সোমবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬
৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যেকোনো আগ্রাসন রুখে দিতে প্রস্তুত ইরান, সব সীমান্তে সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ সতর্কতা ও রণপ্রস্তুতি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:১২ পিএম

যেকোনো আগ্রাসন রুখে দিতে প্রস্তুত ইরান, সব সীমান্তে সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ সতর্কতা ও রণপ্রস্তুতি
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে চলমান চরম উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত জটিল ও পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যেই নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা ও পবিত্র ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় এক কঠোর, সুদৃঢ় এবং আপসহীন অবস্থান ঘোষণা করেছে ইরান।

 

যেকোনো ধরনের বহিরাগত পরাশক্তির প্রচ্ছন্ন হুমকি এবং সম্ভাব্য সামরিক আগ্রাসন অত্যন্ত শক্ত হাতে ও সুকৌশলে মোকাবিলা করার জন্য দেশের সমস্ত সীমান্তবর্তী অঞ্চল ও কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে নিজেদের সামরিক উপস্থিতিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করেছে তেহরান।

 

ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সেনাবাহিনীর স্থলবাহিনীর শীর্ষ কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী জাহানশাহী অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানিয়ে দিয়েছেন যে, দেশের প্রতিটি সীমান্ত এলাকায় সেনাবাহিনীর বিভিন্ন চৌকস ইউনিট বর্তমানে সর্বোচ্চ পর্যায়ের যুদ্ধপ্রস্তুতি গ্রহণ করে নিয়মিতভাবে মোতায়েন রয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম পার্সটুডে এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরআইবির (IRIB) নির্ভরযোগ্য বরাত দিয়ে প্রকাশিত সামরিক শীর্ষ পর্যায়ের এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিবৃতিটি ঠিক এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে সামনে এসেছে, যখন গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এক ধরনের চরম অস্থিতিশীলতা, প্রক্সি সংঘাত এবং সরাসরি সামরিক যুদ্ধের এক কালো ছায়া বিরাজ করছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, নিরাপত্তা ও সামরিক কৌশলগত বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই সর্বাত্মক রণপ্রস্তুতি এবং প্রকাশ্য সামরিক ঘোষণা মূলত তাদের সম্ভাব্য বৈশ্বিক শত্রুদের প্রতি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ এবং সুস্পষ্ট কৌশলগত সতর্কবার্তা।

 

বিশাল আয়তনের দেশ ইরানের অত্যন্ত বিস্তৃত এবং ভৌগোলিক দিক থেকে বৈচিত্র্যময় সীমানাকে নিশ্ছিদ্রভাবে সুরক্ষিত রাখতে সামরিক বাহিনী যে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং সুদূরপ্রসারী কৌশল গ্রহণ করেছে, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী জাহানশাহীর বিস্তারিত বক্তব্যে তার একটি অত্যন্ত পরিষ্কার ও বস্তুনিষ্ঠ চিত্র ফুটে উঠেছে।

 

তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন যে, যেকোনো সম্ভাব্য হুমকির সামান্যতম পূর্বাভাস পাওয়ার পর থেকেই সেনাবাহিনীর স্থলভাগ অত্যন্ত তৎপর হয়ে ওঠে। আগাম সতর্কতামূলক ও প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে ‘রমজান’ যুদ্ধ বা সংঘাত শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই দেশের স্থলবাহিনীর অত্যন্ত দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও আধুনিক সমরাস্ত্রে সুসজ্জিত বিশেষ ইউনিটগুলোকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় অত্যন্ত সুচারুভাবে ও ব্যাপকভাবে মোতায়েন করা হয়েছিল।

 

এই দূরদর্শী পূর্বপ্রস্তুতি থেকে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, ইরানের আধুনিক সামরিক নেতৃত্ব যেকোনো আকস্মিক আক্রমণ বা বহিরাগত আগ্রাসন মোকাবিলায় কেবল ঘটনার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার ওপর মোটেও নির্ভর করে না।

 

বরং তারা নিজস্ব শক্তিশালী গোয়েন্দা তথ্য, স্যাটেলাইট নজরদারি এবং কৌশলগত সামরিক পূর্বাভাসের ভিত্তিতে নিজেদের প্রথম সারির প্রতিরক্ষা ব্যূহকে আগে থেকেই শত্রুর জন্য সম্পূর্ণ দুর্ভেদ্য করে তুলতে সবচেয়ে বেশি অভ্যস্ত।

 

স্থলবাহিনীর এই ব্যাপক ও বহুমুখী বিস্তৃতির ভৌগোলিক রূপরেখা সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য তুলে ধরতে গিয়ে সামরিক বাহিনীর এই শীর্ষ কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান যে, বর্তমানে তাদের সশস্ত্র বাহিনীর বিশাল একটি অংশ দেশের উত্তর-পশ্চিমের দুর্গম পার্বত্য এলাকা, পশ্চিমের স্পর্শকাতর সীমান্ত, দক্ষিণ-পশ্চিমের রণকৌশলগত অঞ্চল, পূর্বের বিস্তীর্ণ মরুভূমি, উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তগুলোতে অত্যন্ত কার্যকর ও নিখুঁতভাবে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে।

 

এর মধ্যে তিনি বিশেষভাবে এবং আলাদা করে গুরুত্বারোপ করেছেন কৌশলগত ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল মাকরান উপকূলীয় অঞ্চলের ওপর। সুবিশাল আরব সাগর এবং কৌশলগত ওমান উপসাগরের তীরবর্তী এই বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলটি কেবল ইরানের নিজস্ব অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, জ্বালানি পরিবহন এবং বাণিজ্যিক স্বার্থের জন্যই নয়, বরং আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল পথ এবং বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকেও সমগ্র বিশ্বের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি এলাকা।

 

এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অঞ্চলসহ দেশের চারপাশের প্রতিটি ভৌগোলিক প্রবেশপথে স্থলবাহিনীর এমন অভূতপূর্ব, সুসংগঠিত এবং শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে ইরান মূলত তাদের জাতীয় প্রতিরক্ষা প্রাচীরকে নিশ্ছিদ্র ও অভেদ্য করারই একটি সফল ও প্রকাশ্য মহড়া বিশ্ববাসীকে প্রদর্শন করছে।

 

আধুনিক সামরিক বিজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক যুদ্ধকৌশলে ‘প্রতিরোধমূলক সক্ষমতা’ (Deterrence) বা মনস্তাত্ত্বিক ভীতি প্রদর্শন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফলপ্রসূ বিষয়। কৌশলগত বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের স্থলবাহিনীর বর্তমান সামরিক বিন্যাস ও রণকৌশল ঠিক এই অত্যাধুনিক নীতির ওপরই অত্যন্ত শক্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে।

 

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী জাহানশাহী অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে এবং দৃপ্ত কণ্ঠে জোর দিয়ে বলেন যে, বর্তমানে ইরানের প্রতিটি সীমান্তে তাদের স্থলবাহিনীর চৌকস ইউনিটগুলো কেবল প্রথাগত সাধারণ পাহারায় নিযুক্ত নেই, বরং তারা যেকোনো ধরনের আগ্রাসী আক্রমণ বা অনুপ্রবেশ মুহূর্তের মধ্যে অঙ্কুরেই নস্যাৎ করে দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় ও সর্বাধুনিক সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে অত্যন্ত কার্যকরভাবে মাঠে অবস্থান করছে।

 

তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেন, দেশের প্রতিটি প্রান্তে ও সীমান্তে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর এই দৃশ্যমান, সুসংগঠিত এবং শক্তিশালী উপস্থিতিই মূলত শত্রুপক্ষের মনে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ভীতির সঞ্চার করেছে। এই অবিচল প্রস্তুতি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এমন একটি শক্তিশালী প্রতিরোধমূলক সক্ষমতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যা যেকোনো পরাশক্তিকে দ্বিতীয়বার ভাবতে বাধ্য করবে।

 

নিজেদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি আধুনিক সামরিক শক্তি এবং সৈন্যদের মানসিক দৃঢ়তার ওপর প্রগাঢ় আস্থা প্রকাশ করে ইরানের এই শীর্ষ সেনাপতি বলেন, স্থলবাহিনীর এই নিরবচ্ছিন্ন ও ইস্পাতকঠিন উপস্থিতির কারণেই বর্তমান সময়ের কোনো সম্ভাব্য বৈশ্বিক শত্রু, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী বা আগ্রাসী পরাশক্তি ইরানের পবিত্র সীমান্তে সরাসরি কোনো সামরিক অভিযান পরিচালনা বা হঠকারী হামলা চালানোর মতো দুঃসাহস দেখাতে পারছে না।

 

শত্রুরা নিজেদের উন্নত গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমেই খুব ভালো করেই জানে যে, বলপ্রয়োগ করে ইরানের মাটিতে পা রাখার যেকোনো অপচেষ্টার চূড়ান্ত পরিণতি হবে তাদের কল্পনার চেয়েও অত্যন্ত ভয়াবহ এবং ধ্বংসাত্মক।

 

সামরিক বাহিনীর এই পাহাড়সম আত্মবিশ্বাস কেবল তাদের হাতে থাকা অত্যাধুনিক ড্রোন বা ব্যালিস্টিক মিসাইলসহ অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি, বরং এটি মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পবিত্র লড়াইয়ে নিয়োজিত প্রতিটি সেনাসদস্যের অদম্য মানসিকতা, নিখাদ দেশপ্রেম এবং আত্মত্যাগের সর্বোচ্চ সদিচ্ছারই এক অকৃত্রিম প্রতিফলন।

 

পরিশেষে, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহানশাহী অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও জোরালো ভাষায় দেশের আপামর জনসাধারণ এবং সমগ্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই মর্মে সম্পূর্ণ আশ্বস্ত করেন যে, যেকোনো মূল্যে দেশের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং পবিত্র ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা সেনাবাহিনীর প্রধান এবং পবিত্রতম দায়িত্ব।

 

দেশের চারপাশের প্রতিটি সীমান্তে দিবা-রাত্রি সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি অব্যাহত রাখা এবং ধারাবাহিক ও শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করার মাধ্যমেই ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সেনাবাহিনীর স্থলবাহিনী তাদের ওপর অর্পিত এই মহান ও ঐতিহাসিক জাতীয় দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠা, সততা ও সফলতার সাথে পালন করে যাচ্ছে।

 

বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে এই ধরনের কঠোর ও সুসংগঠিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ইরান সমগ্র বিশ্বকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এই চূড়ান্ত বার্তাই দিচ্ছে যে, তারা সর্বদা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি কামনা করে, তবে নিজেদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে বা জাতীয় মর্যাদার বিষয়ে তারা কোনো পরাশক্তির কাছে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতেও কখনোই প্রস্তুত নয়।

 

- পার্সটুডে