মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬
৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অধিবেশনে পেজেশকিয়ানের প্রবেশাধিকার মিললেও ভিসা পেল না ইরানি সংবাদমাধ্যম কর্মীদল

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০১:১৩ পিএম

অধিবেশনে পেজেশকিয়ানের প্রবেশাধিকার মিললেও ভিসা পেল না ইরানি সংবাদমাধ্যম কর্মীদল
ছবি: সংগৃহীত

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে যোগদানের উদ্দেশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি বা ভিসা পেয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তাঁর সফরসঙ্গী সংবাদমাধ্যম কর্মীদলের সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের প্রয়োজনীয় ভিসা প্রদান করেনি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।

 

কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে অত্যন্ত সংবেদনশীল এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষক ও সংবাদ পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রতিবছর সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে স্বাগতিক দেশ হিসেবে সব সদস্য দেশের প্রতিনিধিদের অবাধ যাতায়াত ও কূটনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও দুই দেশের মধ্যকার গভীর বৈরী সম্পর্কের ছায়া এবার গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত হেনেছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের এই আকস্মিক ও কঠোর পদক্ষেপে ক্ষোভ সৃষ্টি হলেও তেহরান তাদের কূটনৈতিক তথ্যপ্রবাহ চালু রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। প্রেসিডেন্টের সংবাদমাধ্যম দলের মহাপরিচালক হাবিবুল্লাহ আব্বাসি ইরানের আধা-সরকারি সংবাদসংস্থা মেহর নিউজকে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে, সংবাদমাধ্যম দলের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি না থাকলেও রাষ্ট্রপ্রধানের এই গুরুত্বপূর্ণ সফরের কোনো তথ্য গোপন থাকবে না।

 

তিনি অত্যন্ত আস্থার সঙ্গে বলেন, নিউইয়র্কে অবস্থানকালীন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে যেসকল গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও আনুষ্ঠানিক বৈঠকে অংশ নেবেন, তার প্রতিটি মুহূর্তের সর্বশেষ অগ্রগতি ও তাৎপর্য সম্পর্কে স্বদেশের সাধারণ মানুষকে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে নিয়মিত অবহিত রাখা হবে।

 

আন্তর্জাতিক কূটনীতির এই জটিল আবহে ইরানের রাষ্ট্রপতির সামগ্রিক সফরসূচিও বেশ সংক্ষিপ্ত ও নিয়ন্ত্রিত রাখা হয়েছে। হাবিবুল্লাহ আব্বাসি আরও জানান, রাজধানী তেহরান থেকে নিউইয়র্কে যাতায়াতের জন্য নির্ধারিত দুই দিনসহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সম্পূর্ণ সফরটি পাঁচ দিন স্থায়ী হবে।

 

গণমাধ্যম কর্মীদের প্রবেশাধিকারে নিষেধাজ্ঞা থাকায় এবং সার্বিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে সফরের বহর অত্যন্ত সীমিত করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই বৈশ্বিক সফরে প্রেসিডেন্টের সার্বক্ষণিক সঙ্গী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের চিফ অব স্টাফ মোহসিন হাজি-মির্জায়ী এবং প্রেসিডেন্সিয়াল প্রটোকল বিভাগের প্রধান সৈয়দ আব্বাস মুসৌভি।

 

অত্যন্ত পেশাদার ও দক্ষ এই শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত প্রতিনিধিদলটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বিভিন্ন শীর্ষ সম্মেলনে উপস্থিত বিশ্বনেতাদের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনার প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।

 

নিউইয়র্কে অবস্থানকালে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনে অংশ নেওয়া বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সঙ্গে একাধিক আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হবেন বলে হাবিবুল্লাহ আব্বাসি নিশ্চিত করেছেন।

 

বৈশ্বিক এই সম্মিলনে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, কূটনীতি এবং ইরানের ওপর আরোপিত নানা বিধিনিষেধের বিষয়ে তাঁর অবস্থান অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে।

 

তবে গণমাধ্যম প্রতিনিধিদলের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে ওয়াশিংটনের প্রশাসনিক মহলে যোগাযোগ করা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বা হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা মন্তব্য জানানো হয়নি।

 

স্বাগতিক দেশের এমন নীরবতা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচারের ক্ষেত্রে এক ধরণের অস্বস্তিকর পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণমাধ্যম কর্মীদের ভিসা বাতিলের এই ঘটনাটি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়, বরং দীর্ঘদিনের ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের এক প্রকাশ্য রূপ।

 

বিশেষ করে বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত মতপার্থক্যের কারণে সম্প্রতি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সমস্ত আলোচনা সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে।

 

বিশ্বের মোট সমুদ্রবাহিত খনিজ তেলের একটি বিশাল অংশ এই প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হয়, ফলে সেখানে যেকোনো ধরণের সামরিক উত্তেজনা বা মতানৈক্য গোটা আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে তীব্র অস্থিরতা তৈরি করে।

 

এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি নিয়ে উভয় দেশের অনড় অবস্থানের কারণে দুই পক্ষের মধ্যকার বিদ্যমান সংকট আরও গভীর হয়েছে। এই বৈরিতার পটভূমি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল যখন চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর প্রকাশ্য যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়।

 

সরাসরি সামরিক হামলার জবাবে তেহরানও অত্যন্ত কঠোর ও আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তারা ইসরায়েলের কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুগুলোর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোর ওপর পাল্টা সামরিক আঘাত চালায়।

 

এই ধারাবাহিক সংঘাতের ফলে গোটা মধ্যপ্রাচ্য একটি দীর্ঘস্থায়ী ও ধ্বংসাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়। সেই রক্তক্ষয়ী সামরিক সংঘাতের উত্তাপ ও মানসিক ক্ষত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখনও সুস্পষ্টভাবে বিদ্যমান।

 

এই চরম সংঘাতময় ঐতিহাসিক বাস্তবতায় জাতিসংঘের মঞ্চে ইরানের প্রেসিডেন্টের আগমন এবং বিপরীতে তাঁর সংবাদ দলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ মূলত দুই দেশের বৈরী সম্পর্কেরই বহিঃপ্রকাশ।

 

কূটনৈতিক মহলের মতে, গণমাধ্যমের মতো সংবেদনশীল পেশাদার গোষ্ঠীকে বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে প্রবেশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার ঘটনা আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতায় এক ধরণের নেতিবাচক বার্তা প্রদান করে।

 

- আনাদোলু এজেন্সি