বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬
৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জ্ঞান ও নৈতিকতার সমন্বয়ে আধিপত্যবাদী আগ্রাসন রুখে দেওয়ার আহ্বান মোজতবা খামেনির

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:২৫ পিএম

জ্ঞান ও নৈতিকতার সমন্বয়ে আধিপত্যবাদী আগ্রাসন রুখে দেওয়ার আহ্বান মোজতবা খামেনির
ছবি : Collected

আধুনিক বিশ্বের জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে একটি জাতির টিকে থাকার প্রধান হাতিয়ার হলো তার নিজস্ব শেকড়, নৈতিকতা এবং জ্ঞান। নতুন শিক্ষাবর্ষের সূচনালগ্নে দেশি-বিদেশি নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন প্রজন্মকে প্রস্তুত করার লক্ষ্যে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও দিকনির্দেশনামূলক বার্তা প্রদান করেছেন ইরানের ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতাবা হোসেইনি খামেনেয়ী।

 

দেশব্যাপী অগণিত শিক্ষার্থী এবং শিক্ষাবিদদের উদ্দেশে দেওয়া এই বিশেষ বার্তায় তিনি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, কেবল পুঁথিগত বিদ্যা অর্জনই আধুনিক শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না। বরং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি শিক্ষার্থীকে উন্নত নৈতিকতা, তাকওয়া বা আধ্যাত্মিক পবিত্রতা এবং যুগোপযোগী দক্ষতা অর্জনের প্রতি সর্বোচ্চ মনোনিবেশ করতে হবে।

 

একই সঙ্গে তিনি ইরানের সমৃদ্ধ জাতীয় পরিচয়, সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা ও স্বাধীনতা, প্রাণের মাতৃভাষা এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পবিত্র পতাকাসহ রাষ্ট্রের সমস্ত জাতীয় প্রতীকের অতন্দ্র প্রহরী ও রক্ষক হিসেবে তরুণ সমাজকে দায়িত্ব পালনের উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে এই বার্তাকে কেবল একটি প্রথাগত শিক্ষাবর্ষের উদ্বোধন নয়, বরং একটি আদর্শিক রূপরেখা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের চারিত্রিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের ওপর বিশেষ জোর দিয়ে ইসলামী বিপ্লবের এই শীর্ষ নেতা তাঁর বার্তায় বলেন, বর্তমান যুগে টিকে থাকতে হলে জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চার পাশাপাশি প্রতিটি শিক্ষার্থীর ভেতরে আশা, সুদৃঢ় চরিত্র, বাস্তবমুখী দক্ষতা এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।

 

একটি জাতির তরুণ সমাজ যদি তাদের নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হয়, তবে সেই জাতি খুব সহজেই বিদেশি শক্তির দ্বারা প্রভাবিত ও পথভ্রষ্ট হতে পারে। এই চরম সত্যটিকে সামনে রেখে তিনি বিশেষভাবে জোর দিয়ে বলেন, প্রতিটি শিক্ষার্থীকে তাদের জাতীয় পরিচয়ের সুগভীর শেকড় সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।

 

সাংস্কৃতিক মর্যাদা এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা কোনোভাবেই বিসর্জন দেওয়া যাবে না। মাতৃভাষার চর্চা ও বিকাশকে নিজেদের অস্তিত্বের অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। সর্বপরি, মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক ইসলামী প্রজাতন্ত্রের জাতীয় পতাকা এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতীকের প্রতি শিক্ষার্থীদের সর্বদা দায়িত্বশীল, শ্রদ্ধাশীল ও নিবেদিতপ্রাণ থাকতে হবে।

 

তাঁর মতে, এই মূল্যবোধগুলোই একটি স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল জাতির মূল ভিত্তি। নতুন প্রজন্মের উদ্দেশে দেওয়া এই বার্তায় আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতাবা হোসেইনি খামেনেয়ী কেবল অভ্যন্তরীণ শিক্ষা ও সংস্কৃতির কথাই বলেননি, বরং অত্যন্ত সুনিপুণভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপট এবং বিশ্বজুড়ে চলমান সংঘাতময় পরিস্থিতিকেও তুলে ধরেছেন।

 

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান অস্থিরতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থাকে ‘আধিপত্যবাদী ব্যবস্থার বর্বরতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলি শাসনব্যবস্থার আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করেন, যা সমগ্র বিশ্বের শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

 

তাঁর মতে, এই ধরনের আধিপত্যবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর ধ্বংসাত্মক নীতি এবং অমানবিক কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলকে দিন দিন আরও কঠিন, জটিল ও বিপজ্জনক করে তুলছে। এমন একটি বৈরী বিশ্ব পরিস্থিতিতে কোনো দেশ বা জাতি যদি কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে, তবে তাদের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা সম্ভব নয়।

 

তাই তিনি শিক্ষাকেই প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করছেন। আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এই প্রতিরোধের স্বরূপ কেমন হবে, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সর্বোচ্চ নেতা একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও রূপক উপমা ব্যবহার করেছেন।

 

তিনি বলেন, আগ্রাসী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য কেবল আবেগ বা স্লোগানই যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন জ্ঞান, তাকওয়া এবং নৈতিকতার এক অপূর্ব সমন্বয়। যখন আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জ্ঞানের সঙ্গে স্রষ্টার প্রতি আনুগত্য (তাকওয়া) এবং উন্নত মানবিক নৈতিকতার সংমিশ্রণ ঘটে, তখন তা একটি অজেয় শক্তিতে পরিণত হয়।

 

এই ত্রিমাত্রিক শক্তি মানবতার বিরুদ্ধে পরিচালিত যেকোনো ধরনের আগ্রাসন, অন্যায় ও অবিচার প্রতিহত করার ক্ষেত্রে একটি দুর্ভেদ্য ‘ইস্পাতের ঢাল’ এবং শত্রুর ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করার জন্য একটি ‘ধারালো তরবারি’র মতো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।

 

অর্থাৎ, তিনি তরুণ প্রজন্মকে এমনভাবে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যেখানে তারা একদিকে যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, অন্যদিকে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দিক থেকেও তারা হবে ইস্পাতকঠিন।

 

দেশপ্রেম এবং আত্মত্যাগের মহান আদর্শকে তরুণদের হৃদয়ে জাগ্রত করার লক্ষ্যে তিনি অতীতের গৌরবময় ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। আজকের শিক্ষার্থীরা যে সুরক্ষিত এবং স্বাধীন পরিবেশে শ্রেণিকক্ষে বসে বিদ্যা অর্জন করছে, এই পরিবেশ একদিনে বা সহজে তৈরি হয়নি।

 

তিনি অত্যন্ত আবেগের সঙ্গে স্মরণ করেন যে, আজকের এই আধুনিক শ্রেণিকক্ষগুলোতে একসময় এমন সব প্রজন্ম বসেছিল, যারা মাতৃভূমির ডাকে সাড়া দিয়ে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করেনি। সেই পূর্বসূরিদের অনেকেই আজ দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং জাতীয় মর্যাদা রক্ষার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন।

 

আবার অনেকেই দেশমাতৃকার সুরক্ষায় নিজেদের প্রাণ বিলিয়ে দিয়ে অমরত্ব লাভ করেছেন। অতীতের সেই আত্মত্যাগী, নির্ভীক এবং দেশপ্রেমিক ব্যক্তিরাই বর্তমান ও ভবিষ্যতের নতুন প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় আদর্শ এবং পথপ্রদর্শক।

 

তাদের জীবনদর্শন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেই আজকের শিক্ষার্থীদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। পরিশেষে, এই বার্তার মধ্য দিয়ে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কেবল চাকরিজীবী বা পেশাদার কর্মী তৈরির কারখানা নয়; বরং এগুলো হলো আদর্শ মানুষ, দেশপ্রেমিক নাগরিক এবং মানবতার রক্ষক গড়ার পবিত্র স্থান।

 

শিক্ষকদের প্রতিও এখানে এক পরোক্ষ কিন্তু সুনির্দিষ্ট বার্তা রয়েছে। তাদের দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীদের মেধা ও মননের এমনভাবে বিকাশ ঘটানো, যাতে তারা নিজেদের শিকড়কে ভুলে না গিয়েও বিশ্বমানের জ্ঞান অর্জন করতে পারে। একটি সুস্থ, শক্তিশালী ও স্বাধীন জাতি গঠনে জ্ঞান, নৈতিকতা এবং দেশপ্রেমের কোনো বিকল্প নেই।

 

বৈশ্বিক আধিপত্যবাদ ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের এই যুগে নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে মাথা উঁচু করে বাঁচার যে রূপরেখা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতাবা হোসেইনি খামেনেয়ী প্রদান করেছেন, তা কেবল একটি দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা সারা বিশ্বের স্বাধীনতাকামী এবং আধিপত্যবাদবিরোধী প্রতিটি মানুষের জন্যই একটি প্রাসঙ্গিক ও সময়োপযোগী বার্তা।

 

- পার্সটুডে