বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬
৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চুক্তি না হলে ইরানকে চরম ধ্বংসের মুখোমুখি হতে হবে - জাতিসংঘে ট্রাম্প

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:৪৬ পিএম

চুক্তি না হলে ইরানকে চরম ধ্বংসের মুখোমুখি হতে হবে - জাতিসংঘে ট্রাম্প
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক মিলনমেলা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম বার্ষিক অধিবেশনে বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে এক নজিরবিহীন ও চরম আক্রমণাত্মক সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

 

মঙ্গলবার সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কের উদ্বোধনী দিনে বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সতর্ক করে দেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও তীব্র সংঘাতের স্থায়ী অবসানের লক্ষ্যে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যদি তেহরান কোনো কার্যকর ও সম্মানজনক কূটনৈতিক চুক্তিতে উপনীত হতে ব্যর্থ হয়, তবে দেশটিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়ার মতো চরম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হতে পারে।

 

বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের শীর্ষ রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকদের উপস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই অভাবনীয় ও কঠোর বক্তব্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তীব্র আলোড়ন ও গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

 

বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বিশ্বের একক পরাশক্তির শীর্ষ নেতার এমন প্রকাশ্য হুমকি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিকে নতুন করে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

 

উদ্বোধনী বিতর্কে নিজের দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক ভাষণে ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ও আক্রমণাত্মক ভাষায় ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন। তিনি উপস্থিত বিশ্বনেতাদের সামনে তেহরানের অনমনীয় নীতি ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রসঙ্গ টেনে এক তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

 

তিনি অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে মন্তব্য করেন যে, তারা কি বাধ্য করবে এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে যার পরিণতি হবে সর্বগ্রাসী ধ্বংসযজ্ঞ। ট্রাম্পের ভাষায়, ওয়াশিংটন কি তাদের এমন এক নরক বা বিপর্যয়ের অতল গহ্বরে ঠেলে দেবে, যেখান থেকে তাদের স্বাভাবিক জীবনে বেঁচে ফেরার কোনো পথ খোলা থাকবে না এবং তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও সমৃদ্ধির কোনো আশা বা সম্ভাবনা অবশিষ্ট থাকবে না।

 

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রথাগত সংযত ভাষার বাইরে গিয়ে এমন চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ সাম্প্রতিক ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল একটি ঘটনা। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য মূলত ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর সর্বোচ্চ মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির একটি প্রকাশ্য প্রয়াস হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে, যা সংঘাতপূর্ণ এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ গতিপথকে চরমভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

 

চরম সামরিক ধ্বংসের এমন ভীতি প্রদর্শন করলেও, একই বক্তব্যের অন্য প্রান্তে ডোনাল্ড ট্রাম্প কূটনীতির একটি সম্ভাব্য সময়সীমা ও পথরেখার দিকেও স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত প্রদান করেছেন। তিনি গভীর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেন যে, ইরান হয়তো এই মুহূর্তে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি কোনো বড় ধরনের চুক্তিতে যেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করছে, তবে এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্টের মূল্যায়ন অনুযায়ী, আগামী ৩ নভেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই অভ্যন্তরীণ নির্বাচনের পরেই মূলত ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার চূড়ান্ত কূটনৈতিক আলোচনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে এবং উভয় পক্ষ একটি বাস্তবসম্মত চুক্তিতে পৌঁছাতে সক্ষম হবে।

 

ট্রাম্পের দৃঢ় বিশ্বাস, এই নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরপরই দুই দেশের মধ্যে একটি ফলপ্রসূ চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। তাঁর মতে, কোনো ধরনের কূটনৈতিক চুক্তিতে না যাওয়া ইরানের নিজেদের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না।

 

তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে উল্লেখ করেন যে, তেহরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী মূলত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছে এবং আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেয়, তা পর্যবেক্ষণ করার পরেই তারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

 

এই তীব্র বাকযুদ্ধ ও রাজনৈতিক উত্তেজনার একটি সুগভীর ও রক্তক্ষয়ী ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের পূর্ববর্তী তথ্যাদি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, চলতি বছরের গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার দীর্ঘদিনের কৌশলগত মিত্র ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় এক নজিরবিহীন যৌথ বিমান হামলা পরিচালনা করেছিল।

 

সেই ভয়াবহ সামরিক পদক্ষেপের পরপরই দুই পক্ষের মধ্যে এক সর্বাত্মক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়, যা একটানা প্রায় চল্লিশ দিন ধরে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে প্রকম্পিত করে রেখেছিল। ওই তীব্র সংঘাতের ফলে লোহিত সাগর থেকে শুরু করে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল চরমভাবে বিঘ্নিত হয় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সরবরাহ শৃঙ্খল এক মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছিল।

 

পরবর্তীতে জাতিসংঘের মধ্যস্থতা ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতার মুখে একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও, বাস্তবে সেই যুদ্ধবিরতি কখনই শতভাগ কার্যকর ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।

 

বরং উভয় দেশের সামরিক বাহিনী একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে, যার পটভূমিতে ট্রাম্পের এই সাম্প্রতিক হুমকি নতুন কোনো যুদ্ধেরই পূর্বাভাস দিচ্ছে। জাতিসংঘের এই ঐতিহাসিক ভাষণে ডোনাল্ড ট্রাম্প কেবল মধ্যপ্রাচ্য এবং ইরানের সংকটের মধ্যেই নিজের বক্তব্যকে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং তিনি বৈশ্বিক নিরাপত্তার আরেক প্রধান উদ্বেগ ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যকার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ অবসানের বিষয়েও এক অভাবনীয় ও অত্যন্ত ইতিবাচক আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

 

পূর্ব ইউরোপের রণাঙ্গনে মস্কোর সামরিক আগ্রাসন বন্ধে এবং সেখানে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা চুক্তি অতিদ্রুত সম্ভব বলে তিনি বিশ্বনেতাদের আশ্বস্ত করেন। ট্রাম্প অত্যন্ত প্রত্যয়ের সঙ্গে প্রকাশ করেন যে, তাঁর প্রশাসন বর্তমানে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে রাশিয়া ও ইউক্রেন-উভয় দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে কাজ করে যাচ্ছে।

 

মস্কো ও কিয়েভের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী ও আপাতদৃষ্টিতে জটিল এই সংকটের একটি গ্রহণযোগ্য ও বাস্তবসম্মত সুরাহা তারা খুব দ্রুতই নিশ্চিত করবেন। ট্রাম্প অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেন যে, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষ সমস্যাটির সমাধান নিয়ে যতটা সময় লাগবে বলে ধারণা করছেন, এটি বাস্তবে তার চেয়েও অনেক বেশি দ্রুতগতিতে ঘটতে যাচ্ছে।

 

ইউক্রেন সংঘাত নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই আশাবাদী বক্তব্য সাধারণ পরিষদে উপস্থিত ইউরোপীয় নেতাদের পাশাপাশি বৈশ্বিক কূটনীতিকদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। কারণ গত কয়েক বছর ধরে চলমান এই যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত করেছে এবং পূর্ব ও পশ্চিমের পরাশক্তিগুলোর মধ্যে এক নতুন শীতল যুদ্ধের ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

 

ট্রাম্পের বক্তব্যে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, তিনি একদিকে যেমন ইরানের মতো রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে চরম শক্তি প্রয়োগের ভাষা ব্যবহার করছেন, অন্যদিকে ইউরোপীয় সংঘাত নিরসনে নিজেকে একজন দক্ষ ও কার্যকর মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন।

 

তাঁর প্রশাসনের কূটনৈতিক কৌশল একদিকে পেশিশক্তির প্রদর্শন এবং অন্যদিকে দ্রুতগতির রফা করার এক অনন্য মিশ্রণ হিসেবেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে দৃশ্যমান হচ্ছে। এই দ্বিবিধ কৌশল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিকে আরও বেশি আক্রমণাত্মক অথচ ফলমুখী করার একটি সুনির্দিষ্ট প্রয়াস।

 

এদিকে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের মূল বিতর্ক পর্বটি এমন এক বৈশ্বিক আবহে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন সংস্থাটির বিদায়ী মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস তাঁর উদ্বোধনী ভাষণে বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ বন্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং বহুপাক্ষিক সংলাপের মাধ্যমে স্থায়ী বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছিলেন।

 

কিন্তু মহাসচিবের সেই শান্তিবাদী আহ্বানের ঠিক পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই অনমনীয় ও ধ্বংসাত্মক হুমকির বক্তব্য জাতিসংঘের মূল চেতনার সঙ্গে এক ধরনের বিপরীতমুখী বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে তুলেছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘের মতো একটি সর্বজনীন শান্তি সংস্থার মঞ্চে দাঁড়িয়ে কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রকে মানচিত্র থেকে মুছে দেওয়ার বা চরম ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়ার মতো বক্তব্য বৈশ্বিক কূটনীতির চিরায়ত শিষ্টাচারের পরিপন্থী।

 

তবে একই সঙ্গে এটি বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের অটল সংকল্প ও ভূরাজনৈতিক অগ্রাধিকারের একটি অত্যন্ত পরিষ্কার ও জোরালো বহিঃপ্রকাশ। চূড়ান্ত বিশ্লেষণে এটি নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রদত্ত এই সুদূরপ্রসারী বক্তব্য আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক নতুন আলোড়ন ও গভীর সংকটের জন্ম দেবে।

 

একদিকে পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক আধিপত্য নিয়ে তেহরানের দীর্ঘদিনের অনড় অবস্থান, অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চরম ধ্বংসের হুমকি এবং আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ-এই সব মিলিয়ে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এক অত্যন্ত নাজুক ও বিস্ফোরক মোড়ে এসে উপনীত হয়েছে।

 

বিশ্ববাসী এখন গভীর উদ্বেগের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করছে যে, আগামী ৩ নভেম্বরের মার্কিন নির্বাচনের পর আন্তর্জাতিক কূটনীতি কি সত্যিই কোনো সমঝোতা ও শান্তির পথে এগোবে, নাকি ট্রাম্পের উচ্চারিত সেই ধ্বংসাত্মক সংঘাতের পথ ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের বুকে নেমে আসবে আরেক প্রলয়ঙ্করী মানবিক বিপর্যয়।

 

- এএফপি, রয়টার্স