বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬
৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নতুন সিরীয় ভূখণ্ড দখল করছে ইসরাইল, সিরিয়ার প্রেসিডেন্টের দাবি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:০২ পিএম

নতুন সিরীয় ভূখণ্ড দখল করছে ইসরাইল, সিরিয়ার প্রেসিডেন্টের দাবি
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংকট এবং সিরিয়া-ইসরাইল উত্তেজনার পটভূমিতে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন সিরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় অভিযোগ উত্থাপন করেছেন যে, ইসরাইল ক্রমাগত নতুন নতুন সিরীয় ভূখণ্ড দখল করে চলেছে।

 

একই সঙ্গে, উভয় দেশের মধ্যে চলমান নিরাপত্তা কাঠামোগত আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর পরও ইসরাইল তা থেকে একতরফাভাবে সরে গেছে বলে তিনি দাবি করেন। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থিত স্বনামধন্য গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিলের আয়োজনে অনুষ্ঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন।

 

তার এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যে, নতুন করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আটলান্টিক কাউন্সিলের ওই বিশেষ আলোচনা সভায় প্রেসিডেন্ট আল-শারা জানান, প্রতিবেশী দেশ ইসরাইলের সঙ্গে সিরিয়ার নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে একাধিক দফায় অত্যন্ত নিবিড় ও গভীর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

 

কূটনৈতিক ওই তৎপরতা একপর্যায়ে এতটাই সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিল যে, দুই পক্ষ সম্ভাব্য চুক্তির প্রায় নব্বই শতাংশ বিষয়ে পারস্পরিক সমঝোতায় উপনীত হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত হতাশাজনকভাবে, চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের ঠিক আগমুহূর্তে ইসরাইল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে সেই আলোচনা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়।

 

প্রেসিডেন্ট আল-শারা দাবি করেন, ইসরাইল হয়তো নতুন ও অযৌক্তিক কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, নতুবা নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি নস্যাৎ করে দিয়েছে।

 

সাবেক সিরীয় সরকারের পতনের পর থেকে দেশটিতে যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছিল, তার পুরো সুযোগ নিয়ে ইসরাইল ধারাবাহিকভাবে সিরিয়ার অভ্যন্তরে সামরিক আগ্রাসন, বিমান হামলা এবং ব্যাপক ধরপাকড় চালিয়ে যাচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

 

ইসরাইলের এই অব্যাহত আগ্রাসন এবং উসকানিমূলক পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়ে সিরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, তারা শুধু বিমান হামলাই চালাচ্ছে না, বরং অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে নতুন সিরীয় ভূখণ্ড দখল করে নিজেদের সীমানা সম্প্রসারণের অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে।

 

তবে এতসব সামরিক উসকানি এবং ভূখণ্ডগত আগ্রাসনের শিকার হওয়া সত্ত্বেও সিরিয়া এখনো পর্যন্ত অত্যন্ত সংযত আচরণ করছে এবং সংকট নিরসনে কূটনৈতিক সমাধানের পথেই হাঁটতে আগ্রহী বলে তিনি বিশ্বনেতাদের আশ্বস্ত করেন।

 

তার মতে, সিরিয়া কখনোই যুদ্ধ বা সংঘাতকে প্রথম বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করে না, বরং তারা আলাপ-আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমেই একটি টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে পৌঁছাতে চায়।

 

তবে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে এটিও স্পষ্ট করে দেন যে, সিরিয়ার আপামর জনসাধারণের সার্বিক নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং মৌলিক অধিকার পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো অবস্থাতেই ইসরাইলের সঙ্গে তথাকথিত শান্তি নিয়ে কোনো চূড়ান্ত আলোচনা বা আপস করা সম্ভব নয়।

 

ইসরাইলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে আল-শারা জানান, প্রায় এক বছর আগে দুই দেশের মধ্যে অত্যন্ত গোপনীয়তা ও সতর্কতার সঙ্গে এই সরাসরি আলোচনা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল।

 

ওই আলোচনার একেবারে প্রারম্ভিক পর্যায়ে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের পক্ষ থেকে অত্যন্ত যৌক্তিক এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি পূর্বশর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। সিরিয়ার দাবি ছিল, যেকোনো ধরনের নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বিশদ আলোচনা শুরুর আগে ইসরাইলকে অবশ্যই ১৯৭৪ সালের সেনা প্রত্যাহার চুক্তির আওতায় নির্ধারিত পূর্ববর্তী অবস্থানে নিঃশর্তভাবে ফিরে যেতে হবে।

 

সিরিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে, এই ঐতিহাসিক সীমানায় ইসরাইলের প্রত্যাবর্তনই হতে পারে আলোচনার সবচেয়ে বড় ভিত্তি। প্রেসিডেন্ট আল-শারা বিশ্বাস করেন, যদি এই প্রাথমিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তবেই ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি, সম্মানজনক এবং টেকসই শান্তি চুক্তি নিয়ে আলোচনা ফলপ্রসূ হতে পারে।

 

সিরিয়া ও ইসরাইলের মধ্যকার সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও বিরোধপূর্ণ ইস্যু গোলান মালভূমি প্রসঙ্গেও প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা তার দেশের অনড় ও আপসহীন অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।

 

তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে স্মরণ করিয়ে দেন যে, জাতিসংঘের একাধিক প্রস্তাবনা এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী গোলান মালভূমি সন্দেহাতীতভাবে সিরিয়ার একটি অবিচ্ছেদ্য সার্বভৌম ভূখণ্ড। এই ভূখণ্ডের প্রকৃত মালিকানা কার, তা নিয়ে নতুন করে কোনো ধরনের বিতর্ক বা আলোচনার ন্যূনতম কোনো সুযোগ নেই বলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন।

 

ইসরাইল প্রায়শই তাদের জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে গোলান মালভূমি এবং আশপাশের সিরীয় অঞ্চলে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি ও আগ্রাসনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে। ইসরাইলের এই তথাকথিত নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগগুলো কতটা বাস্তবসম্মত এবং কতটা কাল্পনিক, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার জন্য সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তত্ত্বাবধানে একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন।

 

তার মতে, এ ধরনের একটি নিরপেক্ষ কমিটি খুব সহজেই নির্ধারণ করতে পারবে যে, ইসরাইলের উত্থাপিত উদ্বেগগুলোর মধ্যে কোনটি তাদের প্রকৃত নিরাপত্তা হুমকি আর কোনটি স্রেফ রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য তৈরি করা মনগড়া ধারণা।

 

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক এবং বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গোলান মালভূমির ওপর ইসরাইলের সার্বভৌমত্বকে মার্কিন স্বীকৃতির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আল-শারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার হওয়া একটি অত্যন্ত কৌতুকপূর্ণ অথচ তাৎপর্যপূর্ণ কথোপকথনের স্মৃতিচারণ করেন।

 

তিনি জানান, হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে একান্ত বৈঠকের সময় তিনি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ অথচ রসিকতার ছলে তাকে প্রশ্ন করেছিলেন যে, ট্রাম্প কেন গোলান মালভূমির বদলে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি অঙ্গরাজ্যটি ইসরাইলিদের দিয়ে দিচ্ছেন না।

 

আল-শারা ট্রাম্পকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন যে, গোলান মালভূমির মালিকানা কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের নয় যে তারা চাইলেই সেটি অন্য কোনো দেশকে উপহার হিসেবে দিয়ে দিতে পারে; বরং নিউ জার্সি তাদের নিজস্ব সম্পদ, চাইলে তারা সেটি দিতেই পারে।

 

উল্লেখ্য, গত বছরের নভেম্বরে হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সিরিয়ার প্রেসিডেন্টের এই ঐতিহাসিক বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৪৬ সালে ফরাসি ম্যান্ডেট থেকে মুক্ত হয়ে সিরিয়া পূর্ণ স্বাধীনতা লাভের পর কোনো সিরীয় রাষ্ট্রপ্রধানের সেটিই ছিল প্রথম হোয়াইট হাউস সফর, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি বিশাল মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।

 

এর আগে, ২০২৫ সালের মে মাসে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদেও ট্রাম্পের সঙ্গে আল-শারার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আটলান্টিক কাউন্সিলের এই অধিবেশনে সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে দেশটিতে বিদেশি সামরিক বাহিনীর উপস্থিতির মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় নিয়েও প্রেসিডেন্ট আল-শারা খোলামেলা আলোচনা করেন।

 

দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ এবং সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযানের সময় সিরিয়ায় রাশিয়ার ব্যাপক সামরিক উপস্থিতির কথা সর্বজনবিদিত। তবে তিনি নিশ্চিত করেন যে, দেশটিতে রুশ সামরিক ঘাঁটির সংখ্যা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।

 

একসময় সিরিয়ার মাটিতে রাশিয়ার প্রায় ১৭০টির মতো সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা থাকলেও, বর্তমান পরিবর্তিত ও স্থিতিশীল পরিস্থিতিতে তা কমিয়ে মাত্র দুটিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন যে, অবশিষ্ট এই দুটি সামরিক ঘাঁটিও এখন আর সক্রিয় কোনো যুদ্ধাভিযানের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে না; বরং এগুলোকে সিরীয় জাতীয় সেনাবাহিনীর সদস্যদের আধুনিক প্রশিক্ষণ প্রদানের কেন্দ্র হিসেবে রূপান্তর করা হয়েছে।

 

অন্যদিকে, উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করা তুরস্কের সামরিক ঘাঁটিগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও তিনি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন। তার মতে, সিরীয় ভূখণ্ডে তুর্কি সামরিক উপস্থিতিকে ধীরে ধীরে একটি সুনির্দিষ্ট ও পারস্পরিকভাবে সম্মত আইনি কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসার জন্য অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

 

আলোচনা সভায় ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সংঘটিত ভয়াবহ ও মর্মান্তিক সন্ত্রাসী হামলার পঁচিশ বছর পূর্তি উপলক্ষেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের শাসনামলে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক ব্রেট ম্যাকগার্ক সিরিয়ার প্রেসিডেন্টের কাছে ওই হামলা প্রসঙ্গে একটি প্রশ্ন রাখেন।

 

এর জবাবে আল-শারা অত্যন্ত সাবলীল ও শান্ত ভঙ্গিতে জানান যে, ওই ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে তার বা তার তৎকালীন প্রজন্মের কোনো ধরনের আদর্শিক বা প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা থাকার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ, যখন যুক্তরাষ্ট্রে ওই হামলা সংঘটিত হয়েছিল, তখন তার বয়স ছিল মাত্র তেরো বছর।

 

একজন কিশোর হিসেবে ওই বৈশ্বিক ঘটনার কোনো দায় তার ওপর বর্তায় না। তবে একজন দায়িত্বশীল বিশ্বনেতা হিসেবে তিনি নাইন-ইলেভেনের হামলায় নিহত নিরপরাধ মার্কিন নাগরিকদের প্রতি গভীর শোক ও আন্তরিক সমবেদনা প্রকাশ করেন।

 

একই সঙ্গে তিনি অত্যন্ত সাহসিকতা ও স্পষ্টবাদিতার সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেন যে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে মধ্যপ্রাচ্যে তৎকালীন মার্কিন প্রশাসনের অনুসৃত আগ্রাসী নীতি ও সামরিক হস্তক্ষেপের কারণে ওই অঞ্চলের অগণিত সাধারণ মানুষ যে অবর্ণনীয় ক্ষতি ও প্রাণহানির শিকার হয়েছেন, বিশ্ববাসীর সেটিও কোনোভাবেই ভুলে যাওয়া উচিত নয়।

 

- আনাদোলু এজেন্সি