তাঁর এই জীবনাবসানের মধ্য দিয়ে ইসলামি জ্ঞানচর্চা, ধর্মতাত্ত্বিক গবেষণা এবং আধ্যাত্মিক নির্দেশনার ক্ষেত্রে এক বিশাল ও অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। এই বরেণ্য আলেমের মৃত্যুতে ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতবা খামেনেয়ী এক বিশেষ ও আবেগঘন শোকবার্তা প্রদান করেছেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারিত এই শোকবার্তায় তিনি মরহুমের অসামান্য বৈজ্ঞানিক অবদান, জ্ঞানচর্চায় তাঁর নিরলস আত্মনিয়োগ এবং তাঁর অতুলনীয় বিনয়ী চরিত্রের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আয়াতুল্লাহ শুবেইরি জানজানির মতো একজন শীর্ষস্থানীয় গবেষকের বিদায় ইসলামি আইনশাস্ত্রের জগতে একটি সুদীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়েছে।
আয়াতুল্লাহিল উজমা শুবেইরি জানজানি কেবল একজন সাধারণ আলেম ছিলেন না; তিনি ছিলেন শিয়া ইসলামি চিন্তাধারার অন্যতম প্রধান দিকনির্দেশক এবং একজন সর্বজনস্বীকৃত মুজতাহিদ, যিনি ইসলামি আইন সম্পর্কে স্বাধীন ও অত্যন্ত গভীর গবেষণা করার ঐশী অধিকারী ছিলেন।
তাঁর প্রয়াণ মুসলিম বিশ্বের জন্য, বিশেষ করে শিয়া মতাদর্শের অনুসারী ও ধর্মতত্ত্বের গবেষকদের জন্য এক মহাবিপর্যয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ধর্মীয় বিধিবিধান বা শরিয়তের অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিষয়গুলো নিয়ে তাঁর গভীর বিশ্লেষণাত্মক ক্ষমতা এবং ইসলামি আইনশাস্ত্রে তাঁর অসামান্য দক্ষতা তাঁকে সমসাময়িক ধর্মীয় পণ্ডিতদের মধ্যে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছিল।
সর্বোচ্চ নেতার শোকবার্তায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শৈশবের সামান্য কয়েকটি বছর বাদ দিলে তাঁর দীর্ঘ ও কর্মময় জীবনের প্রায় পুরোটা সময়ই কেটেছে ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন, নিরবচ্ছিন্ন গবেষণা এবং শিক্ষাদানের মতো মহৎ কাজে।
জ্ঞানচর্চার প্রতি তাঁর এই অকৃত্রিম ভালোবাসা ও আজীবন নিবেদন তাঁকে পরিণত করেছিল এক জীবন্ত কিংবদন্তিতে, যাঁর আলোয় আলোকিত হয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতবা খামেনেয়ী তাঁর বিস্তারিত শোকবার্তায় এই মহান গবেষক ও শিক্ষকের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ও গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নাম স্মরণ করে তিনি তাঁর আনুষ্ঠানিক বার্তার সূচনা করেন। সর্বোচ্চ নেতা অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলেন যে, পরম শ্রদ্ধেয় উস্তাদ এবং উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন ফকিহ হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা শুবেইরির দুঃখজনক ইন্তেকালের সংবাদ তিনি অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে গ্রহণ করেছেন।
তিনি মহান আল্লাহর পবিত্র দরবারে মরহুমের বিদেহী আত্মার প্রতি অশেষ রহমত ও করুণা বর্ষণের জন্য বিনীত প্রার্থনা করেন। সর্বোচ্চ নেতা তাঁর বার্তায় বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, এই মহান আলেম তাঁর সমসাময়িক পণ্ডিতমণ্ডলী, একই প্রজন্মের অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং উস্তাদদের কাছে সব সময় একজন অত্যন্ত বড় মাপের গবেষক এবং অতিশয় গভীর চিন্তাশীল ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরম সমাদৃত ও সম্মানিত ছিলেন।
জ্ঞানের প্রতি তাঁর এই নিবিড় নিষ্ঠা তাঁকে সমবয়সীদের কাছেও এক অনুকরণীয় আদর্শে পরিণত করেছিল। শরিয়তের বিধান নির্ণয় এবং ইসলামি আইনশাস্ত্রের জটিল বিষয়াবলি নিয়ে আয়াতুল্লাহ শুবেইরি জানজানির যে প্রগাঢ় দক্ষতা ও পাণ্ডিত্য ছিল, তা তাঁর শিক্ষাদান পদ্ধতির মধ্যেও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হতো।
ধর্মীয় জ্ঞান ও এর পদ্ধতিগত বিশ্লেষণের ওপর তাঁর অসাধারণ দখল ছিল। যেকোনো বিষয়ের সূক্ষ্ম দিক ও খুঁটিনাটি বিষয়গুলোর প্রতি তিনি যেমন নিজে বিশেষ মনোযোগ দিতেন, তেমনি তাঁর ছাত্রদেরও সেই একই সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গিতে বিষয়গুলো নিয়ে বিশ্লেষণ করতে শেখাতেন।
সর্বোচ্চ নেতা তাঁর বার্তায় এই দিকটির প্রতি বিশেষভাবে আলোকপাত করে বলেন, সেই মহান ব্যক্তির পাঠদান সভাগুলোতে উপস্থিতির সংখ্যা হয়তো কখনো খুব বেশি হতো না বা গুটিকয়েক শীর্ষ মেধাবী ছাত্রের মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ থাকত; কিন্তু সেই সভাগুলো ছিল প্রকৃত অর্থে নিবিড় গবেষণা, প্রগাঢ় অনুসন্ধান এবং অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের এক অসামান্য ও সমৃদ্ধ সমাবেশ।
সেখানে যারা অংশগ্রহণ করার বিরল সুযোগ পেতেন, তারা কেবল প্রচলিত পুঁথিগত জ্ঞানই অর্জন করতেন না, বরং ইসলামি আইনের অন্তর্দৃষ্টি ও স্বাধীন চিন্তার এক নতুন দিগন্তের সন্ধান পেতেন। এটি যথার্থভাবেই জ্ঞানের এক বিশুদ্ধ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।
গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে আয়াতুল্লাহ শুবেইরি জানজানি ইসলামি জ্ঞান বিস্তারে যে অনবদ্য ও সুদূরপ্রসারী ভূমিকা পালন করেছেন, তা ধর্মতত্ত্বের ইতিহাসে চিরকাল ভাস্বর হয়ে থাকবে। এই দীর্ঘ সময়ে অসংখ্য জ্ঞানপিপাসু মানুষ ও গবেষক তাঁর মূল্যবান সান্নিধ্য লাভ করেছেন।
তারা তাঁদের নিজস্ব সামর্থ্য, মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী এই বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার থেকে উপকৃত হওয়ার বিরল সুযোগ পেয়েছেন এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ বৈজ্ঞানিক ও শিক্ষাদানমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য অমূল্য পাথেয় সংগ্রহ করেছেন।
তাঁর সান্নিধ্য কেবল নির্দিষ্ট চার দেয়ালের শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা ছিল জ্ঞান বিতরণ ও জ্ঞান অর্জনের এক উন্মুক্ত, স্বতঃস্ফূর্ত ও সমৃদ্ধ ক্ষেত্র। সর্বোচ্চ নেতার শোকবার্তায় উঠে আসা একটি অত্যন্ত চমৎকার ও আবেগপূর্ণ বিবরণ থেকে জানা যায় যে, পাঠদান শেষে পায়ে হেঁটে যখন তিনি তাঁর পবিত্র গৃহের দিকে যেতেন, সেই হাঁটার পথটুকুতেও তিনি তাঁর অনুসারীদের মাঝে অবিরত জ্ঞান বিতরণ করতেন।
তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ এবং প্রতিটি কথাই ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য এক একটি জীবন্ত পাঠশালা। আয়াতুল্লাহ শুবেইরি জানজানির সুপ্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক ও ধর্মীয় মর্যাদার পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিগত চরিত্রের যে দিকটি সবচেয়ে বেশি মানুষকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করত, তা হলো তাঁর সীমাহীন বিনয় এবং অত্যন্ত অমায়িক পিতৃসুলভ আচরণ।
একজন শীর্ষস্থানীয় মুজতাহিদ ও বিশ্ববরেণ্য আলেম হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ শিক্ষার্থী, ধর্মীয় তালাবা এবং ফজিলত অর্জনকারী ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর প্রাত্যহিক আচরণ ছিল অত্যন্ত কোমল, স্নেহপূর্ণ ও মাটির কাছাকাছি।
তাঁর এই পিতৃসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি কেবল তাঁর সরাসরি ছাত্রদেরই মুগ্ধ করত না, বরং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে তাঁকে একজন সর্বজনীন আদর্শ ও অনুকরণীয় মহামানব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
তাঁর এই বিনয়ী স্বভাব সর্বদাই প্রমাণ করত যে, প্রকৃত ও গভীর জ্ঞান মানুষকে কখনো অহংকারী করে না, বরং তাকে আরও বেশি বিনম্র এবং স্রষ্টা ও সৃষ্টির প্রতি দায়িত্বশীল করে তোলে। নিঃসন্দেহে, এই অসাধারণ ও বহুমুখী প্রতিভাধর ব্যক্তিত্বের চিরবিদায় বর্তমান যুগে মুসলিম বিশ্বে, বিশেষ করে শিয়া ইসলামের শীর্ষস্থানীয় গবেষক ও পণ্ডিতদের প্রথম সারিতে এক বিশাল ও অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি করেছে।
ইসলামি আইনশাস্ত্র ও ধর্মতত্ত্বের জগতে তাঁর মতো একজন প্রজ্ঞাবান, দূরদর্শী ও নিবেদিতপ্রাণ গবেষকের যে বিশাল ঘাটতি তৈরি হলো, তা হয়তো দীর্ঘ সময়েও পূরণ করা সম্ভব হবে না। তাঁর প্রয়াণ কেবল ইরানি জাতির জন্যই নয়, বরং গোটা বিশ্বের ইসলামি জ্ঞানানুরাগীদের জন্য এক গভীর শোকের ও মনঃকষ্টের বিষয়।
পবিত্র শহরগুলোসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র বা হাওযাসমূহে তাঁর এই শারীরিক অনুপস্থিতি এবং তাঁর দিকনির্দেশনার অভাব দীর্ঘকাল ধরে অত্যন্ত তীব্রভাবে অনুভূত হবে। শোকবার্তার শেষাংশে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতবা খামেনেয়ী এই শোকাবহ ও হৃদয়বিদারক ঘটনায় তাঁর গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন।
তিনি ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী বর্তমান যুগের মহান ও প্রতীক্ষিত নেতা হযরত ইমাম মাহদি (আ.)-এর প্রতি তাঁর আন্তরিক শোক নিবেদন করেন এবং মহান আল্লাহর কাছে তাঁর দ্রুত আবির্ভাব ত্বরান্বিত করার প্রার্থনা জানান।
পাশাপাশি, ধর্মতত্ত্ব শিক্ষার প্রাণকেন্দ্রসমূহ তথা সমস্ত হাওযার আলেমসমাজ, মরহুমের অগুনতি ছাত্র, গবেষক ও অনুরাগী এবং সর্বোপরি আলেম ও জ্ঞানী ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সমৃদ্ধ তাঁর অত্যন্ত সম্মানিত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
মহান ও সর্বোচ্চ আল্লাহর দরবারে সেই মহান ব্যক্তির মর্যাদা ও আধ্যাত্মিক অবস্থান যেন আরও বহুগুণে উন্নীত হয় এবং পরকালে তিনি যেন সর্বোচ্চ সম্মান ও নৈকট্য লাভ করেন, সেই বিনীত ও ঐকান্তিক প্রার্থনা জানিয়ে সর্বোচ্চ নেতা তাঁর এই ঐতিহাসিক শোকবার্তা সমাপ্ত করেন।