যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে চলমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তার এই ঐতিহাসিক ও সাহসী উপস্থিতির ভূয়সী প্রশংসা করে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও নীতি-নির্ধারণী বার্তা প্রদান করেছে ইরানের সামরিক কাঠামোর অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কোর।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও কূটনৈতিক মহলে বর্তমানে এই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক বিশ্লেষণ ও আলোচনা চলছে। পার্সটুডে এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যমের নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা যায় যে, ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি বুধবার সন্ধ্যায় গণমাধ্যমের উদ্দেশ্যে একটি বিশেষ বিবৃতি প্রদান করেছেন, যেখানে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সাহসিকতা এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ ঐক্যের বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির বর্তমান উত্তেজনাময় প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের এই জাতিসংঘ সফর কেবল একটি সাধারণ কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং পশ্চিমা বিশ্বের নানামুখী চাপ, দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক অবরোধ এবং আঞ্চলিক সংঘাতের এক চরম সংকটময় মুহূর্তে তার এই উপস্থিতি একটি শক্তিশালী প্রতীকী অর্থ বহন করছে।
ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি তার বিবৃতিতে অত্যন্ত আবেগঘন অথচ দৃঢ় ভাষায় উল্লেখ করেন যে, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এমন একটি ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে এই বার্তা দিয়েছেন, যাকে ইরান সবসময় দাম্ভিক ও আধিপত্যবাদী শাসনের মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করে থাকে।
সরাসরি পরাশক্তির মাটিতে দাঁড়িয়ে তিনি এমন একটি সংগ্রামী জাতির অন্তর্নিহিত শক্তি, জাতীয় গর্ব, অটুট সম্মান এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশার বার্তা বিশ্ববাসীর সামনে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন। এই বার্তা প্রমাণ করে যে, কোনো ধরনের বৈদেশিক চাপ বা সামরিক হুমকি ইরানি জাতিকে তাদের আত্মমর্যাদার অবস্থান থেকে বিন্দুমাত্র টলাতে সক্ষম নয়।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহেব্বি তার বিবৃতিতে বিগত সাত মাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়কালের কথা বিশেষভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, গত সাত মাস ধরে বিশ্বের অগণিত মানুষের চোখের সামনে ইরানি জাতি পাহাড়ের মতো অটল ও অবিচল থেকে তাদের সর্বোচ্চ ক্ষমতার প্রদর্শন করে আসছে।
এই সময়কালটি ইরানের জন্য নানা দিক থেকে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ও ঘটনাবহুল ছিল। একদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মিত্রদের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখা, অন্যদিকে দেশের ভেতরে বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক চাপ সামলে নিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব ও সার্বভৌমত্বকে সুসংহত করার এক নিরলস সংগ্রাম চালিয়েছে ইরান।
এই দীর্ঘ ও কঠিন সময়ে সাধারণ মানুষের যে অভূতপূর্ব সহনশীলতা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় তাদের যে নিঃশর্ত আত্মত্যাগ, সেটিকেই মূলত পাহাড়ের মতো অটল শক্তির সঙ্গে তুলনা করেছেন এই জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা।
তার এই মন্তব্য থেকে এটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেশের সাধারণ মানুষের এই দৃঢ়তাকে তাদের জাতীয় প্রতিরক্ষার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করে।
এই বার্তার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি হলো ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিভিন্ন স্তরের মধ্যে বিদ্যমান এক সুদৃঢ় ও অটুট ঐক্যের বহিঃপ্রকাশ। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা প্রায়শই মনে করেন যে, অনেক দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সামরিক বাহিনীর মধ্যে মতাদর্শগত বা কৌশলগত দূরত্ব থাকতে পারে।
কিন্তু ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের মুখপাত্র তার বক্তব্যের মাধ্যমে এই ধরনের সকল ধারণাকে সম্পূর্ণভাবে নস্যাৎ করে দিয়েছেন। তিনি অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে জোর দিয়ে বলেন যে, ইরানের সর্বোচ্চ নির্বাহী কর্তৃপক্ষ তথা রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে শুরু করে দেশের সীমানায় রণাঙ্গনে অতন্দ্র প্রহরীর মতো যুদ্ধরত বীর যোদ্ধা এবং দেশের প্রতিটি শহর-বন্দরে রাস্তায় নেমে আসা সাধারণ আপামর জনসাধারণ-সবার মধ্যে আজ এক অভূতপূর্ব ও অবিচ্ছেদ্য ঐক্যের সৃষ্টি হয়েছে।
এই ত্রিমাত্রিক ঐক্য-অর্থাৎ সরকার, সামরিক বাহিনী এবং সাধারণ জনগণ-যেকোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান যখন নিউইয়র্কে জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিশ্বনেতাদের সামনে বক্তব্য রাখছিলেন, তখন তার সেই বক্তব্যের পেছনে কেবল একটি সরকারের কণ্ঠস্বর ছিল না, বরং সমগ্র ইরানি জাতির এই সুদৃঢ় ঐক্যের প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছিল পুরো বিশ্ব।
ভবিষ্যতের যেকোনো বৈরী পরিস্থিতি মোকাবিলায় এই জাতীয় ঐক্যের অপরিহার্যতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহেব্বি তার বিবৃতিতে আরও বলেন যে, সরকার ও জনগণের এই সম্মিলিত শক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করেই ইরান তার সকল প্রকাশ্য ও গোপন শত্রুদের হতাশ করতে সক্ষম হবে।
পরাশক্তিগুলোর দীর্ঘদিনের যে ভূরাজনৈতিক সমীকরণ এবং ইরানকে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে করে রাখার যে নিরন্তর অপচেষ্টা, তা এই জাতীয় ঐক্যের কাছে বারবার মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য। পশ্চিমা দেশগুলো যুগের পর যুগ ধরে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানি জাতিকে দুর্বল করার যে কৌশল গ্রহণ করে আসছে, তা যে কার্যত ব্যর্থ হয়েছে, রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের মুখপাত্রের এই আত্মবিশ্বাসী বক্তব্য তারই এক জ্বলন্ত প্রমাণ।
তিনি অত্যন্ত দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন যে, এই অটুট একতা এবং সাহসিকতার ওপর ভিত্তি করেই ইরানি জাতি তাদের ভবিষ্যৎকে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও অনেক বেশি উন্নত, সুরক্ষিত ও মর্যাদাপূর্ণ করে তুলবে।
পরিশেষে এটি বলা যায় যে, নিউইয়র্কের বুকে দাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের এই আত্মবিশ্বাসী অবস্থান এবং তার প্রতি ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের এই অকুণ্ঠ ও আনুষ্ঠানিক সমর্থন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একটি অত্যন্ত পরিষ্কার বার্তা প্রদান করছে।
এই বার্তাটি হলো-ইরান তার নিজস্ব নীতি, আদর্শ এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বিন্দুমাত্র আপস করতে প্রস্তুত নয়। বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে একটি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান যখন তার জাতির শক্তির কথা এত উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করেন, তখন তা কেবল সেই দেশেই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের অন্যান্য স্বাধীনতাকামী ও আধিপত্যবাদবিরোধী দেশগুলোর জন্য একটি বড় অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়ায়।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের এই সাহসী নেতৃত্ব এবং সামরিক বাহিনী ও সাধারণ মানুষের নিরঙ্কুশ সমর্থন আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক কূটনীতির ময়দানে ইরানের অবস্থানকে যে আরও সুদৃঢ় ও অপ্রতিরোধ্য করে তুলবে, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।