বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬
৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পরমাণু বোমা ইসরায়েলে, পরিদর্শকরা ইরানে - পেজেশকিয়ান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০১:০১ পিএম

পরমাণু বোমা ইসরায়েলে, পরিদর্শকরা ইরানে - পেজেশকিয়ান
ছবি : Collected

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে পশ্চিমা দেশগুলোর চরম দ্বৈত নীতি ও বৈষম্যমূলক আচরণের তীব্র সমালোচনা করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন কীভাবে বৈশ্বিক শক্তিগুলো একই মানদণ্ডে ইসরায়েল এবং ইরানকে বিচার করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

 

ভাষণের শুরুতেই তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা শহীদ আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবি প্রদর্শন করে তার বক্তব্যের প্রেক্ষাপট তৈরি করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কেবল ফাঁকা বুলির মাধ্যমে কখনো পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস গড়ে তোলা সম্ভব নয়; এর জন্য সবার আগে প্রয়োজন পশ্চিমা দেশগুলোর এই দ্বৈত নীতির চিরস্থায়ী অবসান।

 

বৈশ্বিক পারমাণবিক রাজনীতির চরম বৈপরীত্য তুলে ধরে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, ইহুদিবাদী ইসরায়েল আজ প্রকাশ্যে পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও আন্তর্জাতিকভাবে এক অদ্ভুত দায়মুক্তি ভোগ করে চলেছে।

 

অথচ, সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্রে ইরানকে প্রতিনিয়ত কঠোর আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ও একের পর এক অমানবিক নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তিনি বিশ্বনেতাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, ইসরায়েল কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটিতে স্বাক্ষর করেনি এবং তাদের ইতিহাসে কোনো দিন কোনো আন্তর্জাতিক পরিদর্শককে নিজেদের ভূখণ্ডে পরমাণু স্থাপনা পরিদর্শনের সামান্যতম অনুমতিও দেয়নি।

 

অন্যদিকে, গাজায় নির্বিচারে হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যার পরও তারা পশ্চিমা দেশগুলো থেকে বিনা মূল্যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের মারণাস্ত্র উপহার পাচ্ছে এবং যখন-তখন যেকোনো দেশের রাজধানীতে হামলা চালানোর দায়মুক্তি ভোগ করছে।

 

এই চরম বৈষম্যের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, পরমাণু বোমা রয়েছে ইসরায়েলে, অথচ পরিদর্শকরা ঘুরে বেড়াচ্ছে ইরানে; ইসরায়েল নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে, আর উল্টো নিষেধাজ্ঞার শিকার হতে হচ্ছে ইরানকে।

 

যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের পক্ষ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে আনা সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন উল্লেখ করে পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান কখনোই কোনো সন্ত্রাসী রাষ্ট্র নয়, বরং তারা নিজেরাই দীর্ঘকাল ধরে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের নির্মম শিকার।

 

সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার হুমকির কড়া জবাব দিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের আস্ফালন প্রমাণ করে বিশ্বে কারা প্রকৃত অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে।

 

ভাষণের একপর্যায়ে তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে উপস্থিত বিশ্বনেতাদের সামনে মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং লামার্দ শহরের একটি ক্রীড়া কেন্দ্রে হামলার হৃদয়বিদারক ছবি প্রদর্শন করেন।

 

তিনি জানান, আমেরিকা ও ইসরায়েলের সরবরাহ করা সর্বাধুনিক অস্ত্র ও ক্লাস্টার বোমা দিয়ে কীভাবে হাজার হাজার টুকরো হয়ে পড়া বোমার আঘাতে নারী, নিরীহ শিশু এবং বিজ্ঞানীদের হত্যা করা হয়েছে।

 

নিহত শিশুদের ছবি উঁচিয়ে ধরে তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, এই শিশুদের কোনো অপরাধ ছিল না, তবুও তাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। তেহরানে হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রধান ইসমাইল হানিয়াকে হত্যার ঘটনা স্মরণ করে তিনি বলেন, কোনো বৈধ প্রমাণ ছাড়াই অন্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে এমন গুপ্তহত্যা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট ও চরম লঙ্ঘন।

 

নিজেদের আত্মরক্ষার অধিকার সম্পর্কে ইরানের অবস্থান অত্যন্ত সুদৃঢ় উল্লেখ করে পেজেশকিয়ান বলেন, বিগত দুই শতাব্দীর ইতিহাসে ইরান কখনোই নিজ থেকে কোনো দেশের ওপর আগে আক্রমণ চালায়নি এবং সবসময় আত্মরক্ষার নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করে এসেছে।

 

উন্নত সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইরানের স্কুল, হাসপাতাল ও বেসামরিক অবকাঠামোতে পশ্চিমা মদদপুষ্ট হামলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এত তীব্র আক্রমণের পরও ইরানি জাতি কখনো মাথা নত করেনি।

 

ইরান পাল্টা আঘাত করেছে ঠিকই, কিন্তু কখনোই কোনো বেসামরিক সাধারণ মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানায়নি। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন, নিজেদের সুরক্ষার জন্য ইরান সামরিক শক্তি অর্জন করতে চায়, কারও ওপর আগ্রাসন চালানোর জন্য নয়।

 

দেশের অস্তিত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য ইরান কখনোই অন্য কোনো শক্তির কাছে অনুমতির মুখাপেক্ষী হবে না বলে তিনি বিশ্বনেতাদের সতর্ক করে দেন। সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি ইন্ধনে দেশের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা রুখে দিতে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের অটুট ঐক্যই ইরানের প্রকৃত শক্তি এবং এই শক্তির ওপর ভর করেই ইরান যেকোনো আগ্রাসন মোকাবিলা করতে প্রস্তুত।

 

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের দীর্ঘদিনের অপপ্রচারের জবাব দিয়ে পেজেশকিয়ান বলেন, বিজ্ঞান ও পারমাণবিক জ্ঞান কখনোই বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকটি পরাশক্তির একচেটিয়া অধিকার হতে পারে না।

 

তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্রকে কখনোই নিরাপত্তার উপাদান বলে মনে করে না এবং পরমাণু অস্ত্র অর্জনের কোনো ইচ্ছাও তাদের নেই। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞান, কৃষিখাতে খাদ্যনিরাপত্তা, শিল্পের আধুনিকায়ন এবং ভবিষ্যতের টেকসই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্বার্থে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের যে ন্যায্য অধিকার, তা থেকে ইরান একচুলও সরে আসবে না।

 

তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেন, ইরান যেমন পরমাণু অস্ত্র চায় না, ঠিক তেমনি পারমাণবিক জ্ঞান থেকে নিজেদের বঞ্চিত রাখাও মেনে নেবে না। পারমাণবিক সংকট সমাধানের পথ যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বরং একটি ভারসাম্যপূর্ণ চুক্তির মাধ্যমে হওয়া সম্ভব বলে তিনি মত দেন, যা একদিকে বিশ্বকে ইরানের কর্মসূচির শান্তিপূর্ণ প্রকৃতির বিষয়ে আশ্বস্ত করবে এবং অন্যদিকে ইরানি জনগণের আইনি অধিকারকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখবে।

 

ভূরাজনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর দ্বিমুখী আচরণেরও তীব্র সমালোচনা করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, এমন একটি আন্তর্জাতিক জলপথের ঐতিহাসিক রক্ষক হিসেবে ইরান দায়িত্ব পালন করবে, অথচ নিজেদের জলসীমায় স্বাধীনভাবে নৌ চলাচলের অধিকার থেকে তারাই বঞ্চিত হবে, এমন অদ্ভুত দাবি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

 

তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, বহিরাগত শক্তিগুলো একদিকে ইরানের চলাচলের পথ অবরুদ্ধ করে রাখবে, আর অন্যদিকে একই জলপথ ব্যবহার করে অন্যান্য দেশে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর জন্য অস্ত্র, বিস্ফোরক ও যুদ্ধজাহাজ পরিবহন করবে-এমন অন্যায় পরিস্থিতি ইরান কখনোই নিজ ভূখণ্ডের আশেপাশে ঘটতে দেবে না।

 

তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভিনদেশি নৌবহরের স্থায়ী উপস্থিতি কখনোই আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, বরং উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর অধিকার ক্ষুণ্ন করা হলে তা গোটা অঞ্চলের নৌ চলাচলের নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ঠেলে দেয়।

 

মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো সংকট দূরবর্তী পরাশক্তির হস্তক্ষেপ ছাড়াই আঞ্চলিক দেশগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সমাধান করা সম্ভব বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন। ফিলিস্তিন ও গাজা সংকটের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে পেজেশকিয়ান বলেন, ফিলিস্তিনিদের জন্য পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা ছাড়া পশ্চিম এশিয়ায় কোনো দিনই দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

 

গাজায় আশি হাজারের বেশি নিরীহ মানুষের প্রাণহানি এবং লাখ লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, পশ্চিমা বিশ্ব তাদের হাতে থাকা সর্বাধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে এই অমানবিক গণহত্যা চালাচ্ছে এবং নির্লজ্জের মতো প্রতিরোধকামী মানুষদের সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করছে।

 

তিনি বলেন, যতদিন বিশ্বে দখলদারিত্ব, আগ্রাসন এবং অবিচার বিদ্যমান থাকবে, ততদিন অধিকার আদায়ের প্রতিরোধ সংগ্রাম চলতেই থাকবে। গাজার সাধারণ মানুষের ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তার প্রশংসা করে তিনি বলেন, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও অবরোধ দিয়ে মুক্তিকামী মানুষের বিশ্বাসকে কখনোই আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যায় না।

 

ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে এবং বোমা হামলার শিকার হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলা মানবজাতির সহজাত প্রবৃত্তি। তাই যারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে আত্মরক্ষার পথ বেছে নিয়েছে, তাদের সন্ত্রাসী বলার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই।

 

রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার যথেচ্ছ ব্যবহারের তীব্র নিন্দা জানিয়ে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, এ ধরনের অমানবিক নিষেধাজ্ঞার মূল লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে দরিদ্র ও নিরীহ সাধারণ মানুষ। ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো নিজেদের হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য মানবাধিকারকে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

 

তিনি বিশ্বনেতাদের সতর্ক করে বলেন, আন্তর্জাতিক আইন যদি কেবল ক্ষমতাধরদের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়, তবে অন্যান্য দেশও নিজেদের সুরক্ষার জন্য শুধু সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হবে, যা একবিংশ শতাব্দীর এই বিশ্বকে সবার জন্য আরও অনেক বেশি বিপজ্জনক ও অস্থিতিশীল করে তুলবে।

 

তিনি বলেন, এমন এক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন যেখানে সামরিক দম্ভ বৈধতার জায়গা নেবে না এবং যুদ্ধ সংলাপের বিকল্প হবে না। পরিশেষে বিশ্বশান্তি ও সম্মিলিত নিরাপত্তার প্রতি ইরানের অবিচল অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে মাসুদ পেজেশকিয়ান একটি নতুন ও ন্যায়ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার রূপরেখা তুলে ধরেন।

 

তিনি বলেন, ইরান বিশ্বকে আরেকটি ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের দিকে নয়, বরং একটি টেকসই শান্তি ও ন্যায়বিচারের দিকে আহ্বান জানাচ্ছে। এই আহ্বান কোনো দুর্বলতা থেকে নয়, বরং নিজেদের সক্ষমতার ওপর অগাধ আস্থা এবং আঞ্চলিক বাস্তবতার গভীর উপলব্ধি থেকে উদ্ভূত।

 

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, বর্তমান বিশ্বে কোনো দেশই এককভাবে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। হয় সব জাতিকে একসঙ্গে নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি গড়ে তুলতে হবে, নতুবা একসঙ্গে অনিরাপত্তার পরিণতি ভোগ করতে হবে।

 

যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় সব জাতির জন্য সমান মর্যাদা, ন্যায্যতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয় না, তাকে কোনোভাবেই একটি সর্বজনীন বৈশ্বিক ব্যবস্থা বলা চলে না বলে মন্তব্য করে তিনি তার ঐতিহাসিক ভাষণ সমাপ্ত করেন।

 

- পার্সটুডে