বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬
৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যুদ্ধবিরতির নতুন রোডম্যাপ প্রস্তাব ইরানের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৫১ পিএম

নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যুদ্ধবিরতির নতুন রোডম্যাপ প্রস্তাব ইরানের
ছবি : Collected

চলমান বৈশ্বিক উত্তেজনার পারদ নামিয়ে আনতে এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের অবসানে একটি যুগান্তকারী কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ইরান। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে অবস্থানরত ইরানি প্রতিনিধি দল যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি নতুন ও বিস্তারিত রোডম্যাপ বা রূপরেখা প্রস্তাব করেছে।

 

আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চে এই প্রস্তাবটিকে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রস্তাবিত এই নতুন রূপরেখায় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথ হরমুজ প্রণালি থেকে অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে একটি কার্যকর যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

 

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বাৎসরিক অধিবেশনে যোগদানের উদ্দেশ্যে গত ২২ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির উদ্দেশে যাত্রা করে ইরানের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল। সেদিনই ছিল সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরুর প্রথম দিন।

 

বিশ্বনেতাদের এই বিশাল সমাবেশের মাঝেই পর্দার আড়ালে শুরু হয় স্নায়ুযুদ্ধ অবসানের নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতা। আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা এএফপি-র প্রতিবেদন এবং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, অধিবেশনের প্রথম দিনেই বিরতির অবসরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ প্রতিনিধিদের মধ্যে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

 

দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্কের কারণে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি আলোচনার পথ অনেকটা রুদ্ধ থাকায় এই বৈঠকে অত্যন্ত দক্ষ ও কৌশলী মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছেন কাতার, পাকিস্তান এবং মিসরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা। তাদের নিরলস প্রচেষ্টাতেই মূলত দুই চিরবৈরী দেশের প্রতিনিধিরা একটি সমঝোতার টেবিলে বসতে সম্মত হন।

 

ইরানের পক্ষ থেকে উত্থাপিত এই নতুন প্রস্তাবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো একটি সুনির্দিষ্ট মেয়াদের যুদ্ধবিরতি। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ হবে ষাট দিন।

 

উভয় পক্ষ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করার পর যখন যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে, তখন শর্ত অনুযায়ী হরমুজ প্রণালির ওপর থেকে ইরান তার আরোপিত অবরোধ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করে নেবে। এর বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্রকেও ইরানের আন্তর্জাতিক ও বাণিজ্যিক বন্দরগুলোর ওপর থেকে তাদের দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অবরোধ তুলে নিতে হবে।

 

শুধু তাই নয়, যতদিন এই ষাট দিনের যুদ্ধবিরতি বহাল থাকবে, ততদিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান পরস্পরকে লক্ষ্য করে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো ধরনের সামরিক হামলা চালানো থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকবে।

 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই শর্তগুলো যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বিশ্ব অর্থনীতি এবং জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে একটি বিশাল ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই নতুন রোডম্যাপে কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বিপাক্ষিক স্বার্থই রক্ষিত হয়নি, বরং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে।

 

ইরানের নতুন প্রস্তাবে স্পষ্ট করে প্রতিবেশী আরব দেশগুলোতে সব ধরনের আক্রমণ বা সামরিক তৎপরতা বন্ধ রাখার ব্যাপারটিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের যে প্রতিযোগিতা চলে আসছিল, এই প্রস্তাব কার্যকর হলে তা অনেকাংশেই প্রশমিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

তবে, বিশ্ববাসীর মনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের এই নতুন রোডম্যাপে চূড়ান্তভাবে রাজি হয়েছে কি না। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বিষয়টি এখনও সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত নয়।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, সংঘাত অবসানের এই ইস্যুটিতে তেহরান যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের সদিচ্ছা প্রমাণের জন্য পর্যাপ্ত ও বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ওয়াশিংটন কোনোভাবেই ইরানি বন্দরগুলো থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করবে না।

 

মার্কিন প্রশাসনের এই অনড় অবস্থান আলোচনা প্রক্রিয়ায় একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। এই গোপন ও সংবেদনশীল আলোচনার বিষয়ে অবগত একটি বিশ্বস্ত সূত্র সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে, ইরানের উত্থাপিত এই রোডম্যাপটি মূলত ভবিষ্যৎ এবং অর্থবহ আলোচনার জন্য প্রস্তুত করা এক ধরনের অত্যন্ত বিস্তারিত ও সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা।

 

এই পরিকল্পনার প্রধান ও চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো চলমান সংঘাতের চিরস্থায়ী অবসান ঘটানো এবং ওয়াশিংটনের সাথে তেহরানের বিদ্যমান গভীর মতপার্থক্যগুলো নিরসনে একটি সামগ্রিক, গ্রহণযোগ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে পৌঁছানো।

 

সূত্রটি আরও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করে বলেছে যে, নতুন এই রোডম্যাপে পূর্ববর্তী বিভিন্ন দফার ব্যর্থ বা অসম্পূর্ণ আলোচনার ফলাফলগুলোকে অত্যন্ত সুচারুভাবে নতুন করে বিন্যস্ত করা হয়েছে এবং সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে।

 

একই সঙ্গে, বর্তমান সংকট উত্তরণে অত্যন্ত জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বিশেষ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যাতে উভয় পক্ষই কালক্ষেপণ না করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

 

কূটনৈতিক সূত্রগুলো আরও নিশ্চিত করেছে যে, মঙ্গলবারের এই বহুল প্রতীক্ষিত আলোচনা পর্বটি শুরু হয়েছিল অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ে। এই বৈঠকে ইরানের প্রতিনিধিত্ব করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার।

 

শীর্ষ পর্যায়ের এই নেতাদের মধ্যকার বৈঠকটি ছিল অত্যন্ত কৌশলগত ও নীতিগত। এরপর, এই প্রাথমিক বৈঠকের ইতিবাচক ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে উভয় পক্ষের অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ এবং জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণে আরও একটি বিশদ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

 

মূলত এই দ্বিতীয় বৈঠকেই প্রস্তাবের কারিগরি ও আইনি দিকগুলো নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়। আলোচনার এই জটিল প্রক্রিয়া সম্পর্কে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) পোস্ট করা একটি বার্তায় নিজের মতামত তুলে ধরেছেন।

 

তিনি লিখেছেন যে, তিনি এবং তার দল মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে অত্যন্ত দীর্ঘ ও গঠনমূলক আলোচনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, এই মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর কূটনীতিকরা সারাদিন ধরে উভয় পক্ষের মধ্যে নিরলসভাবে যাতায়াত করে অত্যন্ত সফলভাবে একটি নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রক্ষা করেছেন।

 

এক্সে দেওয়া নিজের ওই পোস্টে উইটকফ অত্যন্ত আশাবাদী কণ্ঠে বলেছেন যে, তারা সফলভাবে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব সম্পন্ন করেছেন, যা ভবিষ্যৎ শান্তির জন্য ফলপ্রসূ ও আশাব্যঞ্জক হবে বলে তারা দৃঢ়ভাবে আশা করছেন। মধ্যস্থতাকারীরা শান্তি প্রতিষ্ঠার এই জটিল পথে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখবেন বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।

 

পরিশেষে বলা যায়, আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা এএফপি এবং দ্য ন্যাশনাল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে অনুষ্ঠিত এই বৈঠক বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব কেবল এই দুটি দেশের জন্যই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের শান্তি, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় হুমকি। ইরানের প্রস্তাবিত এই নতুন ষাট দিনের যুদ্ধবিরতি এবং অবরোধ প্রত্যাহারের রোডম্যাপ যদি শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখে, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন যুগের সূচনা করতে পারে।

 

যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শর্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করছে, তবুও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই কূটনৈতিক তৎপরতাকে অত্যন্ত ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখছে। এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা, এই রোডম্যাপটি কি সত্যিই শান্তির পথ প্রশস্ত করবে, নাকি অতীতের অনেক উদ্যোগের মতো এটিও কেবল আলোচনার টেবিলেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।

 

- এএফপি, দ্য ন্যাশনাল