বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬
৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরান সংকট ও নৌপথের অস্থিরতা মোকাবিলায় ট্রাম্পের নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:২২ পিএম

ইরান সংকট ও নৌপথের অস্থিরতা মোকাবিলায় ট্রাম্পের নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সামরিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপথে বিদ্যমান সংঘাতময় পরিস্থিতি নিরসনে একটি সুদূরপ্রসারী ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশল উপস্থাপন করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

 

বিশ্বের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক জলপথগুলোতে ধারাবাহিক বাধা সৃষ্টি এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার জবাবে একটি বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক সংযোগ করিডোর গড়ে তোলাই এই সংকটের সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই সমাধান হতে পারে বলে তিনি দাবি করেছেন।

 

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনের অবকাশে পারস্য উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের বহুপাক্ষিক বৈঠকে ভাষণ দেওয়ার সময় তিনি এই পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।

 

সেখানে তিনি ‘ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোর’ বা ‘আইএমইইসি’ প্রকল্পের প্রতি ওয়াশিংটনের অবিচল ও অত্যন্ত শক্তিশালী সমর্থনের কথা আবারও স্পষ্টভাবে পুনর্ব্যক্ত করেন। ট্রাম্পের মতে, কেবল সামরিক পদক্ষেপের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বিকল্প বাণিজ্যিক অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমেই মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান নিরাপত্তা সংকটের একটি স্থায়ী অর্থনৈতিক সমাধান নিশ্চিত করা সম্ভব।

 

উপসাগরীয় নেতাদের সামনে দেওয়া ওই গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের ধারাবাহিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি ও হামলার প্রসঙ্গটি বিশদভাবে তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল সামুদ্রিক পথগুলোতে তেহরানের নেতিবাচক সামরিক তৎপরতা ও আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক অবাধ বাণিজ্যের ওপর যে গভীর ঝুঁকি তৈরি করেছে, তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

এই বাস্তবতার আলোকে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ও পণ্য সরবরাহব্যবস্থাকে একটি নিরাপদ ও সুসংহত বিকল্প পথে ঘুরিয়ে দেওয়ার জরুরি প্রয়োজনীয়তা এখন অনস্বীকার্য। ট্রাম্পের অভিমত হলো, তেহরানের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণাধীন কিংবা তাদের প্রভাববলয়ে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ সামুদ্রিক চেকপয়েন্ট ও সংকীর্ণ প্রণালীগুলোকে পুরোপুরি এড়িয়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক পণ্য পৌঁছে দিতে এই করিডোর একটি যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে।

 

তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় প্রতিশ্রুতি দেন যে, পাইপলাইন কিংবা যেকোনো কার্যকর বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থার সাহায্যে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে তার প্রশাসন এই বৃহৎ বহুমাত্রিক উদ্যোগে সম্পূর্ণ অংশীদারিত্ব বজায় রাখবে।

 

প্রস্তাবিত এই আন্তর্জাতিক করিডোরটি হঠাৎ কোনো বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, বরং ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লিতে অনুষ্ঠিত জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনের ঐতিহাসিক মঞ্চেই এর আনুষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল।

 

সেই সম্মেলনে ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যকার একটি যৌথ সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে এই অর্থনৈতিক করিডোর প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক গোড়াপত্তন ঘটে।

 

মূলত দক্ষিণ এশিয়া, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল এবং ইউরোপ মহাদেশের মধ্যে একটি নিরবচ্ছিন্ন সরাসরি সংযোগ স্থাপন করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। সম্পূর্ণ পরিকল্পনাটিকে অত্যন্ত দূরদর্শী চিন্তাভাবনার মাধ্যমে দুটি প্রধান রুটে ভাগ করা হয়েছে।

 

এর মধ্যে পূর্ব রুটটি ভারতকে সরাসরি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বন্দরগুলোর সঙ্গে যুক্ত করবে এবং উত্তর রুটটি উপসাগরীয় বাণিজ্য কেন্দ্রগুলোকে সংযুক্ত করবে ইউরোপের উন্নত বাজারগুলোর সঙ্গে। এর ফলে এই তিন অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যকার সামগ্রিক বাণিজ্যিক গতিশীলতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।

 

পরিকল্পিত এই করিডোরের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থার সমন্বয়ে গড়ে তোলার সুস্পষ্ট রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আওতায় থাকবে সমন্বিত ও শক্তিশালী রেলপথ নেটওয়ার্ক, উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন নতুন সমুদ্র পরিবহন ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মানের বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো, উচ্চগতির ডিজিটাল সংযোগ ক্যাবল এবং পরিবেশবান্ধব গ্রিন হাইড্রোজেন পরিবহনের জন্য বিশেষায়িত পাইপলাইন।

 

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রকল্প পুরোপুরি কার্যকর হলে ভারত ও ইউরোপের মধ্যবর্তী পণ্য পরিবহনের সময় অর্ধেকেরও বেশি কমে যাবে, যা বিশ্ববাণিজ্যের সামগ্রিক খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনবে।

 

একই সঙ্গে বৈশ্বিক কূটনীতির ক্ষেত্রে এটি চীনের বহুল আলোচিত ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা বিআরআই প্রকল্পের বিপরীতে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী, নির্ভরযোগ্য এবং নিয়মতান্ত্রিক ভূ-রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে।

 

অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত কৌশলের বিশদ বর্ণনার পাশাপাশি বক্তব্যের একপর্যায়ে ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের উদ্দেশে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি দাবি করেন, বিভিন্ন কঠোর নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তেহরানকে ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক অর্থনীতি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে।

 

ট্রাম্প চরম সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, ইরান যদি কালবিলম্ব না করে দ্রুত সঠিক ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে, তবে নিকট ভবিষ্যতে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে যখন কোনো সমঝোতার সুযোগ আর অবশিষ্ট থাকবে না।

 

তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন যে, এমন পরিস্থিতিতে একটি রাষ্ট্র বা জাতি হিসেবে তাদের টিকে থাকার পথও চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যেতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন খোলামেলা ও তীব্র সতর্কবার্তা মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক মহলে এক গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

 

সামরিক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান তুলে ধরতে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট গত বছর পরিচালিত মার্কিন বিশেষ সামরিক অভিযান ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এর ফলাফল বিশ্বমঞ্চে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেন।

 

তিনি দাবি করেন, অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও মারাত্মক সেই সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচিকে ইতোমধ্যে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা সম্ভব হয়েছে। ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই অভিযানের ফলে ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এর মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে যে অঞ্চলটিতে সামরিক ভারসাম্য বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো কঠিন পদক্ষেপ নিতে পিছপা হবে না।

 

তিনি মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের পুনরায় আশ্বস্ত করে জানান, ওয়াশিংটন কেবল অর্থনৈতিক করিডোরের সুরক্ষাই দেবে না, বরং যেকোনো আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে কৌশলগত প্রতিরোধ বজায় রাখতে সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে।

 

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘ অধিবেশনের অবকাশে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে এক নতুন মেরুকরণের স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। একদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক রুট ও জ্বালানি সরবরাহ থেকে ইরানকে কৌশলে অপ্রাসঙ্গিক করার জন্য আইএমইইসি করিডোরকে ত্বরান্বিত করার প্রয়াস, অন্যদিকে সরাসরি অর্থনৈতিক অবরোধ ও সামরিক শক্তির ভয় দেখিয়ে তেহরানকে কোণঠাসা করাই এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য।

 

উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই বহুমুখী অংশীদারিত্ব আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক স্থায়িত্বকে কতটা সুরক্ষা দিতে পারবে, তা মূলত নির্ভর করবে প্রস্তাবিত এই মেগা প্রকল্পের দ্রুত ও সুশৃঙ্খল বাস্তবায়নের ওপর। তবে সন্দেহাতীতভাবেই এই ঘোষণা বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক নতুন কূটনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

 

- এনডিটিভি