বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬
৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সন্ত্রাসী বলছে, অথচ আমরাই সন্ত্রাসের চরম শিকার’: ইরানের প্রেসিডেন্টে

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:৫৭ পিএম

‘যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সন্ত্রাসী বলছে, অথচ আমরাই সন্ত্রাসের চরম শিকার’: ইরানের প্রেসিডেন্টে
ছবি : Collected

বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু এবং বৈশ্বিক কূটনীতির সর্বোচ্চ মঞ্চ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।

 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানকে ‘সন্ত্রাসী’ রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করে যে উসকানিমূলক মন্তব্য করেছিলেন, তার সরাসরি ও অত্যন্ত কড়া জবাব দিয়েছেন ইরানি প্রেসিডেন্ট।

 

বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে তিনি অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, ইরানকে যারা সন্ত্রাসী হিসেবে চিত্রিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে, বাস্তবতা হলো তাদের দ্বারাই ইরান সবচেয়ে বেশি সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে।

 

বুধবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে দেওয়া তাঁর ভাষণটি ছিল আবেগ, ক্ষোভ এবং তথ্যপ্রমাণের এক অনন্য সংমিশ্রণ, যা উপস্থিত বিশ্বনেতাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে।

 

অধিবেশনকক্ষে যখন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বক্তব্য দেওয়ার জন্য মঞ্চে আরোহণ করেন, তখন গোটা বিশ্বের নজর ছিল তাঁর দিকে। বিশ্বনেতারা হয়তো একটি প্রথাগত কূটনৈতিক ভাষণেরই অপেক্ষা করছিলেন।

 

কিন্তু ভাষণের একেবারে প্রারম্ভেই এক অভাবনীয় ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দৃশ্যের অবতারণা করেন তিনি। প্রথাগত কূটনৈতিক শিষ্টাচারের বাইরে গিয়ে তিনি নিজের সঙ্গে আনা পূর্বনির্ধারিত লিখিত বক্তব্যটি একপাশে সরিয়ে রাখেন।

 

এরপর তিনি সরাসরি মার্কিন আগ্রাসনের ভয়াবহতা তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নেন। বিশ্বনেতাদের সামনে তিনি একের পর এক তুলে ধরেন মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর বর্বরোচিত হামলায় নির্মমভাবে নিহত হওয়া ইরানি শিশুদের রক্তমাখা ছবি এবং ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া বেসামরিক জনপদের বেশ কিছু প্রামাণ্য চিত্র।

 

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর মতে, দৃশ্যমান প্রমাণের মাধ্যমে বিশ্বের সর্বোচ্চ মঞ্চে এভাবে প্রতিবাদের ঘটনা অত্যন্ত বিরল এবং এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি শক্তিশালী বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

লিখিত বক্তব্য সরিয়ে রেখে অত্যন্ত আবেগময় অথচ দৃঢ় কণ্ঠে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান উপস্থিত বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে বলেন যে, তিনি মূলত বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠার ওপর একটি লিখিত ভাষণ প্রস্তুত করে এনেছিলেন।

 

কিন্তু গতকাল যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সম্পূর্ণ ভিত্তিহীনভাবে ইরানকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন, তখন সেই মিথ্যাচারের জবাব দেওয়াটা তাঁর কাছে বেশি জরুরি বলে মনে হয়েছে।

 

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যে অপবাদ দিচ্ছে তা সম্পূর্ণ অবাস্তব; বরং চরম সত্যটি হলো, পশ্চিমা বিশ্বের মদদপুষ্ট আগ্রাসনের কারণে ইরানি জাতিই যুগের পর যুগ ধরে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের সবচেয়ে বড় শিকারে পরিণত হয়েছে।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসী নীতির অত্যন্ত কঠোর সমালোচনা করে ইরানি প্রেসিডেন্ট তাঁর ভাষণে একাধিক সুনির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ করেন। তিনি আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির চরম লঙ্ঘনের বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, কোনো প্রকার আইনি ভিত্তি বা আন্তর্জাতিক অনুমোদন ছাড়াই তাঁদের দেশের সর্বোচ্চ নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।

 

এটি কেবল একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত নয়, বরং এটি সুস্পষ্ট আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। এরপর তিনি মিনাব শহরের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মার্কিন বাহিনীর পরিচালিত ভয়াবহ বোমাবর্ষণের কথা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন।

 

ওই হামলায় নিহত কোমলমতি ও নিষ্পাপ শিক্ষার্থীদের মর্মান্তিক ছবিগুলো উঁচিয়ে ধরে তিনি বিশ্ববিবেকের কাছে এক অত্যন্ত জোরালো প্রশ্ন রাখেন। তিনি বলেন, এই যে শিশুদের ছবি আপনারা দেখছেন, এরা মার্কিন এবং ইসরায়েলি সমরাস্ত্রের নির্মম আঘাতে অকালে প্রাণ হারিয়েছে।

 

এই নিষ্পাপ শিশুরা কোনো অপরাধ করেনি, তারা কোনো অন্যায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। তবুও কেন তাদের জীবনের প্রদীপ এভাবে নিভিয়ে দেওয়া হলো, তার জবাব আজ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দিতে হবে।

 

প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের বর্ণনায় উঠে আসে লামের্দ শহরের অপর একটি মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক হামলার চিত্র। তিনি গভীর ক্ষোভের সঙ্গে অভিযোগ করেন যে, লামের্দ শহরের একটি ক্রীড়া ভবনে যখন একদল শিশু আনন্দে খেলাধুলায় মগ্ন ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে সেখানে একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরকবাহী ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে অত্যন্ত বর্বরোচিত ও কাপুরুষোচিত হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।

 

এই ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং যুদ্ধবিধির সম্পূর্ণ পরিপন্থী হলেও পশ্চিমা বিশ্ব এই বিষয়ে সর্বদা নীরবতা পালন করেছে। তিনি বিশ্বনেতাদের জানান যে, কেবল শিশুরাই নয়, গত কয়েক দশকে ধারাবাহিক ও সুপরিকল্পিত হামলায় ইরানের অনেক প্রথিতযশা বিজ্ঞানী, সাধারণ নারী-পুরুষ এবং অগণিত নিরীহ মানুষকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।

 

একটি স্বাধীন দেশের মেধাবী সন্তানদের এভাবে হত্যা করার মাধ্যমে মূলত একটি জাতির ভবিষ্যৎকেই ধ্বংস করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। পাশ্চাত্য বিশ্বের, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির দ্বিমুখী আচরণের অত্যন্ত কড়া সমালোচনা করেন মাসুদ পেজেশকিয়ান।

 

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে যে চরম ভণ্ডামি চলছে, সেদিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, যারা নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তৈরি করে, তাদের অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র দিয়ে প্রশিক্ষণ দেয় এবং রাজনৈতিকভাবে সুরক্ষা প্রদান করে, তারাই আজ চরম ধৃষ্টতা দেখিয়ে স্বাধীনতাকামী রাষ্ট্রগুলোকে সন্ত্রাসী বলে আখ্যায়িত করছে।

 

এটি কেবল একটি মিথ্যাচারই নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা এবং মানবাধিকারের প্রতি এক চরম উপহাস। তিনি জোরালোভাবে দাবি করেন যে, বিশ্বের প্রকৃত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, ইরান কখনোই কোনো দেশের ওপর আগ বাড়িয়ে সামরিক আগ্রাসন চালায়নি বা কোনো যুদ্ধ শুরু করেনি।

 

ইরান যা করেছে, তা কেবলই নিজেদের পবিত্র মাতৃভূমির সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং নিজ দেশের সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার তাগিদেই করেছে। ভাষণের শেষ পর্যায়ে এসে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ইরানি জাতির অদম্য সাহস এবং প্রতিরোধ মানসিকতার কথা অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।

 

তিনি অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন যে, সর্বাধুনিক সমরাস্ত্র, প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব এবং অর্থনৈতিক অবরোধের পাহাড় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো পরাশক্তির কাছেই ইরানি জাতি অতীতে কখনো মাথা নত করেনি এবং ভবিষ্যতেও কোনো দিন মাথা নত করবে গঠনমূলক সংকল্পে। আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার প্রশ্নে ইরান আপসহীন।

 

তিনি বিশ্বনেতাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, বছরের পর বছর ধরে আন্তর্জাতিক সমস্ত আইন, রীতিনীতি এবং জেনেভা কনভেনশনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ইরানের অসংখ্য হাসপাতাল, বিদ্যালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর নির্বিচার হামলা চালানো হয়েছে।

 

এত চরম উসকানি এবং ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও, তেহরান যখনই কোনো পাল্টা বা প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তখন তারা কখনোই শত্রুপক্ষের কোনো বেসামরিক নাগরিক, নারী বা শিশুকে নিজেদের হামলার লক্ষ্যবস্তু বানায়নি।

 

ইসলামি মূল্যবোধ এবং মানবিক নৈতিকতার প্রতি এই অবিচল শ্রদ্ধাই ইরানকে আগ্রাসী শক্তিগুলোর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা করে রেখেছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ইরানের প্রেসিডেন্টের এই অত্যন্ত সাহসী, তথ্যনির্ভর এবং আবেগপূর্ণ ভাষণটি বৈশ্বিক রাজনীতিতে একটি নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের আক্রমণাত্মক মন্তব্যের জবাবে মাসুদ পেজেশকিয়ান যেভাবে চাক্ষুষ প্রমাণসহ বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছেন, তা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এবং পশ্চিমা বিশ্বের সাথে ইরানের চলমান স্নায়ুযুদ্ধে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

 

এই ভাষণ প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও ইরান তাদের নিজস্ব মতাদর্শ এবং ন্যায়সঙ্গত অধিকারের প্রশ্নে অবিচল রয়েছে এবং বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে তারা বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করবে না।

 

- আল জাজিরা