যুক্তরাষ্ট্রের এই আকস্মিক ও কঠোর সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় অভিযোগ করা হয়েছে যে, ইরানি সাংবাদিকদের ভিসা না দেওয়ার এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও নজিরবিহীন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মূলত বিশ্ববাসীর সামনে থেকে প্রকৃত ‘সত্য গোপন করার’ এক সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবাধ তথ্যপ্রবাহের এই আধুনিক যুগে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতার সংবাদ সংগ্রহে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাধাদানের এই ঘটনা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক সমালোচনা ও গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক কূটনীতির প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘের সদর দপ্তরে প্রতি বছর সাধারণ পরিষদের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক বার্ষিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে জাতিসংঘের সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে অবস্থিত হলেও, ১৯৪৭ সালের হেডকোয়ার্টার্স এগ্রিমেন্ট বা সদর দপ্তর চুক্তি অনুযায়ী স্বাগতিক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের সকল সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বৈধ প্রতিনিধিদের অবাধ যাতায়াত এবং তাদের কূটনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে আইনত ও নৈতিকভাবে বাধ্য।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের চরম অবনতির সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে, ভিসা প্রদানের মতো একটি প্রটোকল বা আনুষ্ঠানিক বিষয়টিকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক সফরের সময় তাঁর নিজস্ব গণমাধ্যমকর্মীদের প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণ রহিত করার এই ঘটনা দুই দেশের মধ্যকার সেই দীর্ঘস্থায়ী ও বহুমাত্রিক উত্তেজনারই সর্বশেষ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর সোমবার নিজের আনুষ্ঠানিক এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক দীর্ঘ ও অত্যন্ত কড়া বার্তায় ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই মার্কিন প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করেন।
তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় অভিযোগ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন তথ্যপ্রবাহের ওপর নজিরবিহীন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার মধ্য দিয়ে নিজেদের একনায়কতান্ত্রিক মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে।
ইসমাইল বাঘেই তাঁর লিখিত বিবৃতিতে বলেন, ওয়াশিংটন শুধু তাদের নিজেদের দেশের ভেতরে থাকা যেসব স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিককে রাজনৈতিকভাবে অপছন্দ করে কেবল তাদের জন্যই যে সংবাদ সংগ্রহের দরজা চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছে তা নয়, বরং তারা এখন সেই সব বিদেশি পেশাদার সাংবাদিকদেরও আন্তর্জাতিক মঞ্চে আটকে দিচ্ছে, যাদের কণ্ঠস্বর ও লেখনী তারা যেকোনো মূল্যে নীরব করে দিতে চায়।
এর একটি অত্যন্ত প্রত্যক্ষ ও জ্বলন্ত উদাহরণ হলো ইরানের রাষ্ট্রপতির নিজস্ব যোগাযোগ ও গণমাধ্যম দলের সদস্যদের ওপর আরোপিত এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভিসা নিষেধাজ্ঞা। ইসমাইল বাঘেই তাঁর সময়োপযোগী বক্তব্যে মার্কিন প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে কেবল একটি সাধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের সাধারণ বিষয় হিসেবে দেখতে একেবারেই নারাজ।
তিনি বিষয়টির গভীরতর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তাৎপর্য তুলে ধরে বলেন, কোনো রাষ্ট্রের প্রশাসন যখন স্বাধীন সাংবাদিকতার দরজা ইচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ করে দেয়-এমনকি নিজেদের দেশের অপছন্দের সাংবাদিকদের জন্যও-এবং একইসঙ্গে বিদেশি সাংবাদিকদের, বিশেষ করে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির নিজস্ব গণমাধ্যম দলকে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে নগ্নভাবে বাধা দেয়, তখন সেটি আর নিছক কোনো ভিসা প্রক্রিয়ার জটিলতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
বরং এর মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রকৃত সত্য জানার অধিকারকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করতে চায় এবং সাধারণ মানুষের তথ্য পাওয়ার মৌলিক ও মানবাধিকারকে অত্যন্ত নির্দয়ভাবে পদদলিত করে।
তেহরানের আনুষ্ঠানিক ভাষ্যমতে, ওয়াশিংটন নিজেদের একপেশে, খণ্ডিত ও বিভ্রান্তিকর রাজনৈতিক প্রচারণাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিনা বাধায় আরও এগিয়ে নেওয়ার হীন উদ্দেশ্যেই সংবাদমাধ্যমের ওপর এই ধরনের অগণতান্ত্রিক ও চরম বৈরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাসে একসময় ‘লৌহপর্দা’ বা আয়রন কার্টেইন শব্দটি শীতল যুদ্ধের সময়কার চরম তথ্য সংকোচন, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অভাবকে বোঝাতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাঁর বিবৃতিতে সেই ঐতিহাসিক রূপকটিকে অত্যন্ত সুনিপুণ ও বুদ্ধিদীপ্তভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান আচরণের বিরুদ্ধে মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
তিনি গভীর আক্ষেপ ও শ্লেষের সুরে মন্তব্য করেন, একসময় যে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের আনাচে-কানাচে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে এবং অন্য রাষ্ট্রের তৈরি করা লৌহপর্দা ভেঙে ফেলার জন্য নিজেদের নিয়ে অত্যন্ত গর্ববোধ করত, কালের বিবর্তনে আজ সেই দেশই এখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে গায়ের জোরে অবরুদ্ধ করে নিজেদেরই তৈরি করা একটি নতুন ও দুর্ভেদ্য লৌহপর্দার আড়ালে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাঁর এই সুচিন্তিত মন্তব্যটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবাধিকার ও সংবাদমাধ্যমের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা নিয়ে প্রতিনিয়ত কথা বলা যুক্তরাষ্ট্রের চরম দ্বিমুখী নীতির প্রতি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী কূটনৈতিক চপেটাঘাত বলে মনে করছেন ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
জাতিসংঘের এই অধিবেশনে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সফরের রাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। সংস্কারপন্থি হিসেবে পরিচিত মাসুদ পেজেশকিয়ান বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে এটিই তাঁর প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সফর।
এই ঐতিহাসিক সফরের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে, বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বের রাষ্ট্রনেতাদের কাছে ইরানের নতুন ও উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, দেশের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ রূপরেখা এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা আনার ক্ষেত্রে তেহরানের ইতিবাচক অবস্থান অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরার অঙ্গীকার করেছিলেন।
ঠিক এমন একটি স্পর্শকাতর, সন্ধিক্ষণমূলক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তাঁর উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের বেশ কয়েকজন অপরিহার্য সদস্যকে ভিসা দিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার।
বাতিল হওয়া ভিসার এই দীর্ঘ তালিকায় প্রেসিডেন্টের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ কর্মকর্তা এবং গণমাধ্যম দলের শীর্ষস্থানীয় সদস্যরাও রয়েছেন, যাদের মূল দায়িত্বই ছিল নিউইয়র্কে প্রেসিডেন্টের প্রতিটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ, বিশ্বনেতাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক এবং তাঁর বৈশ্বিক বার্তার পুঙ্খানুপুঙ্খ ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ সরাসরি ইরানি জনগণের কাছে এবং সমগ্র বিশ্ববাসীর কাছে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে পৌঁছে দেওয়া।
ইরানের রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও শীর্ষ কূটনৈতিক মহল যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত এবং ট্রাম্প প্রশাসনের নজিরবিহীন বৈরী পদক্ষেপ হিসেবেই আখ্যায়িত করেছে। যদিও আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাসে অতীতেও বিভিন্ন উত্তেজনাকর সময়ে ইরানি কূটনীতিক এবং শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে ভিসা বিলম্ব বা অত্যন্ত সীমিত পরিসরে চলাচলের অনুমতি দেওয়ার মতো একাধিক ঘটনা ঘটেছে, তবে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহীর সঙ্গে থাকা পেশাদার সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই গণহারে ভিসা প্রত্যাখ্যান করার এই ঘটনা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও সনাতন নিয়মনীতির চরমতম লঙ্ঘন হিসেবেই দেখছে তেহরান।
তাদের জোরালো দাবি, জাতিসংঘের মতো একটি সর্বজনীন বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে একটি সদস্য রাষ্ট্রের কণ্ঠস্বরকে এভাবে কৃত্রিম উপায়ে রোধ করার চেষ্টা কেবল অন্যায্য ও অগ্রহণযোগ্যই নয়, বরং এটি স্বাগতিক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা ও আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রতি তাদের শ্রদ্ধাশীলতার ওপরও এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দিয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলে আসা চরম বৈরী সম্পর্ক, অব্যাহত অর্থনৈতিক অবরোধ, আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের নিরন্তর লড়াই এবং পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে চলমান টানাপোড়েনের অন্ধকার ছায়াই মূলত এই আকস্মিক ভিসা সংকটের মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন রূপে প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
নিজস্ব সাংবাদিক ও গণমাধ্যম দলের শারীরিক অনুপস্থিতি স্বত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তাঁর পূর্বনির্ধারিত কঠোর কর্মসূচি অনুযায়ী সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সাহসিকতার সঙ্গে অংশগ্রহণ করছেন এবং বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও বিশ্বনেতাদের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নানা দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হচ্ছেন।
তবে তেহরানের নিজস্ব গণমাধ্যমের লেন্সের বাইরে থেকে এই ঐতিহাসিক সফরের সংবাদ সংগ্রহের বাধ্যবাধকতা ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও জাতীয় তথ্যপ্রবাহে এক ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত শূন্যতা তৈরি করেছে।
পরিশেষে এটি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বলা যায় যে, পেশাদার সাংবাদিকদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের এই অনভিপ্রেত ঘটনা কেবল দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী টানাপোড়েনকেই নতুন মাত্রা দেয়নি, বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং একটি স্বাগতিক দেশের আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যকার চিরন্তন দ্বন্দ্বটিকেও নতুন করে সমগ্র বিশ্ববাসীর সামনে সম্পূর্ণ নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে।