শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬
১১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানের সাতটি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কঠোর শাস্তি বজায় রাখার ঘোষণা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:০০ পিএম

ইরানের সাতটি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কঠোর শাস্তি বজায় রাখার ঘোষণা
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পটভূমিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত এক নতুন ও জটিল মোড়ে উপনীত হয়েছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের পক্ষ থেকে উপস্থাপিত মূল সাতটি শর্ত পুরোপুরি এবং আনুষ্ঠানিকভাবে পূরণ না হওয়া পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আরোপ করা বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত শাস্তি অব্যাহত রাখা হবে।

 

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রেস টিভির একটি বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে গৃহীত এমন কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করে দেয় যে, ওয়াশিংটনের কোনো ধরনের চাপ বা সামরিক উপস্থিতির মুখে নতিস্বীকার করতে একেবারেই রাজি নয় ইসলামি প্রজাতন্ত্রটি।

 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা এই ঘোষণাকে কেবল সামরিক পদক্ষেপের একটি অংশ হিসেবে দেখছেন না, বরং এটিকে ওয়াশিংটনের বৈশ্বিক নীতি ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি সুনির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন।

 

প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি চলমান এই ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত ও সামরিক স্থিতাবস্থায় ইরানকে বিজয়ী পক্ষ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

 

তাঁর মতে, ইরান কেবল সাময়িক সামরিক সাফল্যেই সন্তুষ্ট নয়, বরং অর্জিত এই সাময়িক বিজয়কে একটি স্থায়ী, দীর্ঘমেয়াদী এবং শক্তিশালী ‘কৌশলগত প্রতিরোধ ব্যবস্থায়’ রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছে।

 

এই বিশেষ প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক পথ এবং জ্বালানি পরিবহনের মূল ধমনি হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

 

এটি কেবল তেহরানের সামরিক ক্ষমতার প্রদর্শন নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতিতে ইরান যে গভীর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম, তারই সামুদ্রিক প্রমাণ। আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠা এই প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়ার ব্যাপারে ওয়াশিংটন ও তার পশ্চিমা সহযোগীরা একের পর এক অনুরোধ জানালেও তেহরান তা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে চলেছে।

 

সামরিক ও বাণিজ্যিক দিক থেকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আইআরজিসির শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা হোসেইন মোহেব্বি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলের চরম ব্যর্থতা তুলে ধরেন।

 

তিনি বলেন, মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য এবং আন্তর্জাতিক কৌশলগত অগ্রাধিকার ছিল যেকোনো মূল্যে হরমুজ প্রণালিতে নিজস্ব ও সহযোগী দেশের নৌযান চলাচলের অবাধ পথ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু ইরানি প্রতিরক্ষাবাহিনী ও বিপ্লবী গার্ডের কঠোর অবস্থানের মুখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেই উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।

 

ওয়াশিংটনের সামগ্রিক সামরিক শক্তি এবং তাদের আধুনিক নৌবহরের সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তিনি মন্তব্য করেন যে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের বিশ্বজয়ী এবং অপরাজিত নৌবাহিনীর মালিক হিসেবে দাবি করা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্যও খোলা রাখতে সক্ষম হয়নি।

 

এই ঘটনা কেবল ওয়াশিংটনের সামরিক সীমাবদ্ধতাকেই উন্মোচিত করেনি, বরং মধ্যপ্রাচ্যের নৌসীমায় আইআরজিসির আধিপত্য ও কৌশলগত দক্ষতার শক্ত ভিত্তি বিশ্ব দরবারে নিশ্চিত করেছে। বিশ্ব বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে হরমুজ প্রণালির ভূমিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ।

 

পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই সরু সামুদ্রিক পথটি দিয়েই বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত খনিজ তেল এবং বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস বৈশ্বিক বাজারে পরিবাহিত হয়।

 

ফলে এই কৌশলগত পথটি অবরুদ্ধ হওয়ার ঘটনা বিশ্বের বড় বড় শিল্পোন্নত দেশগুলোর অর্থনীতি এবং জ্বালানি খাতের ওপর একটি নজিরবিহীন নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তেহরানের এই অনড় নীতি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এক তীব্র অস্থিরতা তৈরি করেছে।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ নিরাপদ রাখার অজুহাতে ওই অঞ্চলে তাদের সামরিক বহর বৃদ্ধি করেছিল, তখন ইরানের এই সফল অবরোধ তাদের সামরিক সুরক্ষার ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। সমুদ্রপথে যেকোনো আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপে ইরানের কঠোর জবাব বিশ্ব অর্থনীতির ওপর ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর এক বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তুলছে।

 

তেহরানের কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যি সত্যিই এই গভীর সংকট থেকে মুক্তি চায় এবং বিশ্ব বাণিজ্যকে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে আগ্রহী হয়, তবে তাদের ইরানের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক মর্যাদাকে মেনে নিয়ে উত্থাপিত সাতটি পূর্বশর্ত পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

 

যদিও আইআরজিসির পক্ষ থেকে এসব শর্তের প্রতিটির সুনির্দিষ্ট ব্যাখা আনুষ্ঠানিকভাবে সব মাধ্যমে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়নি, তবুও কৌশলগত বিশ্লেষকদের ধারণা-এই শর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো মধ্যপ্রাচ্যে সমস্ত মার্কিন সামরিক তৎপরতা বন্ধ করা, ইরানের বিরুদ্ধে বহু বছর ধরে বলবৎ থাকা অবৈধ ও একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাগুলো সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা, আঞ্চলিক নিরাপত্তায় বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ বন্ধ করা এবং ইরানি সম্পদের ওপর থেকে বেআইনি বাজেয়াপ্তকরণ নীতি বাতিল করা।

 

এই শর্তগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ওয়াশিংটনকে যেকোনো আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক ফোরামে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে বলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বেশ জোরালো বার্তা পাঠিয়েছে তেহরান।

 

ঐতিহাসিকভাবেই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য বিস্তার ও সামরিক উপস্থিতি কমানো ছিল ইরানের বিপ্লব-উত্তর পররাষ্ট্রনীতির প্রধান লক্ষ্য। বর্তমান সংঘাতের পেছনের কারণ বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে একের পর এক সামরিক অবরোধ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে ইরানকে কোণঠাসা করার নীতি অনুসরণ করে আসছিল।

 

তবে ইরানের সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপ এবং আইআরজিসির অনড় অবস্থান ওয়াশিংটনের সেই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাকে বড় ধরনের ব্যর্থতার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ইরান যেভাবে তার অর্জিত সাফল্যকে একটি 'স্থায়ী কৌশলগত প্রতিরোধ ব্যবস্থায়' রূপান্তরিত করেছে, তাতে করে ভবিষ্যতের যেকোনো মার্কিন পদক্ষেপকে প্রতিহত করা তেহরানের জন্য আরও সহজতর হবে।

 

এটি ওয়াশিংটনের জন্য একটি সুস্পষ্ট বার্তা যে, কেবল ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের অর্থনৈতিক বা সামরিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার দিন শেষ হয়ে এসেছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আইআরজিসি মুখপাত্রের এই নতুন বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক নিরাপত্তাহীনতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

এতদিন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা ধারণা করেছিল যে সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি প্রদর্শন করে ইরানকে জলপথ খুলে দিতে বাধ্য করা সম্ভব হবে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র নির্দেশ করছে।

 

সমুদ্রসীমায় মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি সত্ত্বেও ইরান যেভাবে একক কর্তৃত্বে হরমুজ প্রণালি বন্ধ রেখেছে, তা পশ্চিমাদের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ও সামরিক সক্ষমতার ওপর এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।

 

ফলে এখন ওয়াশিংটনের সামনে প্রধান দুইটি পথ খোলা রয়েছে-হয় সামরিক সংঘাত বাড়িয়ে পুরো অঞ্চলকে এক ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়া, অন্যথায় কৌশলগত পরিবর্তন এনে ইরানের দাবি বা শর্তগুলোর টেবিলে বসে সমাধান খোঁজা।

 

বিশ্বের প্রধান কূটনৈতিক সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক ফোরামগুলো ইতিমধ্যেই হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা নিরসনে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিলে ইউরোপ ও এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলো জ্বালানি সংকটে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

 

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও শান্তি রক্ষাকারী সংগঠনগুলোর মতে, এই উত্তেজনা কেবল আঞ্চলিক স্তরে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির সামঞ্জস্যকে বিনষ্ট করবে। তথাপি, তেহরান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই উদ্বেগকে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।

 

তাদের মূল বক্তব্য হলো-যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ না আন্তর্জাতিক আইন মেনে ইরানের যৌক্তিক শর্তগুলো মেনে নিচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা নিজেদের গৃহীত কঠোর কৌশলগত প্রতিরোধমূলক নীতি থেকে একচুলও সরে আসবে না।

 

পরিস্থিতির সার্বিক পর্যালোচনায় এটি স্পষ্ট যে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখা এবং মার্কিন শক্তিকে সামুদ্রিক সীমানায় অকার্যকর করে দেওয়া ইরানের জন্য এক বড় ধরনের কূটনৈতিক ও সামরিক কৌশলগত বিজয়।

 

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বির মাধ্যমে ইরান যে বার্তা দিয়েছে, তা কেবল একটি সাময়িক প্রতিক্রিয়া নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যে শক্তি ভারসাম্যের এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। ওয়াশিংটনকে এখন গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে যে তারা কি দীর্ঘমেয়াদী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা সহ্য করে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হতে দেবে, নাকি নতিস্বীকার করে ইরানের সাতটি শর্ত মেনে নেওয়ার পথে হাঁটবে।

 

এই সংকট নিরসনে কূটনৈতিক সমঝোতাই হয়তো একমাত্র পথ, তবে তার জন্য ওয়াশিংটনকে তাদের বর্তমান অনড় ও আক্রমণাত্মক অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে। অন্যথায়, হরমুজ প্রণালিতে বিরাজমান এই অচলাবস্থা গোটা বিশ্বের রাজনীতি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত করবে।

 

- ডন