গাজা উপত্যকায় চলমান ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়, অবরুদ্ধ ওই ভূখণ্ডে ত্রাণ সরবরাহে লাগাতার বাধা প্রদান এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের চরম সম্প্রসারণবাদী ও আগ্রাসী নীতির সরাসরি সমালোচনা করেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট। তাঁর এই স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন অবস্থানের পরপরই চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ইসরায়েলি প্রশাসন।
তেল আবিবের শীর্ষ কর্মকর্তারা ম্যাক্রোঁর এই বক্তব্যকে বাস্তবতাবিবর্জিত আখ্যা দিয়ে তা কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছেন, যা ইউরোপ ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে ফাটল ধরিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে।
বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে জাতিসংঘের মতো সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও তীব্র হতাশা প্রকাশ করেন। মাসের পর মাস ধরে চলা ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের ফলে গাজার সাধারণ মানুষের যে অবর্ণনীয় দুর্দশা সৃষ্টি হয়েছে, সেদিকে সমগ্র বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
ঘরবাড়ি হারিয়ে উদ্বাস্তু হওয়া লাখো মানুষের বেঁচে থাকার নূন্যতম মৌলিক অধিকারগুলো কীভাবে প্রতিনিয়ত লঙ্ঘিত হচ্ছে, ফরাসি প্রেসিডেন্টের ভাষণে তা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে সংঘাতকবলিত নিরীহ ফিলিস্তিনিদের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে জরুরি মানবিক সহায়তা ও চিকিৎসা সরঞ্জাম পাঠানোর ক্ষেত্রে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের দিক থেকে যেসব কৃত্রিম বাধা ও বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে, তার তীব্র নিন্দা জানান তিনি।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বর্তমান নিষ্ক্রিয়তা ও উদাসীনতার কঠোর সমালোচনা করে ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বিশ্বনেতাদের বিবেকের কাছে এক অত্যন্ত যৌক্তিক ও জোরালো প্রশ্ন রাখেন। তিনি অত্যন্ত আবেগঘন অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “গাজার এই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের ব্যাপারে আমরা যদি এভাবেই হাত গুটিয়ে নিষ্ক্রিয় বসে থাকি, তাহলে বিশ্বমঞ্চে আমাদের নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার আর কী মূল্য অবশিষ্ট থাকবে?”
ম্যাক্রোঁর এই জোরালো প্রশ্ন মূলত গাজায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি কার্যকর এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে জীবনরক্ষাকারী ত্রাণ সরবরাহ নিশ্চিতে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর সামগ্রিক ব্যর্থতাকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। একটি স্বাধীন ও সভ্য বিশ্বব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের এমন নির্মম পরিণতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না বলে তিনি তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন।
গাজা উপত্যকার পাশাপাশি ফিলিস্তিনের আরেক অবিচ্ছেদ্য ভূখণ্ড অধিকৃত পশ্চিম তীরের বর্তমান উদ্বেগজনক পরিস্থিতি নিয়েও জাতিসংঘের অধিবেশনে অত্যন্ত জোরালো ও সাহসী ভাষায় কথা বলেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট।
সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর অবৈধ বসতি স্থাপনকারী উগ্রপন্থি গোষ্ঠী এবং ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ক্রমবর্ধমান অমানবিক সহিংসতার ঘটনাগুলোতে তিনি চরম বিরক্তি ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিভিন্ন স্বনামধন্য মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দৈনন্দিন প্রতিবেদনে উঠে আসা ওই অঞ্চলের চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র তুলে ধরে ম্যাক্রোঁ বলেন, “প্রতিদিন পশ্চিম তীর থেকে যেসব মর্মান্তিক ও লজ্জাজনক ছবি বিশ্বের সামনে প্রচারিত হচ্ছে, সেগুলোর কি আমরা কেবল নীরব দর্শক হয়েই থাকব?”
তিনি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্পষ্ট করেন যে, অন্যায় ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের এমন ধারাবাহিক ঘটনাগুলোর সামনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই নির্বিকার নীরবতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
ফরাসি প্রেসিডেন্টের ঐতিহাসিক এই ভাষণের সবচেয়ে সংবেদনশীল, যৌক্তিক ও আলোচিত দিকটি ছিল পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের পক্ষে দাঁড় করানো তথাকথিত নিরাপত্তাগত যুক্তির সরাসরি বিরোধিতা ও অসারতা প্রমাণ করা।
ইসরায়েল দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে নিজেদের যেকোনো ধরনের আগ্রাসী ও দখলদারিত্বমূলক পদক্ষেপকে স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের উপস্থিতির দোহাই দিয়ে বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টা করে আসছে।
কিন্তু ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ অত্যন্ত সাহসিকতা ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ইসরায়েলের এই বহুল প্রচারিত বয়ানকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছেন। তিনি বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেন, “অধিকৃত পশ্চিম তীরে বর্তমানে যা ঘটছে, সেদিকে একটু গভীরভাবে তাকান।
ঠিক কীসের নামে, কোন যুক্তিতে এসব অমানবিক ঘটনা ঘটানো হচ্ছে? ফিলিস্তিনের এই সুনির্দিষ্ট অঞ্চলে তো হামাস কখনোই উপস্থিত ছিল না।” ম্যাক্রোঁর এই অকাট্য যুক্তির মাধ্যমে মূলত এটিই প্রমাণিত হয়েছে যে, ইসরায়েল নিজেদের আত্মরক্ষার যে ঠুনকো অজুহাত দাঁড় করায়, পশ্চিম তীরের ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
সেখানে পরিচালিত দৈনন্দিন সামরিক অভিযান, ঘরবাড়ি উচ্ছেদ এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন মূলত ইসরায়েলের অবৈধ ভূখণ্ড দখল ও উগ্র সম্প্রসারণবাদী নীতিরই এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। ম্যাক্রোঁর এই অভাবনীয়, তীক্ষ্ণ ও সত্যনিষ্ঠ সমালোচনার পর স্বাভাবিকভাবেই ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
ফরাসি প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের পরপরই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে একটি আনুষ্ঠানিক ও অত্যন্ত কড়া বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। ওই বিবৃতিতে ম্যাক্রোঁর সমস্ত অভিযোগ ও সমালোচনাকে সম্পূর্ণ “অবাস্তব ও হাস্যকর” বলে অভিহিত করে তা প্রত্যাখ্যান করে ইসরায়েলি কট্টরপন্থি প্রশাসন।
নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে যে, ফরাসি প্রেসিডেন্ট মধ্যপ্রাচ্যের প্রকৃত নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বুঝতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছেন।
ইসরায়েলের পক্ষ থেকে জোর দিয়ে প্রচার করা হয় যে, তাদের দেশের সাধারণ নাগরিকদের ওপর হামাসসহ অন্যান্য ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বহুমুখী ও চোরাগোপ্তা হামলা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
নিজেদের সার্বভৌম ভূখণ্ড ও নাগরিকদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে বলে তারা দাবি করে। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইসরায়েলের এই চিরাচরিত বয়ান আন্তর্জাতিক মহলে এখন আর আগের মতো গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে না।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাশাপাশি দেশটির অন্যান্য শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতারাও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের তীব্র ও কড়া সমালোচনা করেছেন। ইসরায়েলের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল ‘ইয়াশার’ পার্টির প্রধান এবং দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা গাদি আইজেনকোট ম্যাক্রোঁর বক্তব্যের অত্যন্ত কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
আইজেনকোট ক্ষোভের সঙ্গে দাবি করেন, ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা সম্পূর্ণভাবে “মাঠের বাস্তবতা” থেকে বিচ্ছিন্ন ও একপেশে। তার মতে, হাজার হাজার মাইল দূর থেকে নিরাপদ কক্ষে বসে বিবৃতি দেওয়া সহজ হলেও ইসরায়েল প্রতিদিন যে ধরনের অস্তিত্ব রক্ষার কঠিন লড়াই এবং জটিল নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ইউরোপের নেতারা তা গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারছেন না।
আইজেনকোটের এই বক্তব্য মূলত ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকদের সেই চিরাচরিত রক্ষণশীল মানসিকতারই প্রতিফলন, যেখানে তারা আন্তর্জাতিক যেকোনো যৌক্তিক সমালোচনাকেই তাদের জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি সরাসরি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন।
জাতিসংঘে ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর এই বলিষ্ঠ বক্তব্য এবং তার বিপরীতে ইসরায়েলের পাল্টা ক্ষোভ প্রকাশের ঘটনাটি এমন এক চরম উত্তেজনাকর সময়ে ঘটল, যখন প্যারিস ও তেল আবিবের মধ্যকার ঐতিহ্যবাহী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে আগে থেকেই যথেষ্ট শীতলতা বিরাজ করছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের পৈতৃক জায়গা দখল করে গড়ে তোলা অবৈধ ইসরায়েলি বসতিগুলো থেকে উৎপাদিত পণ্য ও বাণিজ্যিক সামগ্রীর ওপর ইউরোপের বেশ কয়েকটি পশ্চিমা দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে ফ্রান্সও কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ আরোপ করার একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী ওই বসতিগুলো সম্পূর্ণ অবৈধ হওয়ায়, সেখানে উৎপাদিত যেকোনো ধরনের পণ্য বয়কটের দাবি দীর্ঘ কয়েক দশক ধরেই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানিয়ে আসছিল।
ফ্রান্স সরকারের এই সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক পদক্ষেপ এবং তার পরপরই জাতিসংঘের মতো সর্বোচ্চ বিশ্বমঞ্চে ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে স্বয়ং ফরাসি প্রেসিডেন্টের এই অত্যন্ত খোলামেলা ও সরাসরি সমালোচনা-এই দুইয়ে মিলে পরিস্থিতি নতুন মোড় নিয়েছে।
ইউরোপীয় পরাশক্তি ফ্রান্স ও ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠীর মধ্যকার বিদ্যমান মতপার্থক্য এখন এক চূড়ান্ত, দৃশ্যমান ও জটিল রূপ ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ফিলিস্তিন সংকট সমাধানে পশ্চিমা বিশ্বের একচেটিয়া ও অন্ধ সমর্থনের দিন ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে।
ফ্রান্সের মতো একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী ইউরোপীয় রাষ্ট্র এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অন্যতম স্থায়ী সদস্য যখন প্রকাশ্যে ও দ্বিধাহীনভাবে ইসরায়েলের সম্প্রসারণবাদী নীতির এতটা কঠোর সমালোচনা করে, তখন তা বৈশ্বিক কূটনীতিতে এক নতুন ও ইতিবাচক মাত্রার যোগ করে।
ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর এই যুগান্তকারী ভাষণ শুধু গাজা বা পশ্চিম তীরের সাধারণ ফিলিস্তিনি মানুষের দীর্ঘদিনের অবর্ণনীয় দুর্দশার কথাই বিশ্ববাসীর সামনে নতুন করে তুলে ধরেনি, বরং এটি ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান অবিচারের বিরুদ্ধে বিশ্বনেতাদের দিনের পর দিন ধরে চলা লজ্জাজনক নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও স্মরণীয় নৈতিক চপেটাঘাত।
ইসরায়েলি প্রশাসন তাদের এই আন্তর্জাতিক সমালোচনাকে যতই বাস্তবতাবিবর্জিত বা হাস্যকর বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করুক না কেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফিলিস্তিনিদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায়ের প্রশ্নে এবং মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থায়ী ও টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ফ্রান্সের এই অত্যন্ত জোরালো ও সাহসী অবস্থান ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক কূটনীতিতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, অর্থবহ এবং নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে শান্তিকামী বিশ্ববাসী গভীরভাবে বিশ্বাস করে।