সোমবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬
৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নতুন করে আক্রান্ত হলে সমরাস্ত্র ও ‘যুদ্ধের ভূগোল’ বদলে দেওয়ার হুঁশিয়ারি ইরানের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:০৩ পিএম

নতুন করে আক্রান্ত হলে সমরাস্ত্র ও ‘যুদ্ধের ভূগোল’ বদলে দেওয়ার হুঁশিয়ারি ইরানের
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ আরও একধাপ বাড়িয়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অত্যন্ত কঠোর ও দ্ব্যর্থহীন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে ইরান। দেশটির অভিজাত সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, ওয়াশিংটন যদি নতুন করে তেহরানের ওপর কোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসন বা হামলা চালানোর দুঃসাহস দেখায়, তবে তার পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ এবং অভাবনীয়।

 

রোববারের এক বিশেষ টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন যে, নতুন যেকোনো হামলার জবাবে তেহরান কেবল প্রথাগত প্রতিরোধই গড়বে না, বরং তারা তাদের সমরাস্ত্রের ধরন এবং সার্বিক ‘যুদ্ধের ভূগোল’ সম্পূর্ণভাবে বদলে ফেলবে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আনাদোলুর বরাতে পাওয়া এই খবরটি এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এক ধরনের থমথমে ও যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি ওই অঞ্চলে ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে এক নতুন এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক সমীকরণের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

 

আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি তার বক্তব্যে ভবিষ্যৎ সংঘাতের রূপরেখা নিয়ে যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, তা আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষক এবং পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।

 

তিনি অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, যদি ইরানের ওপর নতুন করে কোনো আক্রমণ হয়, তবে দেশের সামরিক বাহিনীর আক্রমণাত্মক ও রক্ষণাত্মক-উভয় কার্যক্রমে এক অভাবনীয় ও গুণগত পরিবর্তন আনা হবে।

 

প্রথাগত যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ নতুন সক্ষমতা, আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি এবং অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র নিয়ে ময়দানে অবতীর্ণ হবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী। তার মতে, ইরানের এই নতুন সামরিক কৌশল ও শক্তির মহড়া দেখে গোটা বিশ্ববাসী আক্ষরিক অর্থেই হতবাক হয়ে যাবে।

 

সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘যুদ্ধের ভূগোল’ বদলে ফেলার এই ঘোষণার অর্থ হলো, সংঘাত আর কেবল ইরানের অভ্যন্তরীণ বা সীমান্তবর্তী ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এর বিস্তৃতি গোটা মধ্যপ্রাচ্য এবং তার বাইরের মার্কিন মিত্রদের কৌশলগত অবস্থানগুলোতেও প্রবলভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

 

এর মাধ্যমে ইরান মূলত একটি অপ্রতিসম বা অসম যুদ্ধের বিস্তৃতির সুস্পষ্ট বার্তা দিয়ে রাখল। ভবিষ্যৎ সংঘাতের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের ক্ষেত্রেও ইরান যে তাদের চিরাচরিত কৌশল থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে এসেছে, তা মোহেবির বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

 

তিনি কোনো ধরনের রাখঢাক না রেখেই প্রকাশ্যেই বলেছেন, “আমাদের লক্ষ্যবস্তুগুলো আর আগের মতো নেই। আমরা অত্যন্ত সুকৌশলে এমন কিছু নতুন লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করেছি, যেগুলোতে এর আগে কখনো কোনো ধরনের হামলা চালানো হয়নি।”

 

এই মন্তব্যের গভীরতা বিশ্লেষণ করলে সহজেই অনুধাবন করা যায় যে, ইরান হয়তো যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের এমন কিছু অত্যন্ত স্পর্শকাতর সামরিক ঘাঁটি, অত্যাবশ্যকীয় অর্থনৈতিক স্থাপনা বা লজিস্টিক হাবগুলোকে নিজেদের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল বা ড্রোন হামলার আওতায় নিয়ে এসেছে, যা আগে কখনো তাদের সরাসরি হুমকির মুখে ছিল না।

 

এই নতুন কৌশলগত সমীকরণ মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং তাদের মিত্র রাষ্ট্রগুলোর জন্য এক নতুন, অপ্রত্যাশিত ও অত্যন্ত জটিল নিরাপত্তা ঝুঁকির সৃষ্টি করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, ইরান সামরিক দিক থেকে গুটিয়ে থাকার পরিবর্তে আরও বেশি আগ্রাসী কৌশল গ্রহণ করতে প্রস্তুত।

 

কেবল তাৎক্ষণিক পাল্টা আঘাত নয়, বরং যেকোনো দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের জন্যও যে ইরান মানসিকভাবে ও সামরিকভাবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত, সেই বার্তাও অত্যন্ত জোরালোভাবে দিয়েছেন এই শীর্ষ আইআরজিসি কর্মকর্তা।

 

সামরিক সংঘাতকে ইরান কীভাবে মূল্যায়ন করে, তার একটি তাত্ত্বিক ও দীর্ঘমেয়াদী ব্যাখ্যা দিয়ে মোহেবি বলেন, ইরান যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত রয়েছে। তাদের দৃষ্টিতে যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায় থাকে; যুদ্ধ কখনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনার মধ্য দিয়ে চূড়ান্তভাবে শেষ হয়ে যায় না, বরং এটি বিভিন্ন ধাপে এবং ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় অবিরত চলতেই থাকে।

 

তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে দাবি করেন যে, আইআরজিসি এই ধরনের বহুমুখী ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল, তবে সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বর্তমানে তাদের প্রস্তুতি ও সক্ষমতা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও ইরান তাদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা থেকে বিন্দুমাত্র সরে আসেনি। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় যখন সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক তৎপরতাও চলতে থাকে পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য, তখন আইআরজিসির পক্ষ থেকে এই ধরনের কোনো সম্ভাবনার কথা সম্পূর্ণ নাকচ করে দেওয়া হয়েছে।

 

মোহেবি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছেন যে, আইআরজিসি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক-কোনো ধরনের যোগাযোগের মধ্যেই নেই। এমনকি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর কোনো অংশই বর্তমান উত্তেজনার আবহে কোনো প্রকার কূটনৈতিক তৎপরতায় বা মধ্যস্থতার প্রক্রিয়ায় নিজেদের যুক্ত করেনি।

 

সামরিক বাহিনীর প্রধান এবং একমাত্র লক্ষ্য হলো যেকোনো মূল্যে দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, জাতীয় নিরাপত্তা ও চূড়ান্ত প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে তারা যে কোনো ধরনের আপস বা শর্তসাপেক্ষ কূটনীতির পথে হাঁটবে না, এই কঠোর বার্তার মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বকে সেটিই চূড়ান্তভাবে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্যের ক্ষেত্রে মোহেবির একটি মন্তব্য বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেছে, যা পশ্চিমা বিশ্বের জন্য একটি সরাসরি মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ। তিনি অত্যন্ত জোরালো দাবি তুলেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে দশকের পর দশক ধরে চলে আসা যুক্তরাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ আধিপত্যের চূড়ান্ত অবসান ঘটেছে।

 

তার মতে, ওয়াশিংটন এখন আর এই অঞ্চলের ভাগ্য নির্ধারক বা প্রধান নিয়ন্ত্রক শক্তি নেই। বরং যুক্তরাষ্ট্রের সেই শূন্যস্থান পূরণ করে ইরানই এখন সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভূ-রাজনৈতিক বিন্যাস, স্বাধীন নিরাপত্তা কাঠামো এবং কৌশলগত ব্যবস্থা নিজস্ব শর্তে গড়ে তুলছে।

 

এই দাবিটি এমন এক সময়ে করা হলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইরানের মিত্র শক্তিগুলোর প্রভাব উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। লেবানন, সিরিয়া, ইরাক থেকে শুরু করে ইয়েমেন পর্যন্ত ইরানের যে বিস্তৃত সামরিক ও রাজনৈতিক বলয় তৈরি হয়েছে, মূলত সেটির দিকে ইঙ্গিত করেই আইআরজিসি এই শক্তিশালী ও সাহসী দাবি উত্থাপন করেছে।

 

সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, ইরানের এই নতুন হুঁশিয়ারি নিছক কোনো রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর বা ফাঁকা বুলি নয়, বরং এটি তাদের সুদীর্ঘ সামরিক পরিকল্পনার একটি প্রকাশ্য রূপ।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এবং ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আইআরজিসির এই বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য একটি সরাসরি ও কঠোর সতর্কবার্তা। যদি সত্যিই কোনো কারণে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতের সূত্রপাত হয়, তবে তা আর সীমিত পরিসরে বা নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা থাকবে না।

 

অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র, সাইবার সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সমন্বয়ে ইরান এমন এক প্রলয়ংকরী যুদ্ধের সূচনা করতে পারে, যা গোটা মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র ও রাজনৈতিক সমীকরণকে চিরতরে বদলে দেবে। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজার থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথগুলোও চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে।

 

তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন গভীর উৎকণ্ঠার সাথে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ এই অঞ্চলে যেকোনো ছোট সামরিক ভুল বোঝাবুঝি বা হঠকারী সিদ্ধান্ত মুহূর্তের মধ্যে একটি ভয়াবহ ও সর্বনাশা আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, যার বিরূপ প্রভাব থেকে গোটা বিশ্ব অর্থনীতি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাও মুক্ত থাকতে পারবে না।

 

- আনাদোলু