক হামলার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বড় ধরনের প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই আকস্মিক ও নাটকীয় সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপে পড়েছে তাদের দীর্ঘদিনের অকৃত্রিম মিত্র সৌদি আরব।

 

বিশেষ করে এমন এক চরম সংকটময় মুহূর্তে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই ইউ-টার্ন নিলেন, যখন সৌদি সরকার আক্ষরিক অর্থেই সামরিক দিক থেকে একটি খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে। গত সপ্তাহের শেষ দিকে খোদ সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে হুথি বিদ্রোহীরা অত্যন্ত ভয়াবহ ও বিধ্বংসী আন্তঃসীমান্ত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, যা সৌদির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক বিশাল ও অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

কেবল রিয়াদের বুকেই নয়, ইয়েমেনের অভ্যন্তরেও সৌদি আরবের সরাসরি সমর্থনপুষ্ট সরকারি বাহিনীর হাত থেকে একের পর এক কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বহু এলাকা হুথিদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে।

 

ইয়েমেনের মাটিতে রিয়াদের সামরিক কৌশল যখন চরম বিপর্যয়ের মুখে এবং খোদ সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা যখন মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন, ঠিক সেই মুহূর্তে মার্কিন সামরিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়াটা যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের জন্য এক চরম হতাশা ও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সুচিন্তিত তবে আকস্মিক সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম কিন্তু সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। আঞ্চলিক মিত্রদের সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি এবং নিজেদের বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে ট্রাম্প যে অত্যন্ত সতর্ক ও মাপা পথ অবলম্বন করছেন, এটি তারই একটি জ্বলন্ত প্রমাণ।

 

একদিকে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে তার সামরিক কঠোরতা ও যুদ্ধংদেহী অবস্থান সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রাখছেন, অন্যদিকে হুথিদের সঙ্গে এক ধরনের অলিখিত অনাগ্রাসন চুক্তি বা গোপন বোঝাপড়ার মাধ্যমে নিজেদের বাহিনীকে অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘাত থেকে অত্যন্ত সুকৌশলে দূরে রাখছেন।

 

তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশলগত পশ্চাদপসরণ মধ্যপ্রাচ্যে তাদের মিত্রদের মনে দীর্ঘমেয়াদী আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে কি না, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের সবচেয়ে বড় পর্যালোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

চূড়ান্ত বোমা লোড হওয়া যুদ্ধবিমান রানওয়ে থেকে ফিরিয়ে আনার এই অবিশ্বাস্য ঘটনা বিশ্ব কূটনীতির ইতিহাসে একটি অত্যন্ত বিরল ও শ্বাসরুদ্ধকর উদাহরণ হিসেবেই চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 

- এনডিটিভি