বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬
৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অন্যায়ের সামনে বিশ্ব নীরব থাকলেও তুরস্ক ফিলিস্তিনের পক্ষে লড়বে: এরদোয়ানের হুংকার

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০১:২৪ পিএম

অন্যায়ের সামনে বিশ্ব নীরব থাকলেও তুরস্ক ফিলিস্তিনের পক্ষে লড়বে: এরদোয়ানের হুংকার
ছবি: TRT Word

বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম প্রধান মঞ্চ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ফিলিস্তিন ও গাজা ইস্যুতে চরম ক্ষোভ ও দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান।

 

অন্যায়, অবিচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার দ্ব্যর্থহীন অঙ্গীকার করে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, মজলুমের পক্ষে কথা বলার কারণে যদি তাকে চরম মূল্যও চোকাতে হয়, তবুও তিনি পিছপা হবেন না। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিশ্বনেতাদের সামনে দেওয়া এক আবেগঘন ও অত্যন্ত জোরালো ভাষণে তিনি ইসরায়েলের অব্যাহত আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানান।

 

একই সঙ্গে, যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় অবিলম্বে মানবিক সহায়তা ও পুনর্গঠন কাজ শুরু করার ওপর জোর দিয়ে ইসরায়েলের ওপর সর্বাত্মক আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগের জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

 

মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির একমাত্র পথ হিসেবে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অপরিহার্যতাকেও তিনি আবারও বিশ্ববাসীর সামনে অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন। গাজা উপত্যকার বর্তমান ভয়াবহ মানবিক সংকটের কথা উল্লেখ করে তুর্কি প্রেসিডেন্ট বলেন, সেখানে আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করার মতো অবকাশ নেই।

 

তিনি বিশ্বনেতাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চোখের সামনে একটি আস্ত জনপদ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এরদোয়ান বলেন, গাজার পুনর্গঠন কাজ যত দ্রুত সম্ভব শুরু করা প্রয়োজন এবং এ বিষয়ে ইসরায়েলকে বাধ্য করতে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে আরও বেশি কার্যকর চাপ প্রয়োগ করতে হবে।

 

এই প্রসঙ্গে তিনি এক বছর আগে শারম আল-শেখে স্বাক্ষরিত চুক্তির কথা উল্লেখ করে জানান যে, তুরস্ক এখনো সেই চুক্তির শর্তাবলীর প্রতি সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, সেদিকে আঙ্কারা তীক্ষ্ণ নজর রাখছে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

 

ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে যত বাধাই আসুক না কেন, তা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হতে বাধ্য বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এরদোয়ান অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের ন্যায্য অধিকারকে শ্বাসরোধ করে চিরতরে দমিয়ে রাখার সব চেষ্টা চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হবে এবং এই চরম সত্যটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে যত দ্রুত সম্ভব অনুধাবন ও মেনে নিতে হবে।

 

ফিলিস্তিনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার কথা বলতে গিয়ে এরদোয়ান ১৯৬৭ সালের সীমানার ভিত্তিতে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ইনশাআল্লাহ, বিশ্ববাসী সেই সুন্দর ও কাঙ্ক্ষিত দিনটি দেখবে, যেদিন ১৯৬৭ সালের সীমানা অনুযায়ী পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং ভৌগোলিকভাবে অখণ্ড ফিলিস্তিন রাষ্ট্র পৃথিবীর মানচিত্রে সগৌরবে আত্মপ্রকাশ করবে।

 

ভাষণের এক পর্যায়ে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের অনুপস্থিতি নিয়ে তিনি গভীর আক্ষেপ ও হতাশা প্রকাশ করেন। টানা দুই বছর ধরে ফিলিস্তিনি নেতা জাতিসংঘের এই গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে অংশ নিতে না পারার বিষয়টিকে তিনি একটি ঐতিহাসিক অবিচার হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

 

এরদোয়ান বলেন, ফিলিস্তিনি ভাই-বোনদের প্রতি এই অবিচার বিশ্ববিবেককে প্রতিনিয়ত পীড়িত করে। তবে আব্বাসের অনুপস্থিতিতেও তুরস্ক যে ফিলিস্তিনিদের নিঃসঙ্গ ছেড়ে দেবে না, সে কথাও তিনি জোরালোভাবে স্মরণ করিয়ে দেন।

 

এরদোয়ান ঘোষণা করেন, আব্বাস নিজে এই কক্ষে উপস্থিত হতে না পারলেও, বিগত বছরগুলোর মতো এবারও তুরস্ক স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অধিকার আদায়ের অকৃত্রিম কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে যাবে।

 

এর পাশাপাশি, বিশ্বের যেসব রাষ্ট্র এখনো ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি, তাদের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য তিনি উদাত্ত আহ্বান জানান।

 

গাজা উপত্যকায় সাধারণ নাগরিকদের ওপর বয়ে যাওয়া অবর্ণনীয় মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে এরদোয়ানের কণ্ঠে গভীর বেদনা ও ক্ষোভ ঝরে পড়ে। তিনি গাজাকে বর্তমান বিশ্বের শিশুদের সবচেয়ে বড় কবরস্থান হিসেবে বর্ণনা করেন, যা গোটা মানব সভ্যতার জন্য এক চরম লজ্জাজনক অধ্যায়।

 

এরদোয়ানের দেওয়া তথ্যমতে, সেখানে শিশুদের অঙ্গহানির হার বর্তমান বিশ্বের যেকোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের তুলনায় সবচেয়ে বেশি। গত তিন বছরে ইসরায়েলি বাহিনীর নিরবচ্ছিন্ন হামলায় গাজায় অন্তত ৭৪ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের সিংহভাগই নিরীহ নারী ও শিশু।

 

ইসরায়েলের এই নির্বিচার হত্যাযজ্ঞকে তিনি সরাসরি ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বিশ্বনেতাদের সামনে গাজার একটি মর্মান্তিক চিত্র তুলে ধরেন, যেখানে ফিলিস্তিনিরা এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে নিজেদের প্রিয়জনদের খুঁজছেন এবং প্রতিনিয়ত স্বামী, স্ত্রী, সন্তান ও মা-বাবার ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করছেন।

 

ইসরায়েলি হামলায় নিজেদের হাত-পা হারানো ফিলিস্তিনি শিশুরা কাঠের তৈরি কৃত্রিম অঙ্গ ব্যবহার করে আবার স্কুলে ফেরার এবং জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসার যে অদম্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তা বিশ্ববিবেকের কাছে এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন তিনি।

 

গাজার চিকিৎসা ব্যবস্থার সম্পূর্ণ ধসে পড়ার চিত্রটিও এরদোয়ানের ভাষণে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। তিনি জানান, তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে গাজার হাসপাতালগুলোর অন্তত ৭০ শতাংশের বেশি জেনারেটর বর্তমানে সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে আছে।

 

এর ফলে জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মুমূর্ষু রোগী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন। অবরুদ্ধ এই উপত্যকাকে তিনি আমাদের সময়ের সবচেয়ে অমানবিক ও লজ্জাজনক ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’ বা বন্দিশিবির হিসেবে বর্ণনা করেন।

 

এরপর তিনি যুদ্ধবিরতি এবং রাজনৈতিক সমাধানের ব্যর্থতার দিকটি তুলে ধরেন। এরদোয়ান জানান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগ এবং তুরস্কসহ অন্যান্য মিত্র দেশগুলোর নিবিড় সহযোগিতায় ২০২৫ সালের অক্টোবরে গাজায় একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও, তার পর থেকে এখন পর্যন্ত সেখানে এক হাজার ৫০০-এর বেশি ফিলিস্তিনিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।

 

তিনি স্পষ্ট করেন যে, ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন শান্তি প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় ধাপে যেতে এবং আপস করতে সম্মত হলেও, ইসরায়েলের বর্তমান কট্টরপন্থি সরকার কোনোভাবেই ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড থেকে তাদের অবৈধ দখলদারিত্বের অবসান ঘটাতে রাজি হচ্ছে না, যা মধ্যপ্রাচ্যের শান্তির পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়।

 

জাতিসংঘের বর্তমান কার্যকারিতা ও প্রাসঙ্গিকতা নিয়েও চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট। বিশ্বব্যাপী শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার মহান উদ্দেশ্য নিয়ে ৮১ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এই বৈশ্বিক সংস্থাটি যে বর্তমানে চরমভাবে ব্যর্থ এবং তার মৌলিক দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ অক্ষম হয়ে পড়েছে, তা তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ব্যক্ত করেন।

 

এরদোয়ানের মতে, বিশ্বের বর্তমান সংঘাতময় ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিই জাতিসংঘের এই কাঠামোগত দুর্বলতা ও অক্ষমতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তিনি জাতিসংঘের ব্যাপক সংস্কারের জোর দাবি জানিয়ে বলেন, এই বিশ্ব সংস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কেবল তখনই ফিরে আসবে, যখন গাজার শিশুরা নির্ভয়ে ও নিরাপদে তাদের নিজ বাসভূমিতে বসবাস করতে পারবে।

 

ফিলিস্তিনি শিশুরা যখন যুদ্ধবিমান ও প্রাণঘাতী ড্রোনের বদলে আকাশের দিকে তাকিয়ে স্বাধীনভাবে ঘুড়ি উড়তে দেখবে, লেবাননের শিশুরা যখন বোমার বিকট শব্দে আতঙ্কিত হয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠবে না, যখন বিশ্বব্যাপী শ্রমিকদের ওপর সকল প্রকার শোষণের অবসান ঘটবে এবং আফ্রিকার নিপীড়িত মানুষ যখন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে পারবে, কেবল তখনই জাতিসংঘের প্রকৃত সার্থকতা প্রমাণিত হবে।

 

ভাষণের শেষ পর্যায়ে এরদোয়ান চরম আত্মবিশ্বাস ও ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তার সঙ্গে তার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি স্বীকার করেন যে, তার এই স্পষ্টবাদিতা ও সত্য কথন বিশ্বমঞ্চে অনেকের জন্য অস্বস্তির কারণ হতে পারে, তবে তা সত্ত্বেও তুরস্ক কখনোই অন্যায়ের শিকার মজলুম মানুষের পক্ষে কথা বলা থেকে বিরত থাকবে না।

 

ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার বার্তা দিতে গিয়ে তিনি প্রয়াত প্রখ্যাত তুর্কি কবি সেজাই কারাকোচের একটি অমর কবিতার পঙ্‌ক্তি উদ্ধৃত করেন। তিনি বলেন, মানুষ ভয়ে বা স্বার্থের কারণে নীরব থাকতে পারে, কিন্তু ‘ইতিহাস কখনো নীরব থাকবে না’ এবং ‘সত্যও কখনো নীরব থাকবে না।’

 

সবশেষে তিনি তার অটল সংকল্পের কথা বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দেন এই বলে যে, ন্যায়ের পথে চলতে গিয়ে প্রয়োজনে তুরস্ক যেকোনো ধরনের কষ্ট হাসিমুখে সহ্য করবে এবং এর জন্য যেকোনো সর্বোচ্চ মূল্য চোকাতেও তারা প্রস্তুত। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই অন্যায়ের সামনে তারা মাথা নত করবে না, নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে না এবং কোনো ধরনের আগ্রাসন বা নিপীড়নকে কখনো মুখ বুজে মেনে নেবে না।

 

টিআরটি ওয়ার্ল্ড