বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬
৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পবিত্র মক্কাসহ সৌদি আরবে জরুরি সতর্কতা জারি, হামলার আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৬:৩০ পিএম

পবিত্র মক্কাসহ সৌদি আরবে জরুরি সতর্কতা জারি, হামলার আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ
ছবি : Collected

ইসলাম ধর্মের পবিত্রতম স্থান মক্কা নগরীসহ সৌদি আরবের একাধিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে হঠাৎ করেই সম্ভাব্য বিপদের আশঙ্কায় সর্বোচ্চ স্তরের উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দেশটির সিভিল ডিফেন্স বা বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এক বিবৃতির মাধ্যমে এই জরুরি সতর্কতা জারির কথা জানানো হয়।

 

সাধারণত কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ও আকস্মিক আক্রমণ, বিশেষ করে দূরপাল্লার আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ড্রোন হামলার জোরালো আশঙ্কা তৈরি হলেই কেবল দেশটির জাতীয় আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা বা 'ন্যাশনাল আর্লি ওয়ার্নিং প্ল্যাটফর্ম'-এর মাধ্যমে এই ধরনের জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়ে থাকে।

 

আকস্মিক এই সতর্কবার্তার কারণে সাধারণ মানুষ ও পুণ্যার্থীদের মাঝে সাময়িক তবে গভীর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, কারণ এই ধরনের সংকেত সাধারণত আসন্ন কোনো বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞের পূর্বাভাস হিসেবেই বিবেচনা করা হয়।

 

কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সম্ভাব্য যেকোনো বিপদ সম্পর্কে আগে থেকেই সাধারণ মানুষকে সতর্ক করতে এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পর্যাপ্ত সুযোগ করে দিতে পবিত্র মক্কা নগরীতে এই জরুরি বার্তা পাঠানো হয়েছিল।

 

মক্কা নগরী বিশ্বের কোটি কোটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানের কাছে সর্বোচ্চ পবিত্র ও সংবেদনশীল স্থান হওয়ায় এখানকার নিরাপত্তার বিষয়টি সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে সব সময়ই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পেয়ে থাকে।

 

তবে কেবল মক্কাতেই নয়, এর পাশাপাশি লোহিত সাগর উপকূলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত এলাকা ইয়ানবু গভর্নরেট এবং তায়েফ, জেদ্দা ও তাবুক অঞ্চলেও সম্পূর্ণ আলাদাভাবে এই সতর্কতা জারি করা হয়।

 

এই অঞ্চলগুলো সৌদি আরবের অর্থনীতি, তেল শোধন, সামরিক অবস্থান এবং বাণিজ্যিক যোগাযোগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিশ্বব্যাপী বিবেচিত। যদিও এই সতর্কবার্তা প্রদান করার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের প্রবল উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছিল, তবে স্বস্তির বিষয় হলো, সতর্কতা জারির মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক বিবেচনা করে তা আবার আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে নেওয়া হয়।

 

তবে এই স্বল্প সময়ের সতর্কতাও আন্তর্জাতিক সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সতর্ক দৃষ্টি এড়ায়নি। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের সশস্ত্র হুথি বিদ্রোহীরা যখনই সৌদি আরবের মূল ভূখণ্ডে কোনো বড় ধরনের সামরিক হামলা চালানোর প্রস্তুতি গ্রহণ করে, ঠিক তার আগমুহূর্তে সাধারণত এই জাতীয় সতর্কসংকেত সচল হয়ে ওঠে।

 

ফলে সতর্কতা দ্রুত তুলে নেওয়া হলেও ভেতরে ভেতরে এক ধরনের চাপা উত্তেজনা ও বড় কোনো সংঘাতের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি আরব এবং হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত এক নতুন এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে।

 

গত সপ্তাহেই সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের পক্ষ থেকে এক অত্যন্ত গুরুতর ও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। রিয়াদ দাবি করে যে, ২০১৭ সালের পর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে প্রথমবারের মতো পবিত্র মক্কা নগরী লক্ষ্য করে সরাসরি ড্রোন হামলা চালানোর এক দুঃসাহসিক চেষ্টা চালিয়েছে হুথি বিদ্রোহীরা।

 

তবে সৌদি আরবের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত তৎপর থাকায় হুথিদের ছোড়া সেই ড্রোন মক্কার আকাশে পৌঁছানোর আগেই সফলভাবে গুলি চালিয়ে ভূপাতিত করা হয় বলে সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়।

 

যদিও হুথি বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকে মক্কা নগরীতে হামলা চালানোর এই গুরুতর অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রোপাগান্ডা বলে জোরালোভাবে দাবি করা হয়েছে। মক্কায় হামলার এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগের রেশ কাটতে না কাটতেই সামগ্রিক পরিস্থিতি আরও বেশি ঘোলাটে ও সংঘাতময় হয়ে ওঠে।

 

এর মাত্র কয়েক দিনের মাথায় ইয়েমেনের এই সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি গত কয়েক বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো খোদ সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে এক বড় ধরনের সামরিক হামলা চালায়। অত্যন্ত সুরক্ষিত ও প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাজধানী শহরে এই ধরনের সরাসরি আঘাত হানার ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনায় এক নতুন এবং ব্যাপক উদ্বেগজনক মাত্রা যোগ করেছে।

 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সুপরিকল্পিত হামলার মাধ্যমে হুথি বিদ্রোহীরা মূলত তাদের ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতা এবং সৌদি আরবের অভ্যন্তরে যেকোনো স্থানে নিখুঁতভাবে আঘাত হানার শক্তি প্রদর্শন করার চেষ্টা করেছে, যা রিয়াদের জন্য এক বিশাল চিন্তার কারণ।

 

এই চলমান সংঘাতের শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত, যা গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে রেখেছে। ২০১৫ সাল থেকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান নিয়ে দেশটিতে হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সামরিক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন একটি শক্তিশালী সামরিক জোট।

 

দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে ইয়েমেনে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। সম্প্রতি হুথিদের সামরিক তৎপরতা ও আন্তঃসীমান্ত হামলার মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে জোরদার হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সংঘাতের আবর্তে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ছে ইয়েমেন এবং এর প্রতিবেশী পরাশক্তিগুলো।

 

এই যুদ্ধ এখন আর কেবল ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং এটি সমগ্র অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য এক বিশাল হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি মাসের শুরুর দিকের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে হুথিদের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত শক্তির বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

 

এই সময়ে সৌদি-সমর্থিত সরকারি সামরিক বাহিনীকে তীব্র লড়াইয়ের মাধ্যমে পিছু হটতে বাধ্য করে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু ভূখণ্ড দখল করে নিতে সক্ষম হয় হুথি বিদ্রোহীরা।

 

এই অভাবনীয় দখলের মাধ্যমে তারা সৌদি আরবের তেল রপ্তানির অন্যতম প্রধান পথ ও বিশ্ব বাণিজ্যের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত 'বাব আল-মানদেব' প্রণালির উপকূলীয় অঞ্চলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়।

 

বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল এবং আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের জন্য এই প্রণালিটির গুরুত্ব অপরিসীম, আর এর নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে চলে যাওয়াটা সৌদি আরব ও তার পশ্চিমা মিত্রদের জন্য এক বিশাল কৌশলগত ও অর্থনৈতিক পরাজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 

এই সংঘাতের বর্তমান জটিল পর্যায়ে পৌঁছানোর পেছনে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও সামরিক ঘটনা সরাসরি ভূমিকা রেখেছে। এর আগে, গত জুলাই মাসে ইয়েমেনের আকাশসীমায় রিয়াদের একচ্ছত্র সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকা সত্ত্বেও তা সরাসরি অমান্য করে রাজধানী সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি ইরানি বিমান অবতরণের অনুমতি প্রদান করে হুথি বিদ্রোহীরা।

 

এই ঘটনাটি সৌদি আরবের বিমান চলাচলের নিষেধাজ্ঞার প্রতি একটি প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ এবং বড় ধরনের চপেটাঘাত ছিল। এর পরপরই ২০২২ সাল থেকে জাতিসংঘের নিরলস মধ্যস্থতায় চলে আসা একটি অত্যন্ত ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি চূড়ান্তভাবে ভেস্তে যায় এবং উভয় পক্ষের মধ্যে পুনরায় শুরু হয় একের পর এক ধ্বংসাত্মক পাল্টা হামলা।

 

যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে পরিস্থিতি অত্যন্ত দ্রুত অবনতির দিকে যেতে থাকে। যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে যখন হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের ওপর সামুদ্রিক অবরোধ জারির এক একতরফা ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রদান করে।

 

শুধু ঘোষণাতেই নিজেদের সীমাবদ্ধ না রেখে তারা লোহিত সাগর ও এর আশপাশের অঞ্চলে চলাচলকারী সৌদির তেলবাহী বিশালাকার ট্যাঙ্কার এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ভূখণ্ড লক্ষ্য করে সরাসরি সামরিক হামলা চালাতে শুরু করে।

 

তাদের এই আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ভীতির সঞ্চার করেছে। কারণ এই সামুদ্রিক রুটটি বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক পথ, যেখান দিয়ে প্রতিদিন মিলিয়ন মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এশিয়া, ইউরোপ এবং আমেরিকার বিভিন্ন দেশে পরিবাহিত হয়ে থাকে।

 

আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষক ও ভূ-রাজনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, হুথিদের এসব ধারাবাহিক সামরিক সাফল্য কেবল ইয়েমেনের ভেতরেই তাদের নিজেদের অবস্থানকে সুদৃঢ় করেনি, বরং বিশ্ববাজারের শীর্ষ অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদিসহ পুরো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল পরিবহনে ব্যবহৃত দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর ইরান ও তার মিত্রদের নিয়ন্ত্রণ আরও অনেক বেশি সুসংহত করেছে।

 

ফরাসি সংবাদ সংস্থা এএফপি-র সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি যদি এভাবে অব্যাহত থাকে, তবে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাই বিঘ্নিত করবে না, বরং সমগ্র বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা, দ্রব্যমূল্য এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর এক সুদূরপ্রসারী ও ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

 

- এএফপি